Mohun Bagan

মরণোত্তর মোহনবাগান রত্নে ভূষিত অঞ্জন মিত্র, আনন্দাশ্রু স্ত্রী-মেয়ের, আবেগে ভাসল ভক্তরা

ক্লাবের প্রতি আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে চালু হওয়া সেই সম্মানই ২০২৬ সালে এসে উঠল অঞ্জন মিত্রর হাতেই। যে মানুষটি এই পথ দেখিয়েছিলেন, উত্তর প্রজন্ম তাঁকেই জানাল শ্রদ্ধা।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: জুলাই ৩১, ২০২৬, ১০:২০

options
link
মরণোত্তর মোহনবাগান রত্নে ভূষিত অঞ্জন মিত্র, আনন্দাশ্রু স্ত্রী-মেয়ের, আবেগে ভাসল ভক্তরা
ছবি: পিন্টু প্রধান।

বৃহস্পতিবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে মোহনবাগান দিবসের দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে একটা বৃত্ত যেন শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হল। ২০০১ সালে মোহনবাগান রত্ন সম্মানের সূচনা করেছিলেন তৎকালীন সচিব অঞ্জন মিত্র। ক্লাবের প্রতি আজীবন অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে চালু হওয়া সেই সম্মানই ২০২৬ সালে এসে উঠল তাঁর হাতেই। যে মানুষটি এই পথ দেখিয়েছিলেন, উত্তর প্রজন্ম তাঁকেই জানাল শ্রদ্ধা।

Advertisement

২৯ জুলাই মোহনবাগান মাঠে ঐতিহ্যবাহী পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। পাশাপাশি প্রাক্তন মোহনবাগান ফুটবলারদের নিয়ে একটি প্রদর্শনী ম্যাচও হয় সেদিন। আর এদিন ছিল সাংস্কৃতিক ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। সেখানেই মরণোত্তর সর্বোচ্চ সম্মান ‘মোহনবাগান রত্ন’ পেলেন অঞ্জন মিত্র। তাঁর স্ত্রী সুজাতা মিত্রের হাতে তুলে দেওয়া হল এই সম্মান। এমন সম্মান পেয়ে আবেগাপ্লুত তাঁর স্ত্রী ও কন্যা। আনন্দাশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না তাঁরা। পুরস্কারের মঞ্চে অঞ্জনকন্যা সোহিনী মিত্র বললেন, “বাবার হাত ধরেই প্রথম মোহনবাগান ক্লাবে আসা। বাবা সব সময় বলত, কোনও কিছুই স্ট্যাটিক নয়। মা যদি পাশে না থাকত, তাহলে হয়তো এই জায়গায় বাবা পৌঁছতে পারত না।” মোহনবাগান রত্নের পুরস্কারমূল্যের সঙ্গে অঞ্জন মিত্রের পরিবারের অতিরিক্ত আর্থিক অনুদান যুক্ত করে সেই অর্থ তুলে দেওয়া হল মোহনবাগান ক্লাবের মালিদের হাতে।

Advertisement

মোহনবাগানের ইতিহাসে অঞ্জন মিত্র শুধুই এক প্রশাসকের নাম নন। তিনি এক যুগের প্রতীক। টুটু বোসের সঙ্গে তাঁর জুটি বদলে দিয়েছিল ক্লাব প্রশাসনের চেহারা। ১৯৭৫ সালে ইস্টবেঙ্গলের কাছে পাঁচ গোলে হার দু’জন গ্যালারিতে বসেই দেখেছিলেন। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্ন– একদিন মোহনবাগানের হাল ধরবেন। পরে ধীরেন দে-র হাত ধরে সেই স্বপ্নের পথেই হাঁটা শুরু। পাঁচ বছর হিসাবরক্ষকের কাজ করার পর টানা ২৩ বছর সচিবের দায়িত্ব সামলেছেন অঞ্জন মিত্র। তাঁর আমলেই মোহনবাগান একের পর এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু দেশীয় ফুটবলার নয়, বিদেশিদেরও দলে আনার সাহসী সিদ্ধান্ত সেই সময়েই বাস্তবায়িত। ভারতীয় ক্লাব ফুটবলের বদলে যাওয়া মানসিকতার অন্যতম সূচনা বলা যায় সেটাকেই।

Advertisement

অঞ্জন মিত্র বুঝেছিলেন, শুধু আবেগ দিয়ে বড় ক্লাব চলে না। প্রয়োজন পেশাদার পরিকল্পনা। প্রয়োজন স্পনসর। সেই ভাবনারই বাস্তব রূপ দেখা গিয়েছিল তাঁর প্রশাসনে। তাঁর উদ্যোগেই কলকাতায় এসেছিলেন ফিফা সভাপতি শেপ ব্লাটার। মোহনবাগানে পা রেখেছিলেন দিয়েগো মারাদোনা। অলিভার কানের বিদায়ী ম্যাচ কলকাতায় আয়োজনের নেপথ্যেও ছিল তাঁর উজ্জ্বল ভূমিকা। কেবল তারকা আনাই নয়, ভবিষ্যৎ গড়ার দিকেও ছিল সমান নজর। টিএফএ-র দ্বিতীয় ব্যাচের ফুটবলারদের মোহনবাগানে এনে নতুন দিশা দেখিয়েছিলেন। ২০০২ সালে দুর্গাপুরে গড়ে তুলেছিলেন মোহনবাগান সেল ফুটবল অ্যাকাডেমি, যা ছিল তাঁর স্বপ্নের প্রকল্প। প্রণয় হালদার, শৌভিক চক্রবর্তীর মতো বহু কৃতী ফুটবলার এখানে তৈরি হয়েছেন। অঞ্জনের সময়েই মহিলা ফুটবল দল তৈরি হয়েছিল। জাতীয় লিগ ও আই লিগের সাফল্যও এসেছে সেই অধ্যায়েই।

