দীর্ঘদিন বাদে বিশ্ব এমন একটি জোট সম্মেলন দেখল, যার সাফল্য প্রশ্নাতীত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একহাতে চিনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং এবং অন্যহাতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ধরে রয়েছেন, এমন একটি অবিস্মরণীয় ছবির ফ্রেম তৈরির জন্য যে শুধু এবারের ব্রিক্স সম্মেলন (BRICS Summit 2026) ঐতিহাসিক হয়ে থাকল এমন নয়। দিল্লিতে হয়ে যাওয়া এই অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনকে ভবিষ্যৎ হয়তো এই কারণে মনে রাখবে যে, এটি সেই বহুপাক্ষিক মঞ্চ হয়ে থাকল যেখান থেকে একইসঙ্গে দু’-দুটো গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার ভিত রচনার প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।
ইরান ও অারব অামিরশাহির রাষ্ট্রপ্রধানদের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মধ্যপ্রাচে্য স্থায়ী শান্তির খেঁাজ এবং মোদির সঙ্গে বৈঠকে পুতিনের সাড়ে চার বছরের ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে অাশ্বাস ছিল সম্মেলনের সবচেয়ে তাৎপর্যবাহী ঘটনা। ১৪০টি অনুচ্ছেদের ‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’-এ সন্ত্রাসবাদ দমনে সম্মিলিত অঙ্গীকারের বিষয়টি বাদ দিলেও নিঃসন্দেহে ওই দুই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর চাপ বাড়িয়েছে ইরানে সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধির পথ থেকে সরে অাসা ও রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ সেরে ফেলার বিষয়ে।
শুধু ভারতের নিরিখে ব্রিক্স সম্মেলনের সাফল্য বিচার করলে তা একটি লম্বা তালিকা হয়ে দঁাড়াবে। প্রথমত, দু’টি যুদ্ধের এই কঠিন পরিস্থিতিতে দিল্লির সম্মেলন ভারতকে অনেকটা অাশ্বস্ত করতে পেরেছে জ্বালানি ও কঁাচামালের স্থায়ী জোগানের বিষয়ে। ব্রিকসে হাজির ছিল রাশিয়া, ইরান, সৌদি অারব ও অারব অামিরশাহি। এই দেশগুলি থেকেই ভারতের সিংহভাগ জ্বালানি অাসে। শিল্পে কঁাচামালের ক্ষেত্রে ভারতের বড় নির্ভরতা চিনের উপর। ব্রিক্স চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি নতুন দিগন্ত খুলেছে।
ব্রিক্সের মধে্য দিয়ে মোদির ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা যে অনেকটা সফল।
ব্রিক্স সম্মেলনকে সামনে রেখে সাত বছর পর ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন জিনপিং। লাদাখে সংঘর্ষের পর চিনের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক যে-তলানিতে গিয়েছিল, তার থেকে এক বিরাট উল্লম্ফন ঘটল জিনপিংয়ের এই সফর দিয়ে। বিশেষ করে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সীমান্ত বিরোধ মেটানোর সঙ্গে সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা দিয়ে দু’-দেশই একমত হয়েছে। অালাপ-অালোচনার দরজা এইভাবে খোলা থাকলে অনেক বাধাই সহজে দূর হয়। জিনপিং যে ‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’-এ স্বাক্ষর করেছেন সেখানে তাদের ‘চিরকালীন বন্ধু’ পাকিস্তানের নাম না-করেও পহেলগঁাওয়ের জঙ্গি হামলার নিন্দা করা হয়েছে। ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া থেকে শুরু করে অাফ্রিকার দেশগুলি ভারতের ভবিষ্যতের বড় বাজার। ব্রিক্স এই দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ভারতের কাছে একটি সেতু।
এবারের ব্রিকসে ডলার বর্জন করে দেশগুলির মধে্য নিজস্ব মুদ্রায় ব্যবসা শুরু নিয়ে অালোচনা হয়েছে। এটিও একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ভারত ও রাশিয়ার মধে্য ইতিমধে্য রুপি-রুবলে ব্যবসা শুরু হয়েছে। যার সুফল দু’-দেশের নাগরিকরাও সরাসরি উপভোগ করতে পারেন। একটি মাত্র ব্লকের সঙ্গে বাণিজ্য করা যে কতটা বিপজ্জনক, তা ট্রাম্পের শুল্কনীতি থেকে শিক্ষা নিয়েছে ভারতও। ব্রিকস হচ্ছে ভারতের কাছে বিভিন্ন দেশে ব্যবসা ছড়িয়ে দেওয়ার একটা বিকল্প পথ।
ভারতের অামন্ত্রণ সত্ত্বেও অামেরিকার চাপে নাকি ব্রিক্সে যোগ দেয়নি তারেক রহমানের বাংলাদেশ। দিল্লি সম্মেলনের সাফলে্যর পর এখন তারেকের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় বাংলাদেশে। সেখানকার সাধারণ নাগরিকরা মনে করছেন ট্রাম্পকে খুশি করতে গিয়ে তারেক বড় সুযোগ নষ্ট করেছেন। কূটনীতিতে যে দেশের স্বার্থ সর্বাগ্রে, তা কেন তারেক বোঝেননি, তা নিয়েই চলছে চর্চা। নজর ঘোরাতে সম্ভবত বাংলাদেশের বিদেশ প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর মুখ খুলে বলেছেন, ‘ব্রিক্স সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি না এলেও ভারতের সঙ্গে নতুন ও কার্যকর সম্পর্ক তৈরি করতে চায় বাংলাদেশ।’ অর্থাৎ, ব্রিক্সের মধে্য দিয়ে মোদির ‘বিশ্বগুরু’ হয়ে ওঠার প্রচেষ্টা যে অনেকটা সফল তার স্বীকৃতি এল প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে। সফল ব্রিক্স ভারতকে ফের ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেছে। জ্বালানি ও কঁাচামালের জোগান এবং রফতানির বাজারের জন্য যে এই সম্মেলনে যোগ দেওয়া জরুরি ছিল তা হয়তো এখন তারেকের সরকারও উপলব্ধি করছে।
ভারতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে এই দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার বিকল্প কোনও রাস্তা নেই।
দেশে ব্রিক্সের যঁারা সমালোচক, তঁারা বলে থাকেন, এই ধরনের মঞ্চের নেতা হওয়ার বাসনার থেকে ভারতের কাছে অামেরিকা ও উন্নত বিশ্বের দেশগুলির সঙ্গে অংশীদারী গড়ে তোলা অনেক বেশি জরুরি। কারণ, লগ্নি ও পণে্যর বাজার, দু’-ক্ষেত্রেই ভারতের কাছে অামেরিকা, জাপান, জার্মানি, ইংল্যান্ড, ইতালি ইত্যাদি দেশগুলি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে যা বিদেশি লগ্নি অাসে তার ১ শতাংশও চিনের নয়। তথ্যপ্রযুক্তি থেকে শুরু করে অাইফোন, ভারতের সিংহভাগ বিদেশি লগ্নি মার্কিন বহুজাতিক সংস্থার। ভারতের মোট বিদেশি লগ্নির যা প্রায় ১০ শতাংশ। মরিশাস ও সিঙ্গাপুরের বিভিন্ন অার্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভারতে বিদেশি লগ্নির যে ৫০ শতাংশ অাসে তাও মূলত অামেরিকা ও উন্নত দুনিয়ার অর্থ। বহু ভারতীয় ব্যবসায়ীও সিঙ্গাপুর ও মরিশাসে নথিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে দেশে লগ্নি করেন।
একে ‘রাউন্ড ট্রিপিং’ বলা হয়। করের সুবিধা নিতে তঁারা এই কাজ করেন। মোদ্দাকথা, ভারতে লগ্নির ক্ষেত্রে ব্রিক্সের দেশগুলির ভূমিকা নগণ্য বলে এই সমালোচকদের দাবি। তঁাদের মতে, ভারতীয় পণে্যর রফতানির ক্ষেত্রেও শীর্ষে অামেরিকা। ভারত বিশ্ব বাজারে তথ্যপ্রযুক্তি, অলংকার, ওষুধ, পোশাক ইত্যাদি যে পণ্য বেচে তার ক্রেতা মূলত অামেরিকা ও উন্নত বিশ্ব। ফলে ভারতের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গেলে এই দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার বিকল্প কোনও রাস্তা নেই।
তবে এই মুহূর্তে ঢাকার অাক্ষেপ থেকেই ব্রিক্সের সমালোচকরা তঁাদের জবাব পেতে পারেন। অামেরিকা ও উন্নত বিশ্ব তথা ‘জি ৭’ গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েও ব্রিক্সের মতো বহুপাক্ষিক মঞ্চগুলির শক্তি বৃদ্ধি হওয়া অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণেই ভারতের কাছে জরুরি। ‘দিল্লি ঘোষণাপত্র’ যে হোয়াইট হাউসকেও কিছুটা বিচলিত করবে, তা প্রমাণিত হওয়া মনে হয় এখন সময়ের অপেক্ষা। সেদিক থেকে দেখলে এখন ‘বিশ্বগুরু’ হওয়ার যথেষ্ট ইতিবাচক দিক রয়েছে।
সর্বশেষ খবর
-
সংকটে পাশে নেই ‘প্রতারক পাকিস্তান’, হাউথির বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইজরায়েলের দ্বারস্থ সৌদি!
-
২০২৯ লোকসভায় প্রায় দেড়গুণ হচ্ছে বুথসংখ্যা! ইভিএম কিনতে বিপুল খরচ কমিশনের
-
ড্রোনাথন ২০২৬: শত্রুর ঘুম ছুটিয়ে পোখরানে প্রথমবার স্বদেশী ড্রোনের ঝলক তুলে ধরল বায়ুসেনা
-
সহকর্মীর মাঝেই খুঁজে পেয়েছেন প্রিয় বন্ধু? এই ৫ গোপন কথা না জানানোই বুদ্ধিমানের কাজ
-
শ্মশানে কী মিলল? আর জি কর কাণ্ডে শিয়ালদহ আদালতে নয়া স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দিল সিবিআই