প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত? একদিকে ‘বন্ধু’ বলে ডাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প বেতালের মতো তাঁর কাঁধে চেপে খেয়ালখুশির নৃত্য করে চলেছেন। ওম বিড়লার বিরুদ্ধে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের দিনও তিনি লোকসভায় অনুপস্থিত রইলেন। এপস্টিন ফাইলসের জল কোথায় গড়ায়, তাও ঠিক বুঝতে পারছেন বলে মনে হয় না! তিন রাজ্যের আসন্ন ভোটে মুখ পুড়লে, অবস্থা আরও না সঙ্গীন হয়! লিখছেন সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়।
আরও পড়ুন:
রাহুল গান্ধী বলেছেন, নরেন্দ্র মোদি ‘মনস্তাত্ত্বিক’ দিক থেকে একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছেন। ভেঙে পড়েছেন। আমেরিকার সঙ্গে তাই অসম বাণিজ্য সমঝোতায় বাধ্য হয়েছেন। সবদিক থেকে বিপর্যস্ত বলেই তিনি সংসদ এড়িয়ে চলেছেন। বিরোধীদের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, তঁার কাছে কোনও প্রশ্নেরই উত্তর নেই।
প্রায় একই কথা বলেছেন রাহুল-সহোদরা প্রিয়াঙ্কা। তাঁর কথায়, প্রধানমন্ত্রী একজনকেই ভয় পান। রাহুল গান্ধী। কারণ প্রধানমন্ত্রীর চাপের কাছে রাহুল মাথা নোয়াননি, নোয়াবেনও না। সেই কারণে মোদি সংসদের অধিবেশনে হাজির হচ্ছেন না। অপ্রিয় প্রশ্নের মুখোমুখি হতে চাইছেন না।
বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সংসদমুখো না-হওয়া অবশ্যই দৃষ্টিকটু। এমন নয় যে, সংসদের অধিবেশনকে তিনি বরাবর খুব গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। অধিবেশন চলাকালীন উভয় কক্ষে নিয়মিত উপস্থিত থেকেছেন।
ভাই-বোনের এই রাজনৈতিক সঁাড়াশি আক্রমণ কতটা যৌক্তিক, কতটাই-বা অসাড়, সেই বিতর্ক পাশে সরিয়ে বলা যেতে পারে, বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে প্রধানমন্ত্রীর সংসদমুখো না-হওয়া অবশ্যই দৃষ্টিকটু। এমন নয় যে, সংসদের অধিবেশনকে তিনি বরাবর খুব গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন। অধিবেশন চলাকালীন উভয় কক্ষে নিয়মিত উপস্থিত থেকেছেন। বরং এমন মন্তব্য অহেতুক হবে না যে, শুরু থেকেই সংসদকে তিনি এড়িয়ে চলেছেন। প্রয়োজনের চেয়ে সামান্যতম বেশি গুরুত্ব ‘গণতন্ত্রের মন্দির’-কে (তঁার নিজেরই কথা) দিতে চাননি।
সোপানে মাথা ঠুকে মন্দিরে প্রবেশ করেছেন ঠিকই, কিন্তু অধিবেশন চলাকালীন কর্তব্য পালন করেননি। ১২ বছরে একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত দিনে লোকসভা ও রাজ্যসভায় হাজির থাকেননি। নিজের মন্ত্রকের একটি প্রশ্নেরও উত্তর দেননি। অথচ প্রত্যেকবার অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে গণমাধ্যমের সামনে উপস্থিত হয়ে বিরোধীদের ইতিকর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করেছেন। এই দ্বিচারিতা সবার গা সওয়া হয়ে গিয়েছে। এই উপেক্ষাই হয়ে দঁাড়িয়েছে তঁার জমানায় সংসদীয় রীতিনীতির ‘নিউ নর্মাল’।
১২ বছরে একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত দিনে লোকসভা ও রাজ্যসভায় হাজির থাকেননি। নিজের মন্ত্রকের একটি প্রশ্নেরও উত্তর দেননি।
সেটা বড় দৃষ্টিকটু হয়ে রইল লোকসভায় বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বে। তঁার জমানায় যা এই প্রথম হল, তঁারই পছন্দের স্পিকার ওম বিড়লার বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন করে প্রস্তাব আনল বিরোধীরা, দু’-দিন ধরে তা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে তুলকালাম চলল, রাহুলের ভাষণে আবারও বাধা দেওয়া হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মেজাজ হারিয়ে কুকথা বলে ফেললেন, প্রধানমন্ত্রী কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও কক্ষে এলেন না! সংসদীয় ভারতের ইতিহাসে এর আগে তিনবার লোকসভার স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়েছে। ১৯৫৪, ’৬৬ ও ’৮৭ সালে। প্রতিটি প্রস্তাবই আলোচিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে। এই প্রথম লোকসভার নেতার অনুপস্থিতিতে স্পিকারের ভাগ্য নির্ধারিত হল। ধ্বনিভোটে। অনেক ‘প্রথম’-এর মতো নরেন্দ্র মোদি এক্ষেত্রেও নজির সৃষ্টি করে গেলেন!
