Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৬ জুন ২০২৬
Iran-Israel War

যুদ্ধে জ্বালানি সংকট, চোখ রাঙাচ্ছে মূল্যবৃদ্ধি, কোন পথে ভারতের বিদেশনীতি?

ইরান যুদ্ধের যা গতিপ্রকৃতি, তাতে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে গ‌্যাসের সংকট আরও তীব্র হবে, সঙ্গে অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি। ফলে সমস্ত পণ্যের দাম বাড়ার শঙ্কা। দেশের অর্থনীতি বহু দিন ধরেই মূল‌্যবৃদ্ধির জেরে জর্জরিত। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা– জ্বালানি সংকটের জেরে ঘটা এই মূল‌্যবৃদ্ধি। দেশের এই দুরবস্থার দায় কীভাবে এড়াবেন প্রধানমন্ত্রী?

Advertisement
সুতীর্থ চক্রবর্তী
সুতীর্থ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: মার্চ ১৮, ২০২৬, ১৪:৪৪

link
সুতীর্থ চক্রবর্তী
সুতীর্থ চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: মার্চ ১৮, ২০২৬, ১৪:৪৪

options
link
যুদ্ধে জ্বালানি সংকট, চোখ রাঙাচ্ছে মূল্যবৃদ্ধি, কোন পথে ভারতের বিদেশনীতি? zoom
ভারতকে বছরে যে পরিমাণ গ‌্যাস আমদানি করতে হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে দেশের বিদেশনীতি কী– এই প্রশ্ন বারবার উঠেছে। সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন আরও প্রকট হয়েছে। মোদির সময়কালে আমরা দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিদেশনীতির রাস্তা থেকে সরে এসেছি। ১৫০ কোটি মানুষের দেশের কূটনৈতিক ভাগ্য এখন ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে মোদির সঙ্গে কিছু রাষ্ট্রনেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নের উপর। এই ব্যক্তিগত কূটনীতির জেরে কখনও আমরা বিশ্বমঞ্চে একঘরে হয়ে পড়ছি, আবার কখনও দীর্ঘ দিনের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ককে শীতল করে ফেলছি। কিন্তু দিনের শেষে এর খেসারত দিতে হচ্ছে দেশবাসীকে।

ইরান যুদ্ধের (Iran-Israel War) জেরে এখন বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন‌্যতম ভুক্তভোগী ভারত। ভারতকে বছরে যে পরিমাণ গ‌্যাস আমদানি করতে হয়, তার প্রায় ৯০ শতাংশ আসে হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যে হরমুজ প্রণালী ইরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। ভারতের আমদানি করা জ্বালানি তেলের ৪০ শতাংশও হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরশীল। গ‌্যাস ও জ্বালানি সংকটের এই মূল‌্য কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি চোকাতে হচ্ছে সাধারণ ভারতবাসীকেই। রাজ্যে রাজ্যে রান্নার গ‌্যাসের জন‌্য মানুষের হাহাকার যেকথা বলে দিচ্ছে। আগামী দিনে যখন মোদি সরকার পেট্রোল ও ডিজেলের দাম বাড়িয়ে দেবে, তখনও তার চাপ বহন করতে হবে দেশের সাধারণ মানুষকেই। অসম্ভব মূল‌্যবৃদ্ধি সবার পকেট ফাঁকা করে দেবে।

Advertisement

ইরান যুদ্ধের জেরে এখন বিশ্বজুড়ে যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার অন‌্যতম ভুক্তভোগী ভারত।

রান্নার গ‌্যাসের জন‌্য হাহাকার দেশে যে ধরনের সংকট তৈরি করেছে, তা অভূতপূর্ব। দেশের সমস্ত শহরে অস‌ংখ‌্য হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ। কিছু কিছু রেস্তোরাঁয় খাওয়ার বিলের সঙ্গে মেটাতে হচ্ছে গ‌্যাসের মূল‌্যবৃদ্ধিজনিত সারচার্জ। কোনও কোনও রেস্তোরাঁ ক্রেতাদের বলছে বাড়ি থেকে গ‌্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে এলে বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হবে। সংবাদমাধ‌্যমেই দেশের কোনও একটি রেস্তোরাঁর কাহিনি প্রচার হচ্ছে– যেখানে একটি সিলিন্ডারের বিনিময়ে মিলছে ২০ প্লেট মোমো। রান্নার গ‌্যাসের অভাবে হাসপাতালে রোগীদের খাবারে কাটছাঁট হচ্ছে। মন্দিরে ভোগ রান্না বন্ধ রাখা হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, অফিসের ক‌্যান্টিনে রান্না করা খাবারের অভাব। দেশের বড় অংশের মানুষ হাতে গড়া রুটি খেতে অভ‌্যস্ত। তাদের পরিবর্তন করতে হচ্ছে খাদ‌্যাভ‌্যাসের। কোভিডের সময় এইরকম ‘নিও-নর্মাল’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কোভিড ছিল একটি মহামারী। কিন্তু এবারের এই পরিস্থিতি তৈরির জন‌্য মোদি সরকার তার দায় এড়াতে পারে না।

নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে দেশের বিদেশনীতি কী– এই প্রশ্ন বারবার উঠেছে।

