Aro Ekta Lear

অঞ্জন দত্তকে অনুরোধ, দয়া করে বলবেন না ‘আরও একটা লিয়ারই আমার শেষ নাটক’

অঞ্জনের 'কিং লিয়ার' ভার্সন চিরন্তন।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৫, ২০:১৪

options
link
অঞ্জন দত্তকে অনুরোধ, দয়া করে বলবেন না ‘আরও একটা লিয়ারই আমার শেষ নাটক’

নির্মল ধর: প্রায় সাড়ে চারশো বছর আগে মহামান্য নাট্যকার শেক্সপিয়ার ব্রিটেনের কল্পিত এক চরিত্রহীন রাজা লিয়ারকে যে নাটক লিখেছিলেন, তাতে এতটুকু সময়ের ধুলো পড়েনি এখনও। সারা পৃথিবী জুড়ে ‘কিং লিয়ার’ নাটকটির হয়তো শতাধিক ভার্সন হয়ে গিয়েছে। সেই সব ভার্সনে লেখক ও দেশের সার্বিক ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে, কোথাও সংক্ষেপিত হয়েছে, কিছু পরিমার্জন ঘটেছে। কিন্তু নাটকের মূল বক্তব্য রয়েছে অটুট। কদিন আগে অঞ্জন দত্তর নাট্যদলের প্রযোজনায় দেখা হল ‘আরও একটা লিয়ার’ শহরের জ্ঞানমঞ্চে। তিনি নাটকটির নির্যাস ও কিছু অংশ নিয়ে নতুন চেহারা দিয়েছেন। যেখানে ঢুকে পড়েছে আজকের দেশশাসন, রাজনীতি, কূটনীতি, দুর্নীতির রাজনীতি, রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, গুম-খুন-হানাহানি কী নয়! স্পষ্টতই বোঝা যায় অঞ্জনের লক্ষ্য আমাদের দেশের ও রাজ্যের শাসন-অপশাসন যাই বলুন, সেই দিকে!

Advertisement

বেশি ভালো লেগেছে প্রযোজনার কাঠামো, তার বিন্যাস এবং সামগ্রিক উপস্থাপনা। আভরণহীন মঞ্চে শুধু একটি চাকা লাগানো চেয়ার ব্যবহৃত হয়েছে। যেটায় কখনও বসেছেন রাজা লিয়ার, একবার শুধু এডমন্ড। এবং সবচাইতে উল্লেখ করার মতো কাজটি হল প্রতিটি দৃশ্য পরিবর্তনের আগে মঞ্চের বাম দিকে রাখা একটি স্ট্যান্ডে একটি ব্যানারের ব্যবহার। দৃশ্য পরিবর্তনের ফাঁকে সেখানে রাখা ব্যানারে দেখানো হয় আইনস্টাইন, মার্কস, হিটলার থেকে বব ডিলান, পিঙ্ক ফ্লয়েড, অস্কার ওয়াইল্ড, মিগুয়েল সার্ভেন্তেসদের কিছু বিখ্যাত উক্তি। যেমন- “ওয়ার্ল্ড ওন্ট বি ডেস্ট্রয়েড বাই এভিল, বাট বাই পিপল হু ডু নাথিং”, “ক্যাপিটালিজম উইল ডেসট্রয় ইটসেলফ” বা ” অল দ্য ওয়ার্ল্ড ইজ আ স্টেজ”, “হ্যাট্রেড ইজ ব্লাইন্ড, এজ ওয়েল এজ লাভ”… ইত্যাদি ইত্যাদি। ব্যানারের প্রতিটি উক্তির সঙ্গে মিলে যায় অভিনীত দৃশ্যের ঘটনাক্রম। আর এখানেই নাটকের প্রযোগশৈলীতে অঞ্জন জুড়ে দেন তাঁর নিজস্ব নাট্যভাবনা, কৌশল এবং বক্তব্যের শাণিত পর্বগুলি। ‘রাজা লিয়ার’ নাটকের কাহিনির অনেকটাই বর্জন করেছেন, মাত্র দশ/এগারোটি দৃশ্যে বিন্যস্ত করে পুরো নাটকের নির্যাসটুকু দর্শকের কাছে সহজভাবেই পরিবেশন করেছেন।

Advertisement

Advertisement

বর্ষীয়ান রাজা (লিয়ার) নিজের তিন মেয়েকে তাঁর রাজ্য ভাগ করে দিতে চান- কে কতটা বাবাকে ভালোবাসে পরীক্ষা করে। বড় গনেরিল (সুদীপা বসু), মেজো রিগান (কমলিকা) কপট ভালোবাসার ছল করে বাবার রাজ্য নেয়, কিন্তু সত্যি কথা বলে ছোট মেয়ে কর্ডেলিয়ার (বর্ণা রাহা) ভাগ্যে জোটে বিতাড়ন। সে ব্রিটেন রাজের চিরশত্রু ফ্রান্সের রাজাকে বিয়ে করে। এদিকে দুই বোন বাবাকে প্রায় নিঃস্ব করে তাড়ানোর অপেক্ষায় থাকে। বিকৃতযৌন ক্ষুধায় মত্ত রাজার একমাত্র সঙ্গী তখন পুরাতন ভৃত্য, (যে মাঝে মাঝে কিছু সত্যভাষণ করে যায় বিবেক চরিত্রের মতো)। প্রায় উন্মাদ লিয়ার তখন নিজের মেয়েদেরও ‘মাগী’, ‘বেশ্যা’ বলে ডাকে। আর গল্পের শেষ তো অজানা নয়। তবে সাগ্রহে দেখার মতো হল এডমন্ডের চরিত্রে শুভ্র সৌরভ দাশ, কেন্টের চরিত্রে সুপ্রভাত দাশ এবং গ্লোস্টারের ভূমিকায় লোকনাথ দে তো বটেই, ও সর্বোপরি লিয়ার এর চরিত্রে অঞ্জন দত্তের প্রাণপ্রতিষ্ঠার ক্রমবিকাশ। শুভ্রসৌরভ রাজার অবৈধ সন্তান এডমন্ড হবার মানসিক যন্ত্রণা সুন্দর প্রকাশ করেছেন এতটুকু ‘অতি’র সাহায্য না নিয়ে। সুপ্রভাত দাসের কেন্ট, লোকনাথ দের গ্লোস্টারও স্বাভাবিক চরিত্রয়নের নজির! অঞ্জনের অভিনয় সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। তিনি নিজেই যেন লিয়ারের অন্তর্জ্বালা আত্মস্থ করেছেন। তিন নারী চরিত্রে সুদীপা বসু, কমলিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বর্ণা রাহা বন্দ্যোপাধ্যায়, তিনজনই সমানতালে অঞ্জনের প্রযোজনাকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছেন। কাউকে নম্বর কম বেশি দেওয়ার জায়গা রাখেননি। আবহর প্রায় পুরোটাই জন পল ও নীল দত্ত তুলে এনেছেন পশ্চিমী সোনাটা থেকে কিন্তু ব্যবহার পরিস্থিতি মাফিক। ছন্দা দত্তের পোশাক পরিকল্পনা এবং তৈরি তখনকার সময়কে মনে রেখেই, যা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এই প্রযোজনা দেখার পর অঞ্জন দত্তর কাছে একটাই অনুরোধ- দয়া করে আর বলবেন না- ‘আরও একটা লিয়ারই আমার শেষ নাটক!’

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.