Brazil Football Team

ব্রাজিল ড্রেসিংরুমে ক্ষোভের ঝড়, টিম বাসে না গিয়ে একাই ফিরে গেলেন নেইমার

পরের ম্যাচে হাইতির বিরুদ্ধে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু মেটলাইফের এই বিপর্যয় দেখার পর মনে হচ্ছে, বাস্তবটা বড্ড কঠিন। আপাতত হাইতি ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কীই বা করতে পারি?

Advertisement ad
দুলাল দে
দুলাল দে

শেষ আপডেট: জুন ১৫, ২০২৬, ১৪:৪৪

options
link
ব্রাজিল ড্রেসিংরুমে ক্ষোভের ঝড়, টিম বাসে না গিয়ে একাই ফিরে গেলেন নেইমার zoom
নেইমার। ফাইল ছবি।

নিতান্তই ভুল করে ঠিক ‘এক্সিট’ গেটটা দিয়ে বের না হলে ব্রাজিলের (Brazil Football Team) ড্রেসিংরুমের এই ফাটলটা কি সত্যিই জানতে পারতাম? ঈশ্বর বোধহয় মাঝে মাঝে এমন কিছু ভুল রাস্তা খুলে দেন, যা সোজা পৌঁছে দেয় ট্র্যাজেডির অন্দরমহলে। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামের সেই নিস্তব্ধ, ভারী বাতাসে তখন একটাই গন্ধ, তা একমাত্র সেলেকাওদের ড্রেসিংরুমের ক্ষোভের।

ম্যাচ শেষ। প্রেসবক্স থেকে ভুল দরজা দিয়ে স্টেডিয়াম ছাড়াতে গিয়ে দেখি, সামনে ব্রাজিলের টিম বাস। যেন কোনও যুদ্ধক্ষেত্রের সেনা ছাউনি। নিরাপত্তারক্ষীদের চোখে চিল-দৃষ্টি। হাতে উদ্যত আগ্নেয়াস্ত্র। সেই দরজা দিয়েই এক এক করে বেরচ্ছেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র, রাফিনহারা। সবার আগে যিনি বেরলেন, তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হতে পারে একটু আগেই হয়তো রোম সাম্রাজ্যের পতন দেখে এসেছেন! তিনি আর কেউ নন, কার্লোস আন্সেলোত্তি। গম্ভীর, থমথমে, চিবুক শক্ত। পিছনে ভিনিসিয়াস। মাথাটা এতটাই নিচু যে মাটির ঘাস গুনছেন কি না বোঝা দায়। অ‌্যালিসন, গ্যাব্রিয়েলরা বেরলেন যেন শ্মশানের স্তব্ধতা গায়ে মেখে।

The Brazil football team in a practice session
অনুশীলনে ব্রাজিল ফুটবলাররা। ফাইল ছবি।

কিন্তু, কোথায় নেইমার? আমরা, মানে আমি আর ব্রাজিলের ‘গ্লোবো’ সংবাদমাধ্যমের গোটা তিনেক সাংবাদিক চাতক পাখির মতো চেয়ে আছি। প্রায় চল্লিশ মিনিট ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর গ্লোবোর সাংবাদিকরা যখন ফোন-টোন ঘুরিয়ে খবরাখবর নিলেন, তখন হাটে হাঁড়ি ভাঙল। নেমার নাকি অনেক আগেই চুপিচুপি স্টেডিয়াম ছেড়ে হাওয়া! খেলেননি, তাই মিক্সড জোনে আসার দায় নেই। আর আমেরিকার মাটি ছোঁয়া ইস্তক তাঁকে নিয়ে যে পরিমাণ মুন্ডুপাত হয়েছে, তাতে ব্রাজিলীয় মিডিয়ার ছায়াও মাড়াচ্ছেন না তিনি। সংবাদিক বন্ধুরা জানালেন, সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর এখন এতটাই খারাপ সম্পর্ক যে, কোনও সংবাদমাধ্যমকেই ইন্টারভিউ দিচ্ছেন না। যেদিকে সংবাদমাধ্যম থাকে, তার উলটো দিক থেকে হাঁটা দেন। আর সেই কারণেই ম্যাচ শেষে টিম বাসে না গিয়ে একা, নিজের মতো করে নিঃশব্দে কেটে পড়লেন। চোটের জন্য মাঠে নেই, মাঠের বাইরেও তিনি যেন এক রহস্যময় একাকী দ্বীপ।

আসল বোমাটা ফাটালেন গ্লোবোর সেই সাংবাদিকরা। ম্যাচের বিরতিতে আর ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমে যা ঘটেছে, তাকে এক কথায় বলা যায়, লাভা উদগীরণ! আন্সেলত্তি নাকি ফুটবলারদের ‘উত্তম-মধ্যম’ দিয়েছেন! শুধু কোচই নন। ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন ফুটবলাররাও। বিরতির সময় নাকি ড্রেসিংরুমে দাঁড়িয়ে সটান ক্ষোভ উগরে দেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। বলেছেন, “মিডফিল্ড থেকে যদি বল সাপ্লাই না আসে, আমি একা কী করব?’’ কাসেমিরো, ব্রুনো গুইমারেসদের মতো সিনিয়রদের আবার উলটো রাগ। তাঁরা নাকি খোলাখুলিই বলছেন, মাঠে কার ভূমিকা কী, সেটাই তাঁদের কাছে পরিষ্কার নয়! মাঝমাঠ আর ডিফেন্সের মাঝে যে বিশাল গ্যাপ, সেখান দিয়েই তো মরক্কো গোলটা করে গেল। তার থেকেও ফুটবলাররা নাকি বুঝতেই পারছেন না, সাম্বার সেই চিরন্তন ছন্দ হারিয়ে ভিনিসিয়াসরা কি তবে ইউরোপীয় ঘরানার এক যান্ত্রিক, প্রাণহীন, রোবোটিক ফুটবলের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছেন? ব্রাজিল শিবিরে এখন এই প্রশ্নটাই ধাক্কা খেয়ে ঘুরে বেরচ্ছে।

Brazil Football Team coach Carlo Ancelotti said that his team is struggling to accept the dropped points
কার্লো আন্সেলোত্তি। ফাইল ছবি।

অথচ, এই আগ্নেয়গিরির উপর দাঁড়িয়েও আন্সেলোত্তি যখন প্রেস কনফারেন্সে এলেন, তাঁর পেশাদারি হাসি দেখে বোঝার সাধ্য নেই ভেতরে কী তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেছে। পুরো ব্যাপারটা কী অদ্ভুত পেশাদারি ঢংয়ে নিয়ন্ত্রণ করলেন। ড্রেসিংরুমের এই গৃহযুদ্ধকে এক ঝটকায় বানিয়ে দিলেন ‘জেতার খিদে’-তে! ঠোঁটের কোনে হালকা হেসে বললেন, “ছেলেরা হারতে চায় না বলেই তো এই ক্ষোভ, এই রাগ। পয়েন্ট হারিয়েও যদি কেউ হাসিমুখে বসে থাকে, সেটা অবশ্যই চিন্তার। আমার ছেলেরা কেউ এই পয়েন্ট হারানোটা মেনে নিতে পারছে না।’’

ড্রেসিংরুমের আগুনকে জেতার খিদের তকমা দিয়ে পুরো বিষয়টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিলেন। তবে হ্যাঁ, আন্সেলোত্তিও মেনে নিয়েছেন, নেইমারের অভাব প্রথম ম্যাচেই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন তিনি। ভিনিসিয়াসকে কেন বাকিরা ওভারল্যাপে গিয়ে সাহায্য করল না, তা নিয়ে উষ্মাও প্রকাশ করলেন। পরক্ষণেই স্বগোতোক্তির মতো বললেন, “ব্রাজিলের কোচের চেয়ারটা বড্ড গরম। তবে আমি তো জেনেশুনেই এই আগুনে হাত দিয়েছি।” ম্যাচ শুরুর আগে মেটলাইফের বাইরে যে হলুদ-সবুজের সুনামিটা দেখছিলাম, ড্রামের আওয়াজ আর চেনা সাম্বা নাচের যে হিল্লোল উঠেছিল, ম্যাচ শেষে সেই চেনা ব্রাজিলীয় সমর্থকদেরই দেখলাম অঝোরে কাঁদতে। আন্সেলোত্তি সব শুনে আবেগপ্রবণ হয়ে বললেন, “সমর্থকদের কান্নাটা আমাদের জন্য সত্যিই হৃদয়বিদারক। তবে এই চোখের জল বৃথা যাবে না।”

ইউরোপ কাঁপানো প্রতিভার অভাব নেই এই ব্রাজিলে। কিন্তু অভাব একটাই, দলের ‘এক্স ফ্যাক্টর’। যিনি একার হাতে মাঠের মধ্যে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন। পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচের ভাগ্য ছিনিয়ে নিতে জানেন। নেইমারবিহীন এই দলটায় সেই ‘লিডার’ কোথায়? সাংবাদিক সম্মেলনে বসে কোচ যতই বলুন, পরের ম্যাচে হাইতির বিরুদ্ধে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু মেটলাইফের এই বিপর্যয় দেখার পর মনে হচ্ছে, বাস্তবটা বড্ড কঠিন। আপাতত হাইতি ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ছাড়া আর কীই বা করতে পারি?

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন