গান শুনে মন ভরে যায়, নাচতে ইচ্ছে করে, কাঁদতে ইচ্ছে করে— এমন তো কতই বলে থাকে আমরা। কিন্তু গান শুনে নিজেকেই শেষ করে ফেলতে ইচ্ছে হয়, এমনটা শুনেছেন কখনও? কিন্তু এমনই এক অবপাদ রয়েছে হাঙ্গেরির এই বিশেষ গানটি ঘিরে। এমনকী এ গানের স্রষ্টার নিজের জীবনেও জুটেছিল করুণ পরিণতি।
আরও পড়ুন:
১৯৩৩। প্রকাশ পায় ‘গ্লুমি সানডে’ নামের এক বিষাদময় গান। গানটি অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা পেল। বুদাপেস্টের বেশিরভাগ ক্যাবারেতেই নিয়মিত বাজতে লাগল সেই হতাশাভরা গানের সুর। আর তারপরেই ঘটতে লাগল ভয়াবহ এক ঘটনা। এই গান যারা প্রায়শই শুনছিলেন, তাঁদের অনেকেই আত্মহত্যা করেন! আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। নিষিদ্ধ হয়ে যায় এই ‘সুইসাইড সং’! কোন কাহিনী রয়েছে নেপথ্যে?

এক বিষণ্ণ স্যাঁতস্যাঁতে রবিবার একা ঘরে বসে প্রেয়সীর কথা মনে করছেন গায়ক। চারপাশের সমস্তই শূন্য মনে হচ্ছে তাঁর। এমন অবস্থায় মৃত্যুই একমাত্র পথ! গায়কের বিশ্বাস, মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে নতুন করে প্রেয়সীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পাবেন।
এ গানের সুর বেঁধেছিলেন রেজসো সেরেস। প্রেমজীবনে চূড়ান্ত হতাশ হয়েছিলেন। পেট চালানোর মতো কোনও কাজও জুটছিল না বহুদিন। বরং কঠোর বাস্তব থেকে বাঁচতে শান্তি খুঁজে নিয়েছিলেন পিয়ানোয়। এমন হৃদয়বিদারী গানের সুর যে তাঁর হাতেই সৃষ্টি হবে, এতে আর আশ্চর্য কী! গানের বক্তব্য সাধারণ। প্রেমিকাকে হারিয়েছেন গায়ক। হয় সে মেয়ে ছেড়ে গিয়েছে, নয়তোবা মারাই গিয়েছে! এক বিষণ্ণ স্যাঁতস্যাঁতে রবিবার একা ঘরে বসে প্রেয়সীর কথা মনে করছেন গায়ক। চারপাশের সমস্তই শূন্য মনে হচ্ছে তাঁর। এমন অবস্থায় মৃত্যুই একমাত্র পথ! গায়কের বিশ্বাস, মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে নতুন করে প্রেয়সীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। এই বেদনা সত্যি, নাকি সবটাই কাতর হৃদয়ের কল্পনা— গানটির অংশবিশেষে ধন্দ জাগে শ্রোতার মনে।
পার্সি বাইসি শেলি তাঁর ‘টু এ স্কাইলার্ক’ কবিতায় বলেছিলেন, “আওয়ার সুইটেস্ট সংগস্ আর দোজ দ্যাট টেল অফ স্যাডেস্ট থট।” হলও তাই। নিত্যদিনের একঘেয়ে ক্লান্তিকর জীবনে ‘গ্লুমি সানডে’-এ মজলেন বহু শ্রোতা। প্রেমে আঘাত বা খিদের যন্ত্রণা— কোনওটাই তো আর বিরল নয় মানবজীবনে!
ইতিহাস বলে, ১৯৩০, অর্থাৎ যে সময়কালে এ গানের রচনা, বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ আত্মহত্যার হার ছিল হাঙ্গেরিতেই। বেকারত্বের জ্বালা সেখানকার বাসিন্দাদের ঠেলে দিয়েছিল চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে। এই আবহে গ্লুমি সানডের প্রতি জনসাধারণের আসক্তি, জন্ম দিল একের পর এক গা-ছমছমে গল্পের। তৎকালীন কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করল যে আত্মঘাতী ব্যক্তিদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে এ গানের লিরিক্স লেখা চিরকুট! বাঁচার বদলে মৃত্যুকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিতে শেখাচ্ছে এই গানটিই! শোনা যায়, বুদাপেস্টের এক আত্মঘাতী তরুণীর হাতে নাকি ধরাই ছিল গানটির স্বরলিপি! এক রেস্তরাঁর মালিকও নাকি আত্মহত্যা করার ঠিক আগের মুহূর্তে রেডিওতে শুনছিলেন ‘গ্লুমি সানডে’— ছড়িয়ে পড়ে এমন নানা গল্প।

কুখ্যাত এই ‘হাঙ্গেরিয়ান সুইসাইড সং’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দেশ থেকে দেশান্তরে। ১৯৪১ সালে আমেরিকান গায়িকা বিলি হলিডের কণ্ঠে সম্প্রচারিত হলে, ‘কাল্ট ক্লাসিকের’ তকমা জোটে গানটির ভাগে। তবু গুজব তার পিছু ছাড়ে না! মৃত্যু উসকে দিতে পারে, গানটির সম্প্রচারে তাই নিষেধাজ্ঞা জারি করল বিবিসি। বিমানেও বাজানো নিষিদ্ধ হল গানটি। কয়েক দশক ধরে চলল সেই নিষেধাজ্ঞা পর্ব।
তবে সবচাইতে করুণ কাহিনি বুঝি গানের স্রষ্টা সেরেসের। নাৎসিবাহিনীর ক্রমাগত অত্যাচার আরও বেশি হতাশার দিকে ঠেলে দিয়েছিল তাঁকে। সইতে না পেরে ১৯৬৮ সালে অবশেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন নিজেই! ‘গ্লুমি সানডে’র রচনা যদিও ইঙ্গিত দেয়, ভিতরে ভিতরে বহুকালই বাঁচার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছেন তিনি! বাকি সময়টুকু কেবল জীবনের বোঝা বহন করে যাওয়া!
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
নারীপাচার রুখতে বাংলার পুলিশের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’! ড্রোন উড়িয়ে উদ্ধার ১৭ কিশোরী
-
পোলিও টিকাকরণে ‘লাস্ট বেঞ্চার’ কলকাতা, সেরার সেরা কোন জেলা?
-
তদন্তের নামে প্রহসন হয়েছে! ১৪ বছর পর বরুণ বিশ্বাস খুনের বিচার চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে পরিবার
-
ওপেনিংয়েই ধাক্কা ‘আলফা’র! বক্স অফিসে ব্যবসা বাড়াতে ‘নেগেটিভ পাবলিসিটি’ই কি অস্ত্র আলিয়ার?
-
দুই বিদেশি মহিলাকে অপহরণ করে গণধর্ষণ, পাকিস্তানের নাক কাটল খোদ উপপ্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়