16th December

বাংলাদেশে মোড়কের আড়ালে মাৎস্যন্যায়?

আরেকটা ১৬ ডিসেম্বরে ঠিক কেমন বাংলাদেশের পরিস্থিতি?

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ডিসেম্বর ১৬, ২০২৫, ১৪:১৫

options
link
বাংলাদেশে মোড়কের আড়ালে মাৎস্যন্যায়?

‘মার্কিন ইকোসিস্টেম’ দ্বারা চালিত প্রতিটি বৈপ্লবিক অান্দোলনের একটি সাধারণ সূত্র রয়েছে। দ্রোহর সামনে থাকে প্রগতিশীল বার্তা। পরের ধাপেও তাই। আরও ভিতরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, মৌলবাদের সঙ্গে আন্দোলনের অন্তর্গঠনে তফাত নেই। ক্লাবের নির্বাচন বা দেশের ভোট, সর্বত্রই ফরমুলা এক ও অদ্বিতীয়। ১৬ ডিসেম্বর উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ। লিখেছেন সুমন ভট্টাচার্য।

Advertisement

আনিস আলমগীর রবিবার থেকে কী অবস্থায় রয়েছেন, তা কেউ জানে না। আনিস, ইরাক যুদ্ধ ‘কভার’ করে বিখ্যাত হওয়া সাংবাদিক, খুব যে আওয়ামী লীগপন্থী বা ‘ভারতের বন্ধু’ বলে প্রচারে ব্যস্ত ছিলেন, এমন নয়। বরং ২০২৪ সালে যখন বাংলাদেশে তথাকথিত ‘জুলাই বিপ্লব’ ঘটছিল, আনিস আলমগীর তার সমর্থকই ছিলেন। কিন্তু নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর আনিস সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালিখি শুরু করেন, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে টক শোয়ে যান এবং সোশাল মিডিয়ায় তঁার ‘আউটস্পোকেন আনিস আলমগীর’-এর লেখাগুলি জনপ্রিয় হতে থাকে। সেই আনিসকে রবিবার যে ঢাকা পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছে– এই লেখা ছাপা হতে যাওয়া পর্যন্ত জানা নেই, তিনি ঠিক কোথায়।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

১৬ ডিসেম্বর, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘বিজয় দিবস’ এবং এই উপমহাদেশের ইতিহাসেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তার আগে যে আনিস আলমগীরকে নিয়ে লেখা শুরু করতে হচ্ছে– এর কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি। আনিস ব্যক্তিগতভাবে আমার ‘বন্ধু’ ছিল। গত ৩০ বছরে ঢাকা, কলকাতা, দিল্লি বা পৃথিবীর যেখানেই, যে-শহরেই আমার সঙ্গে ওর দেখা হয়েছে– আমরা আড্ডা মারিনি এরকম হয়নি। ঢাকায় গেলে ওর বাড়িতে থেকেছি, দিল্লিতে গেলে– আমার বাড়িতে এসে ও থেকেছে। আমরা একসঙ্গে মুশারফ-বাজপেয়ীর শীর্ষ বৈঠক ‘কভার’ করেছি। এরকম অনেক স্মৃতিই আছে। আনিস যে কোনও দিন ভারতের খুব পক্ষে ছিল, বা ভারতের দারুণ বন্ধু ছিল এরকম নয়, আগেই লিখেছি। কিন্তু সেই আনিস এবং কিংবদন্তি লেখক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে যখন একই মামলায় অভিযুক্ত করা হয়, এবং আনিস যখন ঢাকা পুলিশের গোয়েন্দা দফতরে যাওয়ার পর অদৃশ্য হয়ে যান, তখন আমাদের বুঝতে বাকি থাকে না, যে, ১৬ ডিসেম্বর আবার ফিরে এল বটে, কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এখন ভারত শুধুই এক ‘শত্রু’-র নাম। হয়তো বাংলাদেশের জনগণ সামগ্রিকভাবে নয়, কিন্তু বর্তমান সরকার, বর্তমান মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শুধুমাত্রই ভারতকে আক্রমণ। আনিস আলমগীরকেও ‘ভারতের বন্ধু’ রূপে দেখিয়েই তঁার বিরুদ্ধে কামান দাগা এবং সেই কামান দাগার অনিবার্য পরিণতিতে তিনি পুলিশের হাতে বন্দি।

