বিশ্বকাপের মহাকাব্যে বিদায় এক যোদ্ধার। আর তাঁকে পরীক্ষা দিতে হবে না। হ্যাঁ, লোকে বলবে ঝুলিতে বিশ্বকাপ নেই। ফের ফেনিয়ে তুলবে লিওনেল মেসির সঙ্গে ‘গোট’ বিতর্ক। কী যায়ে আসে? ব্যঙ্গবাণ ছোড়ার আগে একটু দাঁড়িয়ে যান পথিকবর। তিষ্ঠ ক্ষণকাল। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আপন ভুবনে আপনাকে স্বাগত জানাই। এই পৃথিবীতে কোনও ঐশ্বরিক শক্তির আবির্ভাব নেই। এখানে একজন মানুষ প্রতিদিন ঈশ্বরকে চ্যালেঞ্জ করেন। সেই ঈশ্বর প্রতি মুহূর্তে পরীক্ষা নেন। সেই মারের সাগর পাড়ি দিয়ে আরও একবার লড়াইয়ের রিংয়ে নেমেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। হল না। শেষবার সর্বস্ব দিয়ে নিজের পরীক্ষা দিলেন। নিজেকে প্রমাণ করার পথচলা যে তাঁর ফুরোয় না। পথের দেবতা প্রসন্ন হেসে বলেন, “পথ আমার তখনও ফুরোয় না। চলে, চলে, এগিয়েই চলে…”
আরও পড়ুন:
‘হয়তো’, ‘সম্ভবত’- কথাগুলোর আর কোনও মূল্য নেই। জল্পনা অতীত। পরের বারও বিশ্বকাপ খেলবে পর্তুগাল। নতুন প্রজন্ম, নতুন রক্ত। ঘাম-রক্ত ঝরাবেন একঝাঁক উঠতি পর্তুগিজ তারকা। সঙ্গে নিশ্চয়ই পাবেন আজকের দিনের প্রতিষ্ঠিত ফুটবলারদের। থাকবেন না শুধু একজন। ক্যামেরা ঘুরে যাবে গ্যালারির দিকে। এক বহু পরিচিত মুখ সেখানে হাসছেন নতুনদের সাফল্য দেখে। আনন্দে চিৎকার করছেন, গোল মিস হলে আফসোস করছেন। পরমুহূর্তেই উৎসাহ দিচ্ছেন তাঁর দেশ পর্তুগালকে।
আরও পড়ুন:
খোঁচার মতো থেকে গেল বিশ্বকাপ ট্রফি। হাজার লড়াই করেও শেষে বলতে হয়, সব পেলে নষ্ট জীবন। শুধু পাদপ্রদীপের আলোর চকমকিটাই দেখলে তো হবে না। একটু ছাই ঘেঁটে খুঁজে দেখুন সাচ্চা ফুটবল ছিল কি না।
না, তখন আর তাঁর গায়ে মেরুন জার্সিটা থাকবে না। পিছনে লেখা থাকবে না সেই বিখ্যাত ৭ সংখ্যাটা। ২০৩০ বিশ্বকাপে তিনি আর প্রধান নায়ক নন। পার্শ্বচরিত্রও নন। ফুটবলের রঙ্গমঞ্চ থেকে দর্শকের আসনে নেমে আসা এক ‘প্রাক্তন’। যিনি বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলে ফেললেন আজ, স্পেনের বিরুদ্ধে।

‘শেষ ম্যাচ’, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর ‘শেষ ম্যাচ’। এখনও ফুটবলবিশ্বকে বিদায় জানাননি তিনি। ‘শেষ ম্যাচ’ শব্দটা লিখতে অস্বস্তি হয়। লিখে ফেলার পর অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। কি-বোর্ডে ব্যাকস্পেস আছে। না বলতে চাওয়া অনেক কথা মুছে ফেলা যায়। কিন্তু জীবন? চরৈবতি মন্ত্রে এগিয়ে চলতে চলতে সে যে কখন নির্মম হয়ে উঠবে, তার আন্দাজ করা ক্ষুদ্র মানুষের কাজ নয়। আভাস আগেই দিয়ে রেখেছিলেন। স্পেন ম্যাচের আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। মাথায় তখনও কথাটা গাঁথেনি। এখনও পুরোপুরি মানতে চাইছে না। সময় বয়ে যাবে নিজের ছন্দে, তখন শূন্যস্থান আরও স্পষ্ট হবে। সারা মাঠময় তাঁকে খুঁজে বেরোবে চোখ। নেই, বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবলার রোনাল্ডো আর নেই। স্পেনের কাছে হেরে তাঁর চোখে জল। তা সংক্রামিত হতে থাকবে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ। ঠিক যেভাবে কুড়ি বছর ধরে বিশ্বকাপকে মাতিয়ে রেখেছেন রোনাল্ডো। ফিগোর পাশে ১৭ নম্বর জার্সি থেকে ৭ নম্বর জার্সিকে নিজের নামে পরিচিত করে তোলা। পথের শেষে আজ ডেড এন্ড। পথের দুপাশে অসংখ্য রেকর্ডের মাইলফলক। ১৪৬টি আন্তর্জাতিক গোল। কেরিয়ারে ১০০০ গোল থেকে মাত্র কিছুটা দূরে। শুকনো তথ্য পরিসংখ্যানেই পাতার পর পাতা ভরে যেতে পারে। রেকর্ডের আরেক নাম রোনাল্ডো। রেকর্ডের বাইরেও আছে আরেক রোনাল্ডোর নাম। যে রোনাল্ডো আপনাকে প্রত্যাবর্তনের ম্যাজিক শেখায়। রাতবিরেতে দুঃস্বপ্ন এলে ৭ নম্বর জার্সিধারীর একটা হাত আপনাকে তুলে ধরতে এগিয়ে আসে। অন্য হাতে ধরা ঝুলিতে কখনও নেশনস লিগ, কখনও পাঁচটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, পাঁচটা ব্যালন ডি’অর, কখনও বা ইউরো কাপের শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফি।
খোঁচার মতো থেকে গেল বিশ্বকাপ ট্রফি। হাজার লড়াই করেও শেষে বলতে হয়, সব পেলে নষ্ট জীবন। শুধু পাদপ্রদীপের আলোর চকমকিটাই দেখলে তো হবে না। একটু ছাই ঘেঁটে খুঁজে দেখুন সাচ্চা ফুটবল ছিল কি না। পর্তুগালের মাদেইরার দরিদ্র পরিবারে বড় হয়ে ওঠা। আর্থিক অনটনের সঙ্গে নিত্য লড়াই করতে করতেই শরীরে ধারণ করেছেন অক্ষয় বর্ম। মানুষ দৈবের বিরুদ্ধে লড়ে। ব্যর্থ হয়। এটাই প্রমাণ, সে মহামানব। সব কিছু না জিতলেও হয়তো চলে। ঈশ্বরপ্রদত্ত শব্দটার সংজ্ঞা রোনাল্ডো বহুদিন হল বদলে দিয়েছেন। কী নিয়ে এসেছি, এটা এখন আর কোনও প্রশ্ন নয়। কথাটা হল, আজ নিজের আয়নায় আপনি কীরকম? আপনি কি আরও একটা দিন লড়াই করার জন্য তৈরি? রোনাল্ডো হওয়ার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এটাই। এই লড়াইটার নাম জীবন, এই লড়াইটার নাম ফুটবল। এরচেয়ে বড় শিক্ষা আর কী আছে? যেভাবে সুমন বলেন, ‘প্রতিদিন সূর্য ওঠে তোমায় দেখবে বলে, হে আমার আগুন, তুমি আবার ওঠো জ্বলে’। সুমনের গানের পঙক্তিরা ‘মাদেইরা, ম্যাঞ্চেস্টার, মাদ্রিদ, তুরিন অ্যান্ড ম্যাঞ্চেস্টার এগেইন’-এ মিলেমিশে যায়। সত্যিই তো ‘আ ওয়াকিং ওয়ার্ক অফ আর্ট’। ব্যর্থতা আসবে, সাফল্যও। জয় আমাদের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো ঝুলবে। যাতে খসে পড়া মাত্রই সাফল্যে দু-আধখানা না হয়ে যাই। এটুকু দোলাচলতা না থাকলে কি আর রোনাল্ডো হওয়া যায়? বয়স তাঁর চোখের কোনায় যতই ত্রিকোণামিতি খেলুক না কেন, তা ফুটবলার রোনাল্ডোকে আরও পরিপূর্ণতা দান করে।
নাই বা হল বিশ্বকাপ জেতা। আসলে রোনাল্ডো গোল করবেন, ম্যাচ জেতাবেন, এটাই স্বভাবসিদ্ধ ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। ব্যতিক্রম হলেই ধেয়ে আসে প্রশ্নবাণ। তাতে অবশ্য লাভই বেশি। ভালোবাসা তাঁকে শক্তি দেয়, আর ঘৃণা-ব্যঙ্গ করে তোলে আরও শক্তিশালী। বিশ্বকাপে গোল করে বলেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক।‘ না, পুরোপুরি ফেরা হল না। এবার শুধু বিচ্ছেদের বিষাদ। বিদায় পরিচিতা… বিশ্বকাপের মঞ্চকে বিদায় রোনাল্ডো…
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
লাস্ট ডান্সেও অধরা মাধুরী, স্পেনের কাছে হেরে শূন্য হাতেই বিশ্বকাপকে চিরবিদায় রোনাল্ডোর
-
কাচ বসানো বালা পরিয়ে বৃদ্ধার ৫০ লক্ষের হিরের গয়না হাতিয়ে পালায় আয়া! কী হল তারপর?
-
চুলের মুঠি ধরে মার! কলেজ প্রজেক্টের ছবি তুলতে গিয়ে হেনস্থার শিকার ৪ ছাত্রী
-
বাবা-ছেলেকে অপহরণ করে ১০ লক্ষ মুক্তিপণ দাবি! ধৃত ৩
-
নদীর চড় দখল করে বেআইনি নির্মাণ! ক্রমেই বাড়ছে হড়পা বানের আশঙ্কা