রাহুলের মতে এসব হচ্ছে ‘মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়’-এর কারণে। এর পর থেকেই তিনি বলে চলেছেন, আমেরিকা-সহ নানাবিধ চাপে প্রধানমন্ত্রী নুয়ে পড়েছেন। এমন কিছু আছে যার জন্য এত অসম্মান অপমান সত্ত্বেও মাথা তুলতে পারছেন না। দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন। প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরবনের বই যেমন তঁাকে বেআব্রু করেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চাপে তেমনই তিনি ‘সারেন্ডার’ করতে বাধ্য হয়েছেন। ‘নরেন্দর সারেন্ডার’ পোস্টার নিয়ে ও স্লোগান তুলে বিরোধী সদস্যরা সংসদ ভবন চত্বরে নিত্য বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। অথচ প্রধানমন্ত্রী নির্বিকার!
রাহুলের মতে এসব হচ্ছে ‘মনস্তাত্ত্বিক পরাজয়’-এর কারণে। এর পর থেকেই তিনি বলে চলেছেন, আমেরিকা-সহ নানাবিধ চাপে প্রধানমন্ত্রী নুয়ে পড়েছেন। এমন কিছু আছে যার জন্য এত অসম্মান অপমান সত্ত্বেও মাথা তুলতে পারছেন না।
বাণিজ্য বোঝাপড়া নিয়ে বিরোধীদের এভাবে খড়্গহস্ত হওয়া, এমন আক্রমণাত্মক হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী-সহ শীর্ষ নেতাদের নীরবতা, আলোচনা থেকে অব্যাহতি পেতে পলায়নবৃত্তি মনোভাব অঁাকড়ে থাকা সরকারের দুর্বলতারই পরিচায়ক। বোফর্সের সময় রাজীব গান্ধী কিংবা টুজি, কয়লা, কমনওয়েলথ গেমস কেলেঙ্কারির সময় মনমোহন সিং সরকারের হাল ঠিক এমনই হয়েছিল। সংসদে বিরোধীরাই হয়ে উঠেছিলেন খবর। তৎকালীন স্পিকারেরা এখনকার মতো বিরোধী নেতাদের কণ্ঠ এভাবে রোধ করতেন না। আলোচনার অনুমতি দিতেন। মিডিয়াও সেই খবর ছাপত। বড় বড় করে। এখনকার মতো ভিতরের পাতায় ছোট করে অনাদরে নয়। তখন সামাজিক মাধ্যমের ব্যাপ্তি আজকের মতো ছিল না। এখন সেটাই ‘বিকল্প’ মাধ্যম। সেই মাধ্যমের বিচ্ছুরণে অমিতশক্তিধর বিজেপিকেও দিন দিন কেমন যেন ম্লান দেখাচ্ছে।
এই সরকারের পথ চলার শুরু থেকেই বিতর্কিত বিষয়গুলি সবসময় চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। যা অন্তরালে রাখা সম্ভব হয়নি, পার্লামেন্টের ‘ব্রুট মেজরিটি’ ও ক্ষমতার অসাংবিধানিক প্রয়োগ তা তরিয়ে দিয়েছে। নোটবন্দি, রাফাল, পেগাসাস, পুলওয়ামা, অপারেশন বালাকোট, অযোধ্যা মামলা, গালওয়ান, ইলেক্টোরাল বন্ড, পিএম কেয়ার্স, পাঠানকোট– সব বাধাই মোদি কাটিয়ে এসেছেন বীরদর্পে। হোঁচট খাওয়া শুরু ‘অপারেশন সিঁদুর’ থেকে। যিনি ক্ষমতাসীন হওয়ায় তিনি স্বস্তির শ্বাস ফেলেছিলেন, সেই প্রিয় বন্ধু ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমেই হয়ে উঠেছেন মোদির শিরঃপীড়ার কারণ।
বেতালের মতো কঁাধে চেপে যে-নৃত্য তিনি করে চলেছেন, ‘মাই ফ্রেন্ড’ বলে বারবার যেভাবে বিপদে ফেলছেন, সেটাই হয়ে দঁাড়িয়েছে মোদির চিন্তা। এই সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায় কী, ট্রাম্প নামক অনিশ্চয়তার জটে আরও কীভাবে জড়াতে হবে, জবাবদিহিও বা কীভাবে করবেন, এখনও তঁার অজানা।
সম্ভাব্য তিন সংকট থেকে পরিত্রাণের উপায়ের খোঁজ মোদি এখনও পাননি। প্রথম সংকট এপস্টিন ফাইলস। এর জাল কত দূর ছড়াবে, হরদীপ পুরী ডুববেন না ভাসবেন, নিজে ডোবার সঙ্গে সঙ্গে মোদিকেও তিনি ডোবাবেন কি না, কেউ জানে না। দ্বিতীয়ত, আদানি মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ভূমিকা কেমন হবে এবং মোদির পক্ষে তা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে সেই গতিপ্রকৃতিও অনিশ্চিত। তৃতীয় সংকট বাণিজ্য চুক্তি। শুল্কনীতি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, কৃষিক্ষেত্রের আংশিক উন্মোচন এ দেশের কৃষক সমাজের জন্য প্রকৃত প্রস্তাবে কতটা মারাত্মক হয়ে উঠবে সরকার তা ভাঙছে না। এসব নিয়ে সংসদে আলোচনার অনুমতি দেওয়ার কথাও আপাতত ভাবছে না। বোঝার উপর শাকের অঁাটি জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে জমা দেওয়া বিরোধীদের ইমপিচমেন্ট নোটিস। একসঙ্গে এত চিন্তায় মোদিকে কখনও ভারাক্রান্ত হতে হয়নি। সংসদের অলিন্দে পদচারণার অনীহা তঁার এমনি-এমনি নয়। প্রশ্ন একটাই, এভাবে পালিয়ে বঁাচা যাবে কত দিন?