ইরান যুদ্ধের যা গতিপ্রকৃতি, তাতে এই যুদ্ধও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সেক্ষেত্রে গ‌্যাসের সংকট তো অারও তীব্র হবেই, তার সঙ্গে অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে পেট্রোল-ডিজেলের দামবৃদ্ধি। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধি অন‌্য সমস্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবে। দেশের অর্থনীতি বহু দিন ধরেই মূল‌্যবৃদ্ধির জেরে জর্জরিত। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো জ্বালানি সংকটের ধাক্কায় বড় ধরনের কোনও মূল‌্যবৃদ্ধি একেবারে মুখ থুবড়ে ফেলবে অর্থনীতিকে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকা ও ইজরায়েলের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে শেয়ার বাজারে চলছে রক্তক্ষরণ। বিদেশি লগ্নিকারীরা রোজ বাজার থেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে যাচ্ছে। পথে বসতে চলার অবস্থা বহু ছোট ছোট লগ্নিকারীর। বেকারত্বের এই যুগে বহু ভারতবাসীর জীবিকার উপায়ও শেয়ারে লগ্নি। রান্নার গ‌্যাসের সংকট যদি বিশাল হোটেল-রেস্তোরাঁ শিল্পে কোটি কোটি কর্মহানির শঙ্কা তৈরি করে, তাহলে শেয়ার বাজারে ধস পথে বসিয়েছে অসংখ‌্য পরিবারকে।

যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই ভারতের এই দুরবস্থার দায় কীভাবে এড়াবেন প্রধানমন্ত্রী? ভারতের মতো চিনকেও নির্ভর করতে হয় আমদানি করা জ্বালানি তেলের উপর। অথচ চিনের সামনে এখনও কোনও জ্বালানি সংকট নেই। প্রথমত, যুদ্ধ শুরুর আগেই চিন উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রচুর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও গ‌্যাস কিনে তা মজুত করে রেখেছে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালীতে ইরান চিনের জাহাজের ক্ষেত্রে কখনওই কোনও বাধার সৃষ্টি করেনি। এটা ভারতের ক্ষেত্রেও গোড়া থেকে হওয়ার কথা। কারণ ইরান ভারতের দীর্ঘ দিনের বন্ধু। ইরানের চাবাহার বন্দরে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ২০২৪ সালের ২১ মে যখন ইরানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রইসি রহস‌্যজনক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন, তখন ভারত একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করেছিল।

যুদ্ধ শুরু হতে না হতেই ভারতের এই দুরবস্থার দায় কীভাবে এড়াবেন প্রধানমন্ত্রী?

ভারতের জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছিল। সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল। অথচ আমেরিকার হানায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেই নিহত হওয়ার পর শুধুমাত্র শোকবার্তা দিতে মোদি সরকার সময় নিল ৫ দিন। ইরানে হামলা শুরুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে মোদি ইজরায়েলে গিয়ে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর গলা জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর খবর পেলেন না। ফলে ভারত চিনের মতো আগাম কৌশলগত তেল-গ‌্যাস মজুতের সময়ও পেল না। তাদের কঠিন সময়ে ভারতের নীরবতায় ক্ষুব্ধ ইরান হরমুজ প্রণালীতে ভারতীয় জাহাজকেও প্রাথমিকভাবে ছাড় দিল না।

What is India's foreign policy amid Iran war and Energy crisis

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সঙ্গে মোদির ব‌্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নের ভিত্তিতে প্রতি মুহূর্তে ভারতের বিদেশনীতি রচনা হচ্ছে। পহেলগাঁও হামলার জবাবে ভারতের অপারেশন সিঁদুরের সময় ট্রাম্প যখন আচমকা পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকলেন, তখন ভারত আমেরিকার কৌশলগত সহযোগী হয়েও কোণঠাসা হয়ে পড়ল। আবার সেই ট্রাম্পের শুল্কের চাপেই রাশিয়ার থেকে সস্তার জ্বালানি তেল আমদানি বন্ধ করল ভারত। এখন গ‌্যাস ও জ্বালানির সংকটের মুখে যুদ্ধের প্রায় ১৩-১৪ দিন পর ভারতকে সচেষ্ট হতে হচ্ছে ইরানকে খুশি করতে। মোদি ফোন করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্টকে। বিদেশমন্ত্রী জয়শংকর বারবার কথা বলছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রীর সঙ্গে। সৌদির রাজকুমার ও আরব আমিরশাহির শাসকের সঙ্গে মোদির ব‌্যক্তিগত সম্পর্কের কূটনীতি গত কয়েকবছরে ভারতের জ্বালানি নির্ভরতা উপসাগরীয় দেশগুলির উপর আরও বাড়িয়েছে। এখন সংকটে পড়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে বলা হচ্ছে ভারত আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকেও জ্বালানি কিনবে।

মোদির ব‌্যক্তিগত কূটনীতি যে তাঁর ‘বিশ্বগুরু’ ভাবমূর্তি নির্মাণেই বেশি গুরুত্ব দেয়, তা নিয়ে সংশয় নেই। এই কাজ করতে গিয়ে আসলে ভারত কোনও লবির থেকেই আর পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছে না। তাই সংকট সময়ে দেশের মানুষের রান্নাঘরে টান পড়ছে।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.