দেশের জাতীয় স্তোত্র ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে এই মুহূর্তে তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা। সাহিত্যসম্রাটের সেই অমর সৃষ্টির এবছর সার্ধ্ব শতবর্ষ। তাই দেশজুড়ে তার উদযাপন চলছে। পশ্চিমবঙ্গে এতদিন ‘বন্দে মাতরম’ যথাযথ সম্মান পায়নি, এই অভিযোগ সরব নতুন বিজেপি সরকার। শনিবারও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ রাজ্যে থাকতে হলে ‘বন্দে মাতরম’ গাইতেই হবে। বামপন্থীরা যদিও এই গান গাওয়ার মাধ্যমেই যে দেশপ্রেম প্রকাশিত হয়, তেমনটা মনে করেন না। এনিয়ে যখন চর্চা প্রায় সর্বত্র, এমনই সময় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে মুখ খুললেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক, নিষেধাজ্ঞা ওঠায় সদ্য কলকাতা ঘুরে যাওয়া তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। ফেসবুক পোস্টে জানালেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বন্দে মাতরম বলি।’
আরও পড়ুন:
‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে শনিবার দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টেও নিজের ভাবনা খোলাখুলি প্রকাশ করেছেন তসলিমা নাসরিন। লিখেছেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বন্দে মাতরম্ বলি। এই উচ্চারণে আমি কোনও ধর্মীয় পরিচয় ঘোষণা করি না; আমি স্বীকার করি আমার ইতিহাস, আমার শিকড়, আমার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।’
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চায় নিজস্ব অবদানের চেয়েও তসলিমা নাসরিন অধিক আলোচিত তাঁর ইসলামিক কট্টরপন্থী বিরোধী মনোভাব ও কাজের জন্য। বাংলাদেশের ভূমিকন্যা এই কারণে স্বদেশে থাকতে পারেননি। এপার বাংলায় এসে কিছুটা নিশ্চিন্তে থাকার পরও তাঁর বিতর্কিত লেখালেখির জন্য বিতাড়িত হতে হয়েছে। ইউরোপের নানা দেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে ‘দ্বিখণ্ডিত’ স্রষ্টাকে। সেসব নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল কাটিয়ে দু’দশক পর চলতি মাসের গোড়াতেই কলকাতায় এসেছিলেন তসলিমা। সেকুলার মিশন নামে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে তাঁর আগমন হলেও, রাজ্যের নতুন সরকারের প্রবল উৎসাহ আর নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়টি যে এর নেপথ্যে ছিল, তা সর্বজনবিদিত। রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে তসলিমা নাসরিনকে নাগরিক সম্মান তুলে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, যখন খুশি কলকাতায় আসতে পারেন লেখিকা, তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকারের। পালটচা তসলিমাও তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এও উল্লেখ করেন, ”কৃতজ্ঞতা আনুগত্যের চুক্তি নয়।” নিজের দীর্ঘ বক্তব্যে বারবার ভাবনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা স্পষ্টভাবে বলেছেন। উচ্চারণ করেছেন ভারতীয় ও বাংলার সংস্কৃতির বহুত্ববাদের কথা।

তাঁর ব্যাখ্যা, ‘বাংলা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে আদানপ্রদানের মধ্য দিয়েই নিজের স্বতন্ত্র রূপ তৈরি করেছে। কিন্তু সম্পর্কটি একমুখী নয়। বাংলা শুধু ভারতীয় সভ্যতার কাছ থেকে নেয়নি, ভারতীয় সভ্যতাকেও দিয়েছে অসামান্য চিন্তা, সাহিত্য, সংগীত, সংস্কার ও বিদ্রোহ। বাংলা ও ভারতবর্ষের সম্পর্ক অধীনতার নয়, বরং আত্মীয়তার, পারস্পরিক নির্মাণের। আমি যখন অখণ্ড ভারতমাতাকে প্রণাম করি, কোনও রাজনৈতিক অখণ্ড ভারতের দাবি করি না। আমি প্রণাম করি দেশভাগের আগের সেই সাংস্কৃতিক ভারতবর্ষকে।’
এই পরিস্থিতিতে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে শনিবার দীর্ঘ ফেসবুক পোস্টেও নিজের ভাবনা খোলাখুলি প্রকাশ করেছেন তসলিমা নাসরিন। লিখেছেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বন্দে মাতরম্ বলি। এই উচ্চারণে আমি কোনও ধর্মীয় পরিচয় ঘোষণা করি না; আমি স্বীকার করি আমার ইতিহাস, আমার শিকড়, আমার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। আমি দেশভাগের পরে জন্মেছি, কিন্তু আমার বাবা-মা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মানুষ। ১৯৪৭ সালে একটি সীমান্তরেখা তাঁদের ভূগোলকে ভাগ করেছে। রাষ্ট্র ভাগ হয়েছে, কিন্তু ইতিহাস, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্মৃতি – এসব তো কাঁটাতারের নির্দেশ মেনে ভাগ হয়ে যায় না।’
তাঁর ব্যাখ্যা, ‘বাংলা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৃহত্তর ভারতীয় সভ্যতার সঙ্গে আদানপ্রদানের মধ্য দিয়েই নিজের স্বতন্ত্র রূপ তৈরি করেছে। কিন্তু সম্পর্কটি একমুখী নয়। বাংলা শুধু ভারতীয় সভ্যতার কাছ থেকে নেয়নি, ভারতীয় সভ্যতাকেও দিয়েছে অসামান্য চিন্তা, সাহিত্য, সংগীত, সংস্কার ও বিদ্রোহ। বাংলা ও ভারতবর্ষের সম্পর্ক অধীনতার নয়, বরং আত্মীয়তার, পারস্পরিক নির্মাণের। আমি যখন অখণ্ড ভারতমাতাকে প্রণাম করি, কোনও রাজনৈতিক অখণ্ড ভারতের দাবি করি না। আমি প্রণাম করি দেশভাগের আগের সেই সাংস্কৃতিক ভারতবর্ষকে – যার ইতিহাসে আমার পূর্বপুরুষ ও পূর্বনারীরা আছেন, যার সভ্যতার ভেতর দিয়ে আমার বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিও গড়ে উঠেছে, এবং যাকে গড়ে তুলতেও বাংলা বিরাট অবদান রেখেছে।’ তসলিমার এই দীর্ঘ পোস্ট দেখে সাহিত্য সমাজের একাংশের মত, ‘বন্দে মাতরম’কে মহিমান্বিত করার আড়ালে তিনি এ দেশের জাতীয়তাবাদের অন্যতম বড় অংশ হিসেবে বহুত্ববাদের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
হোটেলের ছাদে বৃষ্টির জল সংরক্ষণে জোর, দিঘার হোটেলে পর্যটকদের সুরক্ষায় পরিকল্পনা প্রশাসনের
-
লজ্জার হারেও টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতের থেকে এগিয়ে বাংলাদেশ, টপকাতে পারবেন শুভমানরা?
-
রংপুরে হিন্দু পরিবার হত্যার কিনারা, নেশায় বাধা পেয়ে খুন! খেজুর-শসা খায় আততায়ীরা
-
‘বন্ধু চল…’, মৃত্যুকালেও ছাড়ল না হাত! নদীতে স্নান করতে নেমে তলিয়ে মৃত্যু দুই কিশোরীর
-
যেন সিনেমার স্ক্রিপ্ট! দিনে মাস্টারি রাতে মাদক পাচারকারী! জলপাইগুড়িতে ধৃত নামী স্কুলের শিক্ষক