জনমতের চাপে নরেন্দ্র মোদির পিছু হটার প্রথম উদাহরণ ‘কৃষি আইন’ প্রত্যাহার। সিদ্ধান্তটি মোটেই তিনি খুশি মনে নেননি। সেটা ছিল তঁার চরিত্র-বিরোধী। কেউ তঁাকে প্রশ্ন করবে এবং তিনি জবাবদিহিতে বাধ্য হবেন, এটা মোদি কোনও দিন মেনে নিতে পারেননি। সেই কারণেই এখনও পর্যন্ত একবারও সংবাদ সম্মেলন ডাকেননি। পার্লামেন্টেও কাউকে প্রশ্ন করতে দেননি। তঁার দ্বিতীয় অপছন্দ গৃহীত সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটা। কৃষি আইন প্রত্যাহারের পর দ্বিতীয়বার সেই অপছন্দের কাজটি তঁাকে করতে হল এই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায়। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে আটক করেও ছ’-মাস পেরনোর আগেই সোনম ওয়াংচুককে মুক্তি দিতে হল। মোদি বুঝেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টে তঁার সরকারের মুখ পুড়তে চলেছে। জ্বলুনির হাত থেকে বঁাচার একমাত্র উপায় গান্ধীবাদী শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী ওয়াংচুকের মুক্তি।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে লাদাখিরা উৎফুল্ল। মুসলমানপ্রধান কারগিল ও বৌদ্ধপ্রধান লেহ বুঝেছে, ‘পৃথক’ রাজ্যের মর্যাদা লাভ না হলেও তাদের জোটবদ্ধ আন্দোলন ষষ্ঠ তফসিলের দরজা খুলে দিতে পারে। লেহ অ্যাপেক্স বডি ও কারগিল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স তাই নব উদ্যমে আন্দোলনে নামছে। সোমবারে লাদাখ তারই মহড়া দেখেছ। সেদিন সোনম ওয়াংচুকের মুক্তিতে উদ্দীপ্ত হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে রাজপথে। রাহুল ভুল কিছু বলেননি। ঠিক-ই ধরেছেন, মোদি মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে পর্যুদস্ত। ‘বন্ধু’ সাজা ট্রাম্প শেষমেশ মূর্তিমান বিপদ হয়ে দঁাড়ালে জাতীয়তাবাদী ধ্বজা কি তঁার ঢাল হতে পারবে? তাল ঠুকছে পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু ও কেরলম। আসন্ন বিধানসভা ভোটে তিন রাজ্যে বিজেপির মুখ পড়লে বিরোধী-মাদলের দ্রিম দ্রিম দামামা শেষের শুরুর ঝংকার হয়ে উঠতে পারে।
(মতামত নিজস্ব)
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
নাসিরুদ্দিন শাহ, জিম সর্ভের দ্বৈরথে কতটা জমল ‘মেড ইন ইন্ডিয়া: এ টাইটান স্টোরি’? পড়ুন রিভিউ
-
‘দেড় বছরের নাতনি রোজ মোদি-নাম জপে’, রাহুল-আথিয়াকন্যার ‘সিক্রেট’ ফাঁস দাদু সুনীল শেট্টির
-
‘বেকার গৌরব চা-সিগারেটের টাকাও নিত অন্তরার থেকে, খ্যাতি পেতেই বাড়ায় দূরত্ব’, গোপন তথ্য ফাঁস ‘বন্ধু’দের
-
ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে গিয়েই আইরিশ দলে, টিম ইন্ডিয়াকে উড়িয়ে দেওয়া কে এই ‘ভারতীয়’ বোলার?
-
বসিরহাটে দ্রুত উপনির্বাচনের দাবি বিজেপির, শুরু প্রস্তুতিও