এক মাস পরে অবশেষে হালকা হলেও প্র্যাকটিসে নামলেন নেইমার (Neymar)। কিন্তু তার মানে এই নয় যে ফিলাডেলফিয়ায় হাইতির (Haiti) বিরুদ্ধে পরের ম্যাচে তাঁকে প্রথম একাদশে রেখেই দল সাজাচ্ছেন কোচ আন্সেলোত্তি। ম্যানহাটন থেকে ফিলাডেলফিয়াগামী ট্রেনের কামরাগুলোয় এখন শুধুই হলুদ-সবুজ রঙের কোলাজ। কিছু সমর্থক অবশ্য নিউ ইয়র্কের রাস্তায় এখনও জটলা পাকাচ্ছেন। হিসাব কষছেন, ১৯ জুন হাইতি ম্যাচের ঠিক আগে সরাসরি ট্রেনে চেপে বসলেই তো হল! ট্রেন হোক কিংবা ছ্যাকড়া গাড়ি, সমর্থকেরা ঠিক পৌঁছে যাবেন ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারিতে।
এই বিষয়ে আরও খবর
কিন্তু যে প্রশ্নটা ম্যানহাটনের হাডসন নদী থেকে রিও-র কোপাকাবানা বিচ পর্যন্ত চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে, তা হল, ব্রাজিল (Brazil) কি আদৌ পারবে নিজস্ব চেনা ছন্দটা খুঁজে পেতে? সেলেকাওরা কি আদৌ পৌঁছাতে পারবে নকআউটের নিরাপদ বন্দরে? এই যাবতীয় উত্তর আর অনুত্তরের ঠিক মাঝখানটিতে একা দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন। নেইমার দ্য সিলভা স্যান্টোস জুনিয়র। মরক্কোর সঙ্গে ওই জঘন্য ১-১ ড্র-টার পর একটা সত্য অন্তত দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, মাঠে নেইমার থাকা আর না থাকার ফারাকটা ঠিক কতটা আকাশপাতাল!
যে প্রশ্নটা ম্যানহাটনের হাডসন নদী থেকে রিও-র কোপাকাবানা বিচ পর্যন্ত চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে, তা হল, ব্রাজিল কি আদৌ পারবে নিজস্ব চেনা ছন্দটা খুঁজে পেতে? সেলেকাওরা কি আদৌ পৌঁছাতে পারবে নকআউটের নিরাপদ বন্দরে?
গত ১৭ মে স্যান্টোসের জার্সিতে যখন কাফ মাসলে গ্রেড-২ চোটটা লাগল, তখনই একটা মৃদু কম্পন টের পাওয়া গিয়েছিল ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের মনে। তখনও অনেকে বুক বেঁধেছিলেন, হয়তো হাইতির বিরুদ্ধে কিছুক্ষণের জন্য হলে খেলিয়েও স্কটল্যান্ড ম্যাচের আগে তাঁকে ম্যাচ ফিট করে নেওয়া যাবে। কিন্তু সোমবার সকালে নিউ জার্সির হাওয়া যে খবরটা বয়ে এনেছিল,তা শোনার পর ব্রাজিলের টিম ম্যানেজমেন্টের কপালে শুধু ভাঁজ নয়, রীতিমতো মাথায় হাত পড়ে গিয়েছিল! নতুন এমআরআই রিপোর্ট আর মেডিকেল টেস্টের নির্যাস যা বলছে, তাতে গ্রুপ পর্বের বাকি দুটো ম্যাচে নেইমারের (Neymar) মাঠে নামার সম্ভাবনা কার্যত শূন্য। গতকাল চিকিৎসকেরা পরিষ্কার ফতোয়া জারি করে দিয়েছিলেন, কোনও রকম তাড়াহুড়ো বা ঝুঁকি নেওয়া চলবে না। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে সেলেকাওদের প্র্যাকটিসে যা ঘটল, তারপর তো ব্রাজিলিয়ান সমর্থকদের মুখে চওড়া হাসি। প্রায় এক মাস পর বল নিয়ে হালকা অনুশীলন শুরু করলেন নেইমার জুনিয়র। আর এই খবর ব্রাজিল শিবির থেকে বেরিয়ে পড়তেই ব্রাজিলিয়ান সমর্থকরা ফের দলকে নিয়ে আশা দেখতে শুরু করেছেন।
মোটামুটি রোজই মিনিট পনেরোর জন্য সংবাদমাধ্যমকে প্র্যাকটিস দেখতে দেন কোচ আন্সেলোত্তি। কিন্তু এদিন শুরুতেই জানিয়ে দেন, কোনও মিডিয়াকে প্র্যাকটিসে ঢুকতে দেওয়া হবে না। হাজির থাকতে পারবেন, শুধুমাত্র ফুটবলারদের পরিবারের সদস্যরা। সেইমতো সকালেই শুরু ‘ক্লোজড ডোর’ অনুশীলন। পরে জানা যায়, প্রায় ১ মাস পর এদিন অনুশীলনে নামলেন নেইমার। সেই কারণেই ‘ক্লোজড ডোর অনুশীলন’। তবে ফুটবলারদের সঙ্গে কোনও রকম অনুশীলন করেননি। যা করেছেন, আলাদা। এই খবরে অবশ্য এখনই বিশাল খুশি হওয়ার মতো কিছু হয়নি ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য। কারণ, নেইমারকে নিয়ে নক আউটের আগে কোনওরকম ঝুঁকিই নিতেই চাইছে না টিম ম্যানেজমেন্ট। এদিন নেইমার হালকা অনুশীলনের পর টিম ম্যানেজমেন্টের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চোট কাটিয়ে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠছেন নেমার। এই অবস্থায় জোর করে হাইতি ম্যাচে নামিয়ে দিলে চোটের জায়গায় বিপদ আরও বাড়তে পারে। তাই কোচ কার্লো আন্সেলোত্তির থিঙ্ক ট্যাঙ্ক তড়িঘড়ি ‘প্ল্যান বি’ সাজিয়ে ফেলেছে। আপাতত নেইমারের নতুন শিডিউল বলতে, কঠোর জিম সেশন, ফিজিওথেরাপি আর মাঠের এক কোণে বল নিয়ে একা-একা হালকা দৌড়। আর তাতে হাইতির বিরুদ্ধে মাঠে নামার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। এমনিতে নেইমারকে মাঠে নামানো নিয়ে আন্সেলোত্তির টার্গেট হল, রাউন্ড অফ ৩২-এর ম্যাচ। তবেই দশ নম্বর জার্সিকে স্কটল্যান্ড ম্যাচে একবার কিছুক্ষণের জন্য হলেও নামানোর চেষ্টা হবে। তাতে নক আউটে প্রথম থেকে খেলানো যাবে।
মরক্কোর সঙ্গে ওই জঘন্য ১-১ ড্র-টার পর একটা সত্য অন্তত দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, মাঠে নেইমার থাকা আর না থাকার ফারাকটা ঠিক কতটা আকাশপাতাল!
কিন্তু প্রশ্নটা তো অন্য জায়গায়। মরক্কো ম্যাচের পর দলের যা পরিস্থিতি, তাতে নেমারকে ছাড়া নকআউটের ছাড়পত্র কি আদৌ পাবে ব্রাজিল? আর এখানেই এই রূপকথার আসল টুইস্ট! মাঠে তিনি নামতে পারছেন না, অথচ পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমে তিনিই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ‘ফ্যাক্টর’। অবাস্তব মনে হলেও এটাই খাঁটি সত্যি। ড্রেসিংরুমের রাশ ধরে রাখার জন্য আন্সেলোত্তি এখন সবচেয়ে বেশি ভরসা করছেন তাঁর এই চোটাক্রান্ত সেনাপতির ওপর।
ব্রাজিলের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার দিন কত পন্ডিতই না ভুরু কুঁচকেছিলেন! একশো ভাগ ফিট না থাকা একটা ফুটবলারকে কেন বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) মতো আসরে বয়ে বেড়ানো? উত্তরটা এখন পাওয়া যাচ্ছে ব্রাজিলের অন্দরমহল থেকে। বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম ‘গ্লোবো’-র সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝলাম, ড্রেসিংরুমে নেমার আসলে একটা অদৃশ্য প্রতিরক্ষামূলক ঢাল। কাসেমিরো কিংবা রাফিনহার মতো সিনিয়রেরা আড়ালে স্বীকার করছেন, নেমার স্কোয়াডে থাকা মানে মিডিয়া, ক্যামেরা আর সমালোচকদের যাবতীয় বিতর্ক আর স্পটলাইট একাই নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেওয়া। ওই এক চোট আক্রান্ত ফুটবলারটি মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে সমস্ত চাপ নিজের গায়ে এমনভাবে মেখে নিচ্ছেন, যাতে ভিনিসিয়াস জুনিয়র বা এন্ড্রিকের মতো তরুণ তুর্কিরা কোনও মানসিক বোঝা ছাড়াই ড্রেসিংরুমে প্রাণখুলে হাসতে পারেন, মাঠে নিজেদের উজাড় করে দিতে পারেন।
কার্লোর বুদ্ধিমত্তার চালটা ঠিক এখানেই। আন্সেলোত্তি খুব ভালো করে জানেন, বিশ্বকাপ (FIFA World Cup 2026) জিততে হলে শুধু পায়ে ফুটবল খেললে চলে না, মগজাস্ত্রের নিয়ন্ত্রণটাও জরুরি। নেইমারকে তিনি দলে রেখেছেন কেবল মাঠের ভিতরের নিয়ন্ত্রণকর্তা হিসেবে নয়, ড্রেসিংরুমের পরম অভিভাবক হিসেবে। প্রথম ম্যাচের পর ড্রেসিংরুমের পরিবেশ যখন মারাত্মক থমথমে, তখন নেইমারই নাকি এগিয়ে গিয়ে জুনিয়রদের পিঠ চাপড়ে তাতাচ্ছেন, বলছেন, ‘‘ভেঙে পোড়ো না, আসল লড়াই এখনও বাকি।’’
হাইতি ম্যাচের আগে আক্রমণভাগেও বড়সড় ওলটপালটের ইঙ্গিত দিচ্ছেন আন্সেলোত্তি। ব্রাজিল শিবিরের খবর সেরকমই। কিন্তু তাঁর মাস্টারপ্ল্যানের আসল ভরকেন্দ্র কিন্তু ওই রিজার্ভ বেঞ্চে বসে থাকা, রিহ্যাবে লড়তে থাকা নেইমারই। মাঠে না থেকেও যিনি এই মুহূর্তে ড্রেসিংরুমের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। নেইমার এরকমই। ১৯ জুন ফিলাডেলফিয়াতে হয়তো তিনি নামবেন না, কিন্তু ব্রাজিলের হলুদ জার্সির প্রতিটা সুতোয় জড়িয়ে থাকবে তাঁরই অদৃশ্য উপস্থিতি। কারণ, নেইমার শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটা আস্ত মনস্তাত্ত্বিক বর্ম!
এই বিষয়ে আরও খবর
সর্বশেষ খবর
-
‘জঙ্গিদের পুষছে’, নিজেদের ‘ব্যর্থতা ঢাকতে’ আফগানিস্তানে ফের হামলা পাকিস্তানের, নিশানায় সুপ্রিম লিডার?
-
উৎসবের মরশুমে নিষিদ্ধ লেজার লাইট, বাজি পড়ানোতেও বিধি নিষেধ বম্বে হাই কোর্টের
-
দীর্ঘদিন ধরে বেহাল রাস্তা, অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা মেরামতির কাজে দিলেন বিজেপি নেতার স্ত্রী
-
গুলি খেয়েও বেপরোয়া রণবীর কাপুর! ‘লাভ অ্যান্ড ওয়ার’-এর রক্তাক্ত লুকে ফেরালেন ‘অ্যানিম্যাল’ স্মৃতি
-
সুপ্রিম দরবারে অমীমাংসিত তৃণমূলের ‘প্রতীক-যুদ্ধ’, ফয়সলা কবে? জানতে চাইল আদালত