Advertisement

আনিসের মতো জেলবন্দি হয়ে যাওয়ার আগে শাহরিয়ার কবীর আমাকে ঢাকা থেকে ফোনে বলেছিলেন, বাংলাদেশ হোক বা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় এই ধরনের তথাকথিত বিপ্লবের একটি ‘মোড়ক’ থাকে– বাইরের দেশের চকোলেটের মতো। যে চকোলেটের বাইরেটায় থাকেন তথাকথিত ‘প্রগতিশীল’রা, অনেক সময়ই কড়া বামপন্থীরা, যঁারা বিপ্লবের কথা বলেন, সমাজ বিপ্লবের ডাক দেন, এমনকী সমস্ত ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করে রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন। কিন্তু ওই মোড়কটি সরে গেলে – নেপথ্যে থাকে শুধুমাত্র মৌলবাদ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যঁারা ভারত-বিরোধিতা বা তথাকথিত বিপ্লব বা এমনকী জুলাই বিপ্লবের নাম দিয়ে সামাজিক পরিবর্তনের ডাক দিয়ে হাসিনার পতন এবং ইউনূসের কুর্সিতে বসাকে নিশ্চিত করেছিলেন, তঁারা অনেকেই কিন্তু ‘প্রগতিশীল’ ছিলেন। সেই ‘প্রগতিশীল’দের নেপথ্যে যে জামাতের মদত ছিল, আবার সেই জামাতের নেপথ্যে যে মার্কিন প্রশাসনের অঙ্গুলিহেলন ছিল, তা এখন বুঝতে আর কারও বাকি নেই। বিভিন্ন লোক বই লিখেছেন, পশ্চিমবঙ্গেও আরও লেখা হচ্ছে।

একটি ইংরেজি বই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে দীপ হালদার আর সহিদুল হাসান খোকনের। বইটির নাম ‘ইনশাল্লাহ বাংলাদেশ’। তঁারা বাংলাদেশের এই তথাকথিত জুলাই বিপ্লব যে আমেরিকা এবং জামাতের যুগলবন্দি, সেটা পরতে পরতে উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিকভাবে যে-কাজটা মার্কিন ‘ইকোসিস্টেম’, (হ্যঁা, ‘ইকোসিস্টেম’ কথাটাই ইচ্ছে করে ব্যবহার করলাম), দীর্ঘদিন ধরে করে এসেছে, এবং সামনে ‘প্রগতিশীলতা’র মুখ রেখে ডলারের হাতছানি দিয়ে একদল মানুষকে জোগাড় করেছে ভেবেচিন্তে, যঁারা প্রায় লেনিনের ভাষায় সমাজ পরিবর্তনের ডাক দেন, কিন্তু পরে কোনও না কোনও হিন্দু অথবা মুসলিম মৌলবাদী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে নেন– ফলে এঁদের চেনা সত্যিই কঠিন। এঁরা অনেক সময় ছোট কোনও ক্লাবের নির্বাচন দিয়েও এহেন ‘এক্সপেরিমেন্ট’ শুরু করতে পারেন। সামনে একটি ‘প্রগতিশীল’ মুখ, নেপথ্যে আর-একটি ‘প্রগতিশীল’ মুখ, কিন্তু তার নেপথ্যে নিজেদের সমর্থক বাহিনী, যা দিয়ে ক্লাব দখল করে ফেলা যায়। এই সেই ‘এক্সপেরিমেন্ট’, তা জামাতকে সঙ্গে নিয়ে বা অন্য মৌলবাদী সংগঠনগুলিকে সঙ্গে নিয়ে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন সময়ে মার্কিনরা করে এসেছে।