তবে অঞ্জন মিত্রকে আলাদা করে চেনাত তাঁর আপসহীন মনোভাব। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে কখনও পিছিয়ে যাননি। আইএফএ, এআইএফএফের কোনও সিদ্ধান্ত ক্লাবের স্বার্থবিরোধী বলে মনে হলে প্রকাশ্যেই সরব হয়েছেন। সেই কারণেই তিনি শুধু মোহনবাগানের অঞ্জন মিত্র নন, হয়ে উঠেছিলেন গোটা ময়দানের ‘অঞ্জনদা’। এবার মরণোত্তর মোহনবাগান রত্ন হয়ে সেই অঞ্জন মিত্র যেন ফিরে এলেন নিজেরই তৈরি করা মঞ্চে। ক্লাবের এই সম্মান তাই শুধু একটি পুরস্কার নয়, একটা যুগের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যে হাতে একদিন রত্নের সূচনা হয়েছিল, আজ সেই হাতেই রত্নের সম্মান– এর চেয়ে অমায়িক পরিণতি আর কী-ই বা হতে পারে!

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ মরশুমের সেরা ফুটবলারের (শিবদাস ভাদুড়ি পুরস্কার) সম্মান পেলেন আলবার্তো রডরিগেজ। বিশেষ পুরস্কার পেয়ে তিনি বললেন, “ভারতের সেরা ক্লাবে খেলতে পেরে আমি গর্বিত।” সেরা ফরোয়ার্ড (সুভাষ ভৌমিক পুরস্কার) লিস্টন কোলাসো। সেরা যুব ফুটবলারের পুরস্কার পান সুহেল আহমেদ ভাট। এছাড়া সেরা ক্রীড়া সাংবাদিক হিসাবে (মতি নন্দী পুরস্কার) সম্মানিত হলেন গৌতম ভট্টাচার্য। পুরস্কারের মঞ্চে নানান অজানা কথা দর্শকদের সঙ্গে ভাগ করে নেন তিনি। সেরা ক্রীড়া সংগঠকের (অঞ্জন মিত্র পুরস্কার) মরণোত্তর সম্মান পান গোপীনাথ ঘোষ।

এখানেই শেষ নয়। সেরা রেফারি অ্যাওয়ার্ড পান সাগর সেন। হকির বর্ষসেরা কেশব দত্ত পুরস্কার পেলেন মহম্মদ রহিল মহসিন। অ্যাথলেটিক্সে প্রণব বন্দ্যোপাধ্যায় পুরস্কার তাহুরা খাতুনের। ক্রিকেটে অরুণ লাল পুরস্কার পান অভিষেক রমন। সেরা সমর্থকের (উমাকান্ত পালধি পুরস্কার) পুরস্কার পেপেন রাজীব রায় ও সৌরভ ঘোষ চক্রবর্তী। আজীবন সম্মাননা দেওয়া হবে প্রতাপ ঘোষকে। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে মোহনবাগান রত্ন প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অসিত চট্টোপাধ্যায়কে ক্লাবের সহ-সভাপতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। 

কে ছিলেন না এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে? রাজনৈতিক তারকা থেকে সফল ক্রীড়াবিদ। ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ থেকে শুরু করে, শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত, বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসু। ছিলেন মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, দীপক বর্মনও। বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের পাশে তখন উপস্থিত তরুণজ্যোতি তিওয়ারি, রীতেশ তিওয়ারি। ছিলেন জিষ্ণু বসুও। পাশাপাশি ভারতের প্রাক্তন অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের গৌরবময় উপস্থিতিতে নেতাজি ইন্ডোর তখন জমজমাট। এসেছিলেন এআইএফএফ সভাপতি কল্যাণ চৌবে। ক্রীড়ামন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ বললেন, “মোহনবাগান সমর্থকরা ভারতের লাইভলিয়েস্ট সমর্থক।”

বিশেষ সংবর্ধনা দেওয়া হল মোহনবাগান কোচ প্যানাজিওটিস ডিলম্পেরিসকেও। তিনি বলেন, “মোহনবাগান পরিবারে যোগ দিতে পেরে আমি গর্বিত।” ক্লাব সভাপতি দেবাশিস দত্ত গ্রিক কোচের উদ্দেশে বলেন, “মোহনবাগান দেশের প্রাচীনতম ক্লাব। এক নম্বর ক্লাব। বছরের পর বছর চ্যাম্পিয়ন হয়ে নিজের ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এবার আপনার হাত ধরে আমরা ডুরান্ড জিতব। জিতব আইএসএলও। আপনার উপর আমাদের সকলের ভরসা আছে।” তাছাড়া ফেডারেশন সভাপতি কল্যাণ চৌবেকে নিরপেক্ষ থাকার আবেদন জানালেন সচিব সচিব সৃঞ্জয় বোস। অনুষ্ঠানের শুরুতে মোহনবাগান জনতার হৃদয়ের গান ‘আমাদের সূর্য মেরুন’ গেয়ে মঞ্চ মাতিয়েছিলেন জয়তী চক্রবর্তী। আর শেষটা হল সুদেশ ভোঁসলের গানে গানে। 

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.