Maya Satya Bhram Review

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সুতোয় বাঁধা আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতা, কেমন হল ‘মায়া সত্য ভ্রম’?

শমিক রায়চৌধুরী পরিচালিত 'মায়া সত্য ভ্রম' দেখে উচ্ছ্বাস বা উল্লাসে ফেটে পড়া নয়, চুপ করে দেখে যেতে হয়। লিখছেন স্বাতী চট্টোপাধ্যায় ভৌমিক।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৮, ২০২৬, ১৫:১১

options
link
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সুতোয় বাঁধা আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতা, কেমন হল ‘মায়া সত্য ভ্রম’?
মায়া সত্য ভ্রম। ছবি: ফেসবুক

গভীর কোনও শোক পাওয়ার পর, মানুষ যখন নিজেকে উপলব্ধি করে, তখন রাতের অন্ধকারে একা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, কিংবা নির্জন নদীর পাশে বসে নিজের ভেতর ডুব দিয়ে হয়তো বা মনে প্রশ্ন আসে জীবনের অর্থ কী? কেন এই জন্ম-মৃত্যুর চলমান বৃত্তে আটকে থাকি আমরা? কী আছে মৃত্যুর পর? এই পৃথিবীটা কি শুধু মানুষ, পশু, পাখি প্রভৃতি জীবন্ত প্রাণের, না কি মৃত আত্মারাও বিচরণ করে এর মধ্যেই?

Advertisement

যুগে যুগে দেশে দেশে এই প্রশ্ন বার বার উঠেছে, উঠবেও। আমাদের প্রত্যেকের মনে কখনও না কখনও এই প্রশ্ন এসেছে। এর উত্তর সাধারণ মানুষ পায় না। যারা পায় তারা আর সাধারণ থাকে না। এমনই চিরন্তন কিছু প্রশ্ন, কিছু ধারণা, কয়েকটা অস্বাভাবিক ঘটনার সমন্বয়ে তৈরি মনস্তাত্ত্বিক অতিপ্রাকৃত চেতনার ছবি ‘মায়া সত্য ভ্রম’। ‘বেলাইন’-এর পরে শমীক রায়চৌধুরীর আরও একটি অন্যরকম প্রয়াস এই ছবি।

Advertisement

ছবির কাহিনি শুরু হয় উর্মিলা, সঞ্জয় ও তাদের ছোট্ট ছেলে টোটোরোকে নিয়ে। মায়ের সঙ্গে মেলায় বেড়াতে গিয়ে ছটফটে দুরন্ত টোটোরো হারিয়ে যায়। সঞ্জয় নিজে পুলিশের এসআই পদে থাকলেও ছেলের হদিশ পায় না। একই সঙ্গে কলকাতায় রিসার্চের কাজ করতে এসে নিখোঁজ হয়ে যায় বিদেশিনি সারা। সেই কেসও এসে পড়ে সঞ্জয়ের হাতে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ত্রিলোকদর্শী বাবার সাক্ষাৎকার নিতে ব্যস্ত ছিল সারা। কে এই বাবাজি?

Advertisement
‘মায়া সত্য ভ্রম’

সারার নিরুদ্দেশ হওয়ার পিছনে কি এই বাবার কোনও হাত রয়েছে? ভক্তদের হাত ছুঁয়ে তাদের মৃত আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এই বাবা। লোকটির আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা একসময় উর্মিলার কানেও গিয়ে পৌঁছয়। বাবাজি কি টোটোরোর হদিশ দিতে পারবে? সঞ্জয়ের পুলিশি ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে ওঠে। কোনওরকম ভণ্ডামিকে সে প্রশ্রয় দিতে নারাজ। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যবর্তী সুতোয় বাঁধা থাকে আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতা। ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের মনে সেভাবে সন্দেহ না থাকলেও প্রেতাত্মার অস্তিত্ব নিয়ে আছে।

অঘোরী সাধুরা মৃত আত্মাদের অদ্ভুত উপলব্ধিতে মন্ত্রমুগ্ধ করে সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে বলে দাবি করা হয়। যদিও এর কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কিন্তু বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। মানুষ বিশ্বাস করে তান্ত্রিক সাধু চাইলে মৃত আত্মাদের দিয়ে মানুষের কল্যাণ সাধন করতে পারে, আবার ক্ষতিও করতে পারে। কিন্তু যার ভেক নেই, নামমাত্র বস্ত্র পরিহিত হয়ে ছাই মেখে গাঁজায় দম দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আপাদমস্তক সৌম্যকান্তি একজন বয়স্ক মানুষ কীভাবে মৃত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারেন? কীভাবে তিনি এই ক্ষমতার অধিকারী, কী তাঁর পরিচয়?

প্রিয়াঙ্কা সরকার

এই সব কিছু যখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হতে থাকে, তার মধ্যে মিশে থাকে অসহায়তা, অলৌকিকতা, কল্পবিজ্ঞান এবং জাগতিক রহস্য। এই সব কিছুর মিশ্রণে গল্প এমন এক অদ্ভুত স্তরে পৌঁছয়, যেখানে অবিশ্বাসকে ছাপিয়ে যায় কাহিনির গভীরতা, মুগ্ধ করে পরিচালকের ন্যারেটিভ। বিশালাকায় পর্বতমালা কিংবা অন্তহীন সমুদ্রের সামনে দাঁড়ালে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র, অকিঞ্চিৎকর মনে হয়। ‘মায়া সত্য ভ্রম’ অনেকটা সেই আয়না দেখাবে। যে ছবি দেখে উচ্ছ্বসিত হওয়া নয়, উল্লাসে ফেটে পড়া নয়, শুধু চুপ করে থাকতে হবে।

ত্রিলোকদর্শী বাবার ভূমিকায় সনৎ চট্টোপাধ্যায় এ ছবির উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার। যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রথমবার বড়পর্দায় নিজেকে মেলে ধরলেন তিনি তেমনটা অনেক প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাও দেখাতে পারেন না। ঘটনাচক্রে তিনি এই ছবির অন্যতম প্রযোজকও। উর্মিলা চরিত্রে প্রিয়াঙ্কা সরকার মায়াময় এবং অনবদ্য। সঞ্জয়ের ভূমিকায় সোহম মজুমদার যোগ্য সঙ্গত করেছেন। শেষ দৃশ্যে দুজনের অভিনয় মনে রাখার মতো। এ ছাড়াও বিভিন্ন ভূমিকায় আলেকজান্দ্রা টেলর, পরান বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্রেয়া ভট্টাচার্য, সৌম্য মজুমদার, দেবেশ রায়চৌধুরি প্রত্যেকেই চরিত্র হয়ে উঠেছেন।

নেগেটিভ চরিত্রে শুভ্রজিৎ দত্তকে খুব একটা দেখা যায় না। চমকে দেওয়ার মতো অভিনয় করেছেন তিনি। টিলুর ছোটবেলাকে অসাধারণ দক্ষতায় ফুটিয়ে তুলেছেন শঙ্খদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তমালকান্তি হালদারের সুরে লগ্নজিতা চক্রবর্তী, তিমির বিশ্বাস, শিলাজিৎ মজুমদার ও রূপম ইসলামের গাওয়া গানগুলি শ্রুতিমধুর। প্রসেনজিৎ কোলের চিত্রগ্রহণ, তপনকুমার শেঠের সেট-সজ্জা, সংলাপ ভৌমিকের সম্পাদনা সব মিলিয়েই অনেকদিন মনে থেকে যাবে ‘মায়া সত্য ভ্রম’।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.