Gaza

এক ঠোঙা ভুট্টা আর একটা সিনেমা! যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে গাজার জেন জি-কে জোগাচ্ছে অক্সিজেন

যত সময় যাচ্ছে, রুপোলি পর্দাতেই যেন নিজেদের জীবন নতুন করে দেখছে কিশোর-কিশোরীরা।

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ২৬, ২০২৬, ১৮:১৩

options
link
এক ঠোঙা ভুট্টা আর একটা সিনেমা! যুদ্ধের ভয়াবহতার মাঝে গাজার জেন জি-কে জোগাচ্ছে অক্সিজেন

বছর তিনেক ধরে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই প্রায় দেখেনি ওরা। বোমা-গুলিতে নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। চোখের সামনে খেলার মাঠকে সেনা ক্যাম্প হতে দেখেছে। স্কুল, ক্লাস, কোচিং – সেসবের পাট তো কবেই চুকেছে। নিকষ কালো এই রোজনামচার মাঝে তাদের ‘দু’দণ্ড শান্তি’ এক ঠোঙা ভুট্টা আর একটা সিনেমা, কার্টুন অথবা রুপোলি পর্দায় চলমান কোনও গেম। বলা হচ্ছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার কথা। গাজায় সিনেমা! শুনে ভাবছেন, এ কী অলীক কথা? কিন্তু কথাতেই তো আছে, সত্য কল্পনার চেয়েও বিস্ময়কর। আর তাই যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা স্ট্রিপে সপ্তাহে একদিন ‘সিনেমা ডে’। টিকিটের সঙ্গে পপকর্ন ফ্রি। ভয়ে ভরা নিত্যদিনের সময় থেকে ‘রিয়েল লাইফ’ ছেড়ে কিশোর-কিশোরীরা ডুব দিচ্ছে ‘রিল লাইফে।’ তারা বলছে, ‘‘মনে হয় যেন অন্য দুনিয়ায় চলে যাচ্ছি।”

Advertisement
যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজা, ছবি: সংগৃহীত

১৪ বছরের মেয়ে নাতালি আল হাতুম। গাজার রেমাল এলাকায় নিজেদের বাড়ি ছিল। কিন্তু যুদ্ধে সেসব ভেঙেচুরে যাওয়ার পর তারা এখন মধ্য গাজার এক কামরার ফ্ল্যাটে থাকে সবাই মিলে। সপ্তাহের একটা দিন তার বড় আনন্দের দিন। সকাল সকাল উঠে তৈরি হয়ে মাকে ‘টাটা’ বলে বেরিয়ে যাচ্ছে নাতালি। সোজা চলে যায় ‘দের এল বালাহ’ নামে এক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের শিবিরে। সেখানে তারই মতো আরও কত ছেলেমেয়ে জড়ো হয় একটাই আকর্ষণে। তার নাম সিনেমা। যে আকর্ষণ এড়ানো সিংহভাগ সাধারণ মানুষের পক্ষে মুশকিল। নাতালি ও তার বন্ধুদের হাতে একটি করে টিকিট দেওয়া হয়, সঙ্গে এক ঠোঙা পপকর্ন। না, মোটেই আমাদের দেখা মাল্টিপ্লেক্সের মতো নয় গাজার এই সিনেমা দেখা। কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার আর সামনে একটা পুরনো টেলিভিশন সেট। তাতে কখনও চলছে কোনও সিনেমা, কখনও কার্টুন, কখনও আবার গেম। তাতেই বুঁদ হয়ে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দেয় সদ্য কৈশোরে পা রাখা নরম মনগুলো।

Advertisement

নাতালির কথায়, “আমি সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসি। কারণ, এটাই একমাত্র আমাদের পরিবেশটা পালটে দেয়। মনে হয়, আমরা যুদ্ধের মধ্যে নেই, আমরা আর কঠিন সময়ের মধ্যে নেই। আসলে এই যুদ্ধ, আমাদের বাড়ি হারানো এসব আমাকে মানসিকভাবে এত বড় ধাক্কা দিয়েছে যে আমি তা ভুলতে পারি না। বারবার মনে পড়ে, আমার তুতো ভাইবোনদের কথা। ওদের সঙ্গে কত খেলতাম, গল্প করতাম, একসঙ্গে সবাই থাকতাম। যুদ্ধের সময় ওরা সবাই মারা গিয়েছে, শুধু আমার পরিবারটাই আছে।”

ত্রাণশিবিরের বাইরে একটুকরো জীবন গাজার মহিলাদের, ছবি: সংগৃহীত

নাতালির কথায়, “আমি সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসি। কারণ, এটাই একমাত্র আমাদের পরিবেশটা পালটে দেয়। মনে হয়, আমরা যুদ্ধের মধ্যে নেই, আমরা আর কঠিন সময়ের মধ্যে নেই। আসলে এই যুদ্ধ, আমাদের বাড়ি হারানো এসব আমাকে মানসিকভাবে এত বড় ধাক্কা দিয়েছে যে আমি তা ভুলতে পারি না। বারবার মনে পড়ে, আমার তুতো ভাইবোনদের কথা। ওদের সঙ্গে কত খেলতাম, গল্প করতাম, একসঙ্গে সবাই থাকতাম। যুদ্ধের সময় ওরা সবাই মারা গিয়েছে, শুধু আমার পরিবারটাই আছে।”

Advertisement

গাজার কিশোর-কিশোরীদের সামনে রুপোলি পর্দার এই জগৎ খুলে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছেন জেহান আবু জানাউনা। তিনি বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনটির একজন মনস্তত্ববিদ, যারা ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে থাকা কঙ্কালসার গাজাকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। সেই জেহান বলছেন, “এই বাচ্চাদের মন থেকে ভয়াবহ স্মৃতি মুছতে সিনেমাকে আমরা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছি। ওদের শৈশব, কৈশোর তো আর পাঁচটা সাধারণ বাচ্চার মতো নয়, অত্যন্ত কঠিন। রোজ ক্যাম্পে ওরা মশা-মাছি, তীব্র গরম আর ঝগড়াঝাঁটির মধ্যে থাকে। আমরা চেষ্টা করি, সেই পরিবেশ থেকে ওদের সাময়িক সরিয়ে আনতে, একটু আনন্দ দিতে। সপ্তাহে একদিন করে তাই আমরা সিনেমা বা কার্টুন দেখানোর ব্যবস্থা করেছি। কখনও ওরা এখানে এসে গেমও খেলে। পপকর্ন খেতে খেতে ওরা যে প্রাণখোলা হাসিটা হাসে, তা দেখে আমাদেরও মন ভালো হয়ে যায়। প্রথমদিকে ১৫-২০ জন আসত। এখন এই সিনেমার কথা ছড়িয়ে পড়ায় ৩৫-৪০ জন আসে।”

সিনেমার টিকিট, সঙ্গে ফ্রি পপকর্ন! গাজার কিশোর-কিশোরীদের ‘অক্সিজেন’, ছবি: সংগৃহীত

সিনেমা তো মায়ার জগত। আমরা যারা যুদ্ধ থেকে ঢের দূরে আছি, স্রেফ নিজেদের জীবনের সামান্য লড়াইটুকু করছি, তারাও তো প্রতিদিনের একঘেয়েমি কাটাতে আঁকড়ে ধরি নিজেদের পছন্দের নায়ক-নায়িকাদের। ওই সময়টুকু তো বটেই, তার পরের সময়টাও মনে হয়, জীবনটা আবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ক্ষেত্রে অনেক সুন্দর। সেই সুন্দরের ছোঁয়া পেতেই বারবার সিনেমার কাছে ফিরে যাওয়া। গাজার জেন জি-ও তাই বারবার চুম্বক আকর্ষণে সিনেমামুখী হচ্ছে। সিনেমার মতোই ফিরে আসুক ওদের ঝলমলে জীবন।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.