Independence

স্বাধীনতার মুহূর্তেও টুকরো টুকরো ছিল ভারত! অন্যরকম হতে পারত মানচিত্র, এই ইতিহাস জানেন?

ভারতকে একত্রিত করার মূল কারিগর এই চারজন।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ১২, ২০২২, ১৯:৪১

options
link
স্বাধীনতার মুহূর্তেও টুকরো টুকরো ছিল ভারত! অন্যরকম হতে পারত মানচিত্র, এই ইতিহাস জানেন?

বিশ্বদীপ দে: ৭৫ বছর। সিকি শতাব্দী পেরিয়ে এল স্বাধীনতা (Independence Day)। দেশজুড়ে সূচনা হয়েছে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসবে’র। ‘হর ঘর তেরঙ্গা’ কর্মসূচি পালনের ডাক দিয়েছে সরকার। এমন উৎসবের সময়ে তবুও অগ্রাহ্য করা যায় না ইতিহাসের গায়ে লেগে থাকা রক্তদাগকে। দেশভাগ যে চিরস্থায়ী ক্ষত রেখে গিয়েছে তাকে অস্বীকার করবে কে? স্বাধীনতার ৭৫ বছর মানে যে দেশভাগেরও ৭৫ বছর। তাই ফিরে আসছে সেই ইতিহাসও। তবে এই লেখা দেশভাগ নিয়ে নয়। ব্রিটিশরা যখন ঘোষণা করল তারা এদেশ ছেড়ে চলে যাবে, সেই সময় তৈরি হয়েছিল এক আশঙ্কাও! আসলে ভারতে দেশীয় রাজ্য ছিল ৫৬৫টি। তারা সেই অর্থে ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে ব্রিটিশদের বৈদেশিক নীতি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু শর্ত তাদের মানতে হত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তারা এই দেশের অংশ থাকবে কিনা সংশয় ছিল তা নিয়েই। শেষ পর্যন্ত সেই রাজ্যগুলি যদি স্বাধীন প্রদেশ হিসেবে থাকার সিদ্ধান্ত নিত কিংবা পাকিস্তানের অংশ হয়ে উঠত তাহলে আজ আমরা যে মানচিত্র দেখি, দেশের সেই মানচিত্রই থাকত না। তৈরি হত দেশভাগের আরও ক্ষতবিক্ষত এক রূপ।

Advertisement

এই ৫৬৫টি করদ রাজ্য তথা ‘প্রিন্সলি স্টেট’ প্রাক-স্বাধীনতা পর্বে ভারতবর্ষের ৪৮ শতাংশ অংশ জুড়ে ছিল। ইংরেজরা যখন ঘোষণা করে তারা ভারত ছেড়ে চলে যাবে, তখন এই প্রদেশগুলির সঙ্গে ব্রিটেনের যে চুক্তি তারও সমাপ্তি ঘোষিত হয়। ফলে দেশীয় রাজ্যগুলির সুযোগ ছিল ভারত কিংবা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে স্বাধীন থেকে যাওয়ার। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে পাশ হওয়া ‘ভারতীয় স্বাধীনতা আইনে’ বিষয়টি পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হয়। ফলে ঘনিয়ে ওঠে এক জটিল পরিস্থিতি। প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কি অখণ্ড ও সার্বভৌম ভারত গড়ে তোলা যাবে না?

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

Nehru

Advertisement

[আরও পড়ুন: ‘তৃণমূল দলটাই দুর্নীতিগ্রস্ত, প্রত্যেকে জেলে যাবে’, অনুব্রতর গ্রেপ্তারির পর তোপ দিলীপ ঘোষের]