‘আদর্শ উদাহরণ’ মিশর, যেখানে ‘আরব স্প্রিং’-এর নাম দিয়ে হিলারি ক্লিন্টনেরা কার্যত ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’-কে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছিলেন। সেই ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’কে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে মিশরের সেনাবাহিনীকে শেষ পর্যন্ত একটি কঠোর শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে বটে, কিন্তু মৌলবাদের হাত থেকে মিশর ছাড়া পেয়েছে। আর, এই পুরো ঘটনাটির নেপথ্যে, যাকে ‘আরব স্প্রিং’ বলে বিশ্বে হিলারি ক্লিনটনরা বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, যে আসলে মৌলবাদকে গেঁথে দেওয়ার পন্থা নেওয়া হয়েছিল, তা এখন আর বুঝতে কোনও অসুবিধা নেই। লক্ষণীয়: হিলারি ক্লিনটন, যিনি সফলভাবে মনিকা লিউইনস্কির সঙ্গে স্বামীর অ্যাফেয়ার সামলেছিলেন, তিনি কিন্তু এপস্টাইন ফাইলে আবার বিল ক্লিনটনের বা বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবি পাওয়া নিয়ে কোনও কথা বলছেন না। এটিকে তঁার সামাজিকভাবে বিপজ্জনক বা নারীর জন্য অবমাননাকর মনে হয় না। কিন্তু অন্য যে কোনও বিষয়ে, তা শেখ হাসিনা হোক কিংবা বুলগেরিয়ায় সরকারের পতন, সেসব বিষয়ে এই মার্কিনি ডেমোক্র্যাটদের বক্তব্য থাকে। এমনিতে ‘ডেমোক্র্যাট’ বলতে যঁারা ভাবেন ভীষণ ‘প্রগতিশীল’ এবং অনেক সময়ই জোহরান মামদানির মতো তরুণ তুর্কি, যঁাদের কথায় আচ্ছন্ন হয়ে আমরা ডেমোক্র্যাটদের সোচ্চারে সমর্থন করে বসি, তঁারা ভুলে যান, বিল ক্লিনটন থেকে বারাক ওবামা– পৃথিবীতে কীভাবে ধ্বংসলীলা চালিয়েছিলেন। এবং কীভাবে বিভিন্ন দেশে মৌলবাদী শক্তিদের শক্তিশালী হতে সাহায্য করেছিলেন। অনেক সময়ই সেই সাহায্য অর্থনৈতিক উপঢৌকনের পাশাপাশি মার্কিন মুলুকে আমন্ত্রণ বা বিভিন্ন দেশে সরাসরি মার্কিন দূতাবাসকে ব্যবহার করে সংগঠন তৈরি বা প্রচারযন্ত্র তৈরি করাতেও পিছপা ছিলেন না মার্কিন কূটনীতিকরা। এই যে নিজের স্বার্থের জন্য চরম বৈরীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে নেওয়া– এটি বোধহয় একনায়কতন্ত্র বা ‘ফ্যাসিবাদী ইকোসিস্টেম’-এর অন্য রূপ।

একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে তেলেঙ্গানাকে ভেঙে আলাদা রাজ্য তৈরি করার দাবিতে যে সমস্ত আন্দোলন এক সময়ে সংগঠিত হয়েছিল, তার নেপথ্যে অনেকটাই ছিল আরএসএস-এর মদত। আরএসএস তাত্ত্বিকভাবে বিশ্বাস করত, সাবেক অন্ধ্রপ্রদেশে কংগ্রেসকে দুর্বল করা না গেলে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে বিজেপি কোনও দিনই পা-ই রাখতে পারবে না। তাই তেলেঙ্গানা তৈরির আন্দোলনে তারা অন্য গণতান্ত্রিক শক্তির সঙ্গে তো বটেই, এমনকী নকশালদের সঙ্গেও যৌথ আন্দোলন বা কর্মসূচি নিয়েছিল। তেলেঙ্গানা রাজ্য তৈরি হয়। ক্রমে তেলেঙ্গানায় কংগ্রেস দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। আবার তেলেঙ্গানায় ক্ষমতায় ফিরেছে কংগ্রেস এবং সেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডি, রাহুল গান্ধী ও লিওনেল মেসিকে পাশাপাশি ফ্রেমবন্দি করে সম্প্রতি খবরের শিরোনামে। কিন্তু আন্দোলনের এই যে ধরন বা চেহারা, তা কীভাবে তথাকথিত ফ্যাসিবাদী শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবার ‘প্রগতিশীল’দেরও মুখোশের ঢাল রূপে ব্যবহার করে, তা তেলেঙ্গানায় মাওবাদীদের সঙ্গে আরএসএসের যৌথ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া থেকে স্পষ্ট।

তাহলে সারমর্ম কী দঁাড়াল? আপনি যঁাদের ‘বিপ্লবী’ ভাবছেন, আপনি যেটিকে বিশাল ‘প্রগতিশীল আন্দোলন’ বলে মনে করছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় যে আন্দোলনের সমর্থনে আপনি গলা ফাটাচ্ছেন, হতেই পারে, তঁারা জামাত কিংবা আরএসএসের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করে রেখেছেন। অর্থ, ক্ষমতা, মানুষের জোগান– সবই আসছে, পিছন থেকে। প্রথমে প্রগতিশীলতার নাম নিয়ে দরজায় ধাক্কা দেওয়া হবে, কারণ প্রগতিশীলতার মুখোশ না থাকলে মানুষ সেই আন্দোলন বা সেই প্রচেষ্টা সম্পর্কে সন্দিহান থাকতে পারে। এরপর দরজা খুলে যাওয়ার পর যখন লুটতরাজ শুরু হবে, যখন শুরু হবে সাংস্কৃতিক ধ্বংসলীলা, তখনই আপনি মৌলবাদের আসল চেহারাটাকে দেখতে পাবেন। তা কোনও ক্লাবের নির্বাচনে দখল নিতে হোক, বা বাংলাদেশকে মাৎস্যন্যায়ের দিকে ঠেলে দিতে হোক– ফরমুলা সর্বত্র এক ও অদ্বিতীয়।
(মতামত নিজস্ব)

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন