Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ৩ অক্টোবর ২০২৬
Durga Puja 2026

‘ঠাকুরের মুখ দেখতে চাই না’, অগ্নিকাণ্ডে ছেলে হারিয়ে অভিমানী আলিপুরদুয়ারের সুশীলাবালা

গত ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ভোররাতে তারাপীঠে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদেরই একজন তপসিখাতা পাকুড়িতলার কমল রায়, সুশীলাবালার একমাত্র ছেলে।

রাজ কুমার
রাজ কুমার

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১৬:১৮

link
রাজ কুমার
রাজ কুমার

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ১৬:১৮

options
link
‘ঠাকুরের মুখ দেখতে চাই না’, অগ্নিকাণ্ডে ছেলে হারিয়ে অভিমানী আলিপুরদুয়ারের সুশীলাবালা zoom
চিত্র: সামু দাস
Advertisement

পুজোয় আলো জ্বলবে চারদিকে (Durga Puja 2026)। কিন্তু মায়ের মুখ দর্শন করবেন না এক মা। কোনওদিনই নয়। কারণ কোল খালি হওয়া সুশীলাবালা আজ ‘আঁধারে’। ছেলে কমল রায় বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন খালি মুখে। তারাপীঠে মায়ের পুজো দিতে। যাওয়ার সময় মাকে বলেছিলেন, “মায়ের দর্শন করে পুজো দিয়ে ফিরব।” কিন্তু আর ফেরা হয়নি। ফিরে এসেছিল ছেলের আধপোড়া দেহ। সেই থেকে মায়ের বুকের ভিতরটা যেন পাথর হয়ে গিয়েছে। শোকের সঙ্গে মিশেছে অভিমান। ঈশ্বরের উপর সেই অভিমান এতটাই গভীর যে, ঠাকুরের নাম শুনলেই আজও বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে তাঁর।

আলিপুরদুয়ার ১ ব্লকের পররপার গ্রাম পঞ্চায়েতের তপসিখাতা পাকুরিতলার ভাঙাচোরা বাড়িটিতে এখন সুশীলাবালা রায়ের দিন কাটে একরাশ শূন্যতা নিয়ে। সঙ্গে পুত্রবধূ মল্লিকা এবং দুই নাতি-নাতনি। ছেলের কথা উঠলেই নির্বাক হয়ে যান সুশীলাবালা। বউমা মল্লিকার দিকে তাকালেই তাঁর চোখ ভরে আসে জলে। তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement
Durga Puja 2026: Alipurduar Mother Grieves Son Lost in Fire
ছেলের ছবি বুকে নিয়ে মা। পাশে স্বামীহারা মল্লিকা ও দুই সন্তান। চিত্র: সামু দাস।

মাত্র ২৬ বছর বয়সে মল্লিকার কপাল থেকে মুছে গিয়েছে সিঁদুর। স্বামীকে হারানোর যন্ত্রণা তো রয়েছেই, তার সঙ্গে দুই সন্তান ও অসুস্থ শাশুড়িকে নিয়ে সংসার চালানোর কঠিন দায়ও এসে পড়েছে তাঁর কাঁধে। মল্লিকা আগে শিলিগুড়িতে আয়ার কাজ করতেন। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে সেখান থেকে ফিরে এসেছেন। এখন তিনিই সংসায়ের একমাত্র ভরসা। মাসে অন্নপূর্ণা যোজনার তিন হাজার টাকা ভাতা, এই সামান্য অর্থেই কোনওরকমে দিন গুজরান।

সামনেই পুজো। চারদিকে নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ, উৎসবের প্রস্তুতি, কাশের দোলা। কিন্তু কমল রায়ের বাড়ির দরজায় যেন সেই উৎসব এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। এবার পুজোয় ঘরের বাইরে পা রাখবেন না সুশীলাবালা। কিন্তু ১১ বছরের রাজদ্বীপ আর ছয় বছরের রানি কি আর এত কিছু বোঝে? অবুঝ রানি হয়তো নতুন জামার জন্য বায়না করবে। অথচ এবার ঘরে নতুন কাপড় কেনার মতো সামর্থ্য নেই। মেয়েটির কথা বলতে গিয়ে হঠাৎ গলা ভারী হয়ে আসে বৃদ্ধার— “ওদের বাবা কমল থাকলে পুজোর আগে মেয়েকে সত্যি রানি করেই রাখত।” তারপর একটু থেমে বলেন, “নতুন ফ্রক বারবার পরিয়ে বলত, মা আমার এক্কেবারে রানি! এবার পুজোয় বাবাহারা রানি।”

শেষ কথাটা আর শেষ করতে পারেন না। গাল বেয়ে নেমে আসে জল। কিছুক্ষণ নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকেন সামনে। তারপর নিজেকে সামলে ফের বলতে শুরু করেন, “সকালবেলা ছেলেটা মুখে কিছু না দিয়েই বেরিয়ে গেল। শ্রাবণের শেষ সপ্তাহ। বাড়ির মন্দিরে প্রণাম করে বলেছিল, মা, বন্ধুদের সঙ্গে তারাপীঠে যাব। মায়ের দর্শন করে পুজো দেব। সেই যে গেল… ছেলের আধপোড়া দেহ ফিরল।” কথাগুলো বলতে বলতে ফের চোখ চলে যায় ভাঙাচোরা ঠাকুরঘরের দিকে।

“আমি যাব না। কোনওদিন যাব না। আমি ঠাকুরের মুখ দেখতে চাই না,” শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলেন সুশীলাবালা। যেন প্রার্থনার জায়গাটিই তাঁর কাছে এখন সবচেয়ে বড় অভিমানের কারণ।

আলিপুরদুয়ার শহর থেকে ফালাকাটার রাস্তায় কিছুটা এগোলেই তপসিখাতা বাজার। বাজার পেরিয়ে ডানদিকে এগোলে মাঠজুড়ে সবুজ ধানখেত। ধানের শিসে হাওয়া দোল খায়। রোদ ঝলমলে আকাশে সাদা মেঘ ভেসে বেড়ায়। বাতাসে পুজোর গন্ধ। কিন্তু সেই উৎসবের আবহ যেন কমল রায়ের বাড়ির দরজায় এসে থেমে যায়। দরমার বেড়া দেওয়া ভাঙাচোরা বাড়িটিতে এখন উৎসবের বদলে শুধুই শোক আর অভাব।

গত ১৭ আগস্ট ভোররাতে তারাপীঠে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