এই সমস্ত রাজ্যকে রাজি করানোর দায়িত্ব ছিল সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের উপরে। তাঁর পরিকল্পনা মেনে জাতীয় কংগ্রেসের তরফে ১৯৪৭ সালের ১৫ জুন সমস্ত দেশীয় রাজ্যকে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আবেদন জানাতে বলা হয়। দেশের স্বাধীনতা আসতে তখন আর ২ মাস বাকি। দেখা যায়, বহু রাজ্যই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে সম্মত। পাশাপাশি এই প্রস্তাবে বাধ সেধেছিল বহু রাজ্যও। যাদের অন্যতম ত্রিবাঙ্কুর, জুনাগড়, যোধপুর, ভোপাল, হায়দরাবাদের মতো রাজ্য। তাদের অনেকেই চাইছিল হয় পাকিস্তানের অংশ হতে, না হয় স্বাধীন থাকতে। স্বল্পায়তন এই লেখায় একবার দেখে নেওয়া যাক সেই রাজ্যগুলির পরিস্থিতি।

করাচি-যোধপুর-ভোপাল জুড়ে যা তৈরি করতে চাইছিলেন মহম্মদ আলি জিন্না। সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের বর্ণনায় ‘এ এক এমন ছুরি যা ভারতের হৃদয়ে গেঁথে দেওয়া’র পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। জুনাগড় ও ভোপালের নবাব বরাবরই জিন্না-ঘনিষ্ঠ। কিন্তু যোধপুরের পরিস্থিতি ছিল আলাদা। সেখানকার মহারাজা হনবন্ত সিংকে টোপ দিলেন জিন্না। তাঁর দিকে এগিয়ে দিলেন নিজের সই করা একটি সাদা কাগজ। বললেন, শর্ত নিজের মতো করে বসিয়ে নিতে। জানিয়ে দিলেন, করাচি বন্দরে বিনামূল্যে প্রবেশাধিকার, যোধপুর থেকে সিন্ধ রেলপথে যোগাযোগ, অস্ত্র তৈরি ও রপ্তানির মতো সুযোগ তাঁরা দিতে রাজি। কিন্তু হাতে চাঁদ পেয়েও হনবন্ত সিং কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাঁর সেই দ্বিধা দেখে জিন্না চটে গেলেন। ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নিলেন সাদা কাগজটি। যদি সেদিন তিনি তা না করতেন, ভারতের মানচিত্রে যোধপুর থাকত না। এমনকী তাঁর প্রভাবে জয়সলমির, বিকানির ও উদয়পুরও ঢুকে পড়ত পাকিস্তানে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তাঁর সঙ্গে দেখা করে কথা দেন, অস্ত্র রপ্তানির অনুমতি ভারতও দেবে। পাশাপাশি যোধপুর থেকে কাঠিয়াওয়ারকে রেলপথে জোড়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে। শেষ পর্যন্ত আশ্বাসে বরফ গলে। যোধপুরকে ভারতের অন্তর্গত করতে রাজি হয়ে যান তিনি। তবে এই কাজে লর্ড মাউন্টব্যাটেনের পরামর্শদাতা ভি পি মেননও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

Lord Mountbatten
লর্ড মাউন্টব্যাটেন

[আরও পড়ুন: বিকিনি পরার ‘শাস্তি’ বহিষ্কার, সেন্ট জেভিয়ার্সকে কটাক্ষ সেলেবদের]

এদিকে ভোপালের নবাব হামিদুল্লা ছিলেন জিন্নার মুসলিম লিগের সমর্থক। কিন্তু রাজ্যটি ছিল হিন্দুপ্রধান। লর্ড মাউন্টব্যাটেন যখন তাঁকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানান, হামিদুল্লা তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি দেখে ভোপালের বাসিন্দারা বুঝতে পারছিলেন, নবাব কেবল নিজের ক্ষমতা ও স্বার্থটুকুই রক্ষা করতে চাইছেন। এবং হিন্দু-মুসলিম কারওই স্বার্থের কথা তিনি ভাবছেন না। পরে পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। হামিদুল্লা লক্ষ করেন একে একে আশপাশের দেশীয় রাজ্যগুলি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হতে রাজি হয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কার্যত বাধ্য হয়েই তিনি রাজি হয়ে যান। একই ভাবে জুনাগড়ের শাসকও ছিলেন ছিলেন মুসলিম এবং সেই রাজ্য ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। প্রাথমিক ভাবে পাকিস্তানের অংশ হতে সম্মতও হয়ে যায় জুনাগড়। কিন্তু পরে ভারতীয় সেনার সঙ্গে জুনাদগড়ের সেনার সংঘর্ষ বাঁধলে নবাব সপরিবারে পাকিস্তানে চলে যান। পাশাপাশি সেখানকার হিন্দু বাসিন্দারা ভারতের অংশ হতেই চাইছিলেন। শেষ পর্যন্ত জুনাগড় ভারতের অংশ হতে রাজি হয়ে যায়।

ত্রিবাঙ্কুর প্রথম থেকেই কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতা করতে থাকে। সেই সঙ্গে তারা জানিয়ে দেয় তারা ভারতের অংশ হতে একেবারেই ইচ্ছুক নয়। বলতে গেলে তারাই প্রথম দেশীয় রাজ্য, যারা সরাসরি ভারতে অন্তর্ভুক্ত হতে অস্বীকার করেছিল। মনে করা হয়, প্রাকৃতিক সম্পদে বলিষ্ঠ এই প্রিন্সলি স্টেটের আত্মবিশ্বাস ছিল প্রবল। এখানকার দেওয়ান সি পি রামস্বামী আইয়ারকে নেহরু দিল্লিতে ডেকে ভারতের অংশ হতে প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তা পত্রপাঠ খারিজ করে দেন। ইতিহাসবিদদের ধারণা, জিন্না ও আমেরিকার উসকানিতেই এমন অনমনীয় মনোভাব নিয়ে চলছিলেন তিনি। কিন্তু অচিরেই তাঁর উপরে গুপ্তঘাতক হামলা চালালে তিনি ওই রাজ্য ছেড়ে চলে যান। পরে তাঁরই পরামর্শে ত্রিবাঙ্কুরের মহারাজা নেহরুর প্রস্তাব মেনে নেন।

Patel
সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল

হায়দরাবাদ অবশ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৪৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর। আসলে এখানকার রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল তীব্র। ফলে সংঘর্ষ চরম আকার নেয়। রাজ্যের নিজামের প্রবল আপত্তি ছিল ভারতের অংশ হতে। শেষ পর্যন্ত ‘অপারেশন পোলো’ অর্থাৎ ভারতীয় সেনার সঙ্গে নিজামের পাক মদতপুষ্ট রাজাকার বাহিনীর লড়াই বাঁধে। নির্বিচারে চলে হিন্দু হত্যা। কিন্তু শেষমেশ আত্মসমর্পণ করেন নিজাম।

স্বাধীনতার সময়ে কাশ্মীর না ভারতের অংশ ছিল না পাকিস্তানের। স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখার পক্ষেই সায় ছিল মহারাজা হরি সিংয়ের। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর খান সেনা কাশ্মীর আক্রমণ করলে বাধ্যত ভারতের সাহায্যপ্রার্থী হন তিনি। এরপরই ‘ট্রেটি অফ অ্যাকসেশন’ স্বাক্ষরিত হয় দুই পক্ষের মধ্যে। ভারতে শামিল হয় কাশ্মীর। এবং সাতচল্লিশের সেই যুদ্ধে খান সেনাদের হঠিয়ে দেয় ভারতের সেনা। 

এভাবেই নানা নাটকের মধ্যে দিয়ে আজকের ভারতীয় ভূখণ্ড গঠিত হয়। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়েছে সাড়ে সাত দশক। আজকের সাধারণ ভারতীয়র কাছে নেহরু-জিন্নার নাম যেভাবে পরিচিত, সেই তুলনায় অনেকটাই বিস্মৃত হয়ে গিয়েছেন ভি পি মেননের মতো মানুষরা। অথচ তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টা ছা়ড়া কিন্তু প্যাটেলের সংগ্রাম আরও কঠিন হয়ে যেত। এবং মাউন্টব্যাটেন। তিনি জানতেন, দেশভাগের জন্য আজীবন ভারতীয়দের কাছে তিনি ধিকৃত হবেন। তাই নেহরু-প্যাটেলদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তিনিও আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন যাতে ওই ৫৬৫টি প্রিন্সলি স্টেটকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। এই ইতিহাস রোমাঞ্চকর। যা না জানলে ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির মুহূর্তকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা বোধহয় সম্ভব নয়।

VP Menon
ভি পি মেনন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.