Gautam Halder

মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ দেখে আপ্লুত! গৌতমকে মধুসূদনের হাতঘড়ি উপহার বংশধর লিয়েন্ডারের

যিনি অভিভূত করে রাখেন গোটা প্রেক্ষাগৃহকে, সেই গৌতমের দু'চোখে তখন প্রগাঢ় বিস্ময়।

বিশ্বদীপ দে
বিশ্বদীপ দে

শেষ আপডেট: জুলাই ২৮, ২০২৬, ১২:২৯

options
link
মাইকেলের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ দেখে আপ্লুত! গৌতমকে মধুসূদনের হাতঘড়ি উপহার বংশধর লিয়েন্ডারের
২৯ বছর ধরে মঞ্চে 'মেঘনাদবধ কাব্য' করছেন গৌতম। ছবি: ফেসবুক।

সদ্য শেষ হয়েছে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’। যে সময়ে শেষ হওয়ার কথা তার থেকে কিছুটা বিলম্বেই। রবিবারের সন্ধ্যা তখন রাত হওয়ার দিকে এগচ্ছে দ্রুত। দর্শকদের কারও কারও মধ্যে ফেরার তাড়া। তবু তার মধ্যেই দু’চোখে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকা তাঁর দিকে। নাটকশেষে বরাবরের মতো তিনি কথা বলছিলেন সকলের সঙ্গে। তখনই দেখা গেল আরেকজনকে। ভারতীয় টেনিসের অবিসংবাদী তারকা লিয়েন্ডার পেজ। দর্শকাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ডেকে নেওয়া হল মঞ্চে। গৌতম হালদারের পাশে তখন তাঁর পুরো টিম।

Advertisement

আচমকাই তৈরি হল ইতিহাস। লিয়েন্ডার পেজ তাঁর হাতে তুলে দিলেন একটি বাক্স। যার ভিতরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতঘড়ি! গৌতমের দু’চোখে তখন প্রগাঢ় বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের পিছু পিছু বেরিয়ে এসেছে জল- পবিত্র অশ্রু। অশ্রুতে চিকচিক করছে লিয়েন্ডারের চোখও। সেই কান্না ক্রমেই যেন সংক্রমিত হচ্ছিল দর্শকদের মধ্যেও। ইতিহাস সৃষ্টি হল চকিতেই। আর এত মানুষের ভিড়ে মিশে থাকলেন আরও একজন- বাঙালির বড় কাছের… ‘মধুকবি’। দর্শকাসন থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠলেন, ”যোগ্য লোকের কাছেই গেল ঘড়িটা।” আর সেই সঙ্গে করতালির স্রোত বয়ে চলল মধ্যরাতের অনর্গল বারিধারার মতো।

Advertisement

২৯ বছর ধরে মঞ্চে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ করছেন গৌতম। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা পরিণত হয়েছে কালজয়ী এক সৃষ্টিতে। ১৮৬১ সালে প্রকাশিত ওই কাব্যে হয়তো মাত্র তিনদিনের বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু সব মিলিয়ে তার ‘বিটুইন দ্য লাইন্সে’ ধরা আছে পরাধীন ভারতবর্ষের যন্ত্রণা! মেঘনাদের মধ্যে মাইকেল প্রত্যক্ষ করেছেন দেশপ্রেম। মহাকাব্যের কাহিনিকে করে তুলেছেন সমসাময়িক। পাশাপাশি অমিত্রাক্ষর ছন্দের ঝলকানি এর কাব্যসুষমাকে করেছে চিরকালীন। এই অমর কাব্যকে কার্যতই নিজের শরীরে ধারণ করেছেন গৌতম হালদার। মঞ্চের পিছনদিকে বসে থাকা কয়েকজন বাদ্যযন্ত্রী ছাড়া সঙ্গে আর কেউ নেই। তিনি নৃত্যগীতবাদ্যের সমাহারে দর্শককে ভাসিয়ে নিয়ে যান কাব্যরসে। আঙুলের মুদ্রায় যখন তারা আঁকেন, সত্যিই মঞ্চে জ্বলে ওঠে নক্ষত্র! তিনিই রাবণ, তিনিই ইন্দ্রজিৎ, বিভীষণ, লক্ষ্মণ, মায়া… একাই সমস্ত চরিত্রের ভিতর দিয়ে এক অনর্গল যাত্রায় তিনি পৌঁছে যান এমন এক দুনিয়ায়, যা প্রকৃত প্রস্তাবেই অনন্য।

Advertisement
Leander Paes gifted Michael Madhusudan Dutt's watch to Gautam Halder
ছবি: সংগৃহীত।

আচমকাই তৈরি হল ইতিহাস। লিয়েন্ডার পেজ তাঁর হাতে তুলে দিলেন একটি বাক্স। যার ভিতরে মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতঘড়ি! যিনি অভিভূত করে রাখেন গোটা প্রেক্ষাগৃহকে, সেই গৌতমের দু’চোখে তখন প্রগাঢ় বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের পিছু পিছু বেরিয়ে এসেছে জল- পবিত্র অশ্রু। অশ্রুতে চিকচিক করছে লিয়েন্ডারের চোখও।

রবিবারের শোয়েও সেই মূর্চ্ছনা ছিল অব্যাহত। তাই তা শেষ হওয়ার দর্শকরা যখন আপ্লুত, সেই মুহূর্তকে ঐতিহাসিক করে তুললেন লিয়েন্ডার পেজ। এমন এক ‘এস শট’ এদিন মঞ্চে তিনি খেললেন… দর্শকরাও ভেসে গেলেন আবেগে। গৌতম হালদার নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। মাইকেলের ব্যবহৃত ঘড়ি, যাতে তাঁর হস্তাক্ষরও রয়েছে- তা এবার থেকে তাঁর! তিনি শুনেই প্রথমে কিছুটা পিছিয়ে এসে তারপর নিজে মাথায় হাত দিলেন। অস্ফূটে সামান্য কিছু কথা বললেনও। কিন্তু শোনা যাচ্ছিল অশ্রুত আরও বহু কথা। শুনছিলেন প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত দর্শকরা।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটালের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলছিলেন, ”আমি জানতামই না ব্যাপারটা। কেবল এটা জানতাম উনি আসতে পারেন। তবে উনি ব্যস্ত মানুষ। সত্যিই এসে উঠতে পারবেন কিনা, সংশয় তো ছিলই। পরে অবশ্য উনি জানালেন, ঠিকই করে রেখেছিলেন আসবেন। এরপর মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছিলেন দেখলাম ওঁর চোখে জল। বলছিলেন যে প্যাশন দেখলাম তা ভুলতে পারব না। তারপর যা হল, সেটা তো দেখলেনই…”

এই মুহূর্তে এদেশে ‘নট’ বলতে যে মুষ্টিমেয় মানুষকে আমরা বুঝি, গৌতম তাঁদেরই অন্যতম। একের পর এক নাটকে তিনি দশকের পর দশক ধরে মুগ্ধ করেছেন আমাদের। তবে ‘মেঘনাদবধ…’ তাঁর ম্যাগনাম ওপাস- একথায় বোধহয় কোনও তর্ক হবে না। এমন সৃষ্টির জন্য এমন পুরস্কারই যেন শোভা পায়। এদিন গৌতমবাবু একা নন, সমস্ত বাঙালির জন্যই যেন তৈরি হল এক অনন্য মুহূর্ত। নাটকশেষে হল থেকে বেরিয়ে আসা মানুষের চোখের ভাষাই সেকথা বুঝিয়ে দিচ্ছিল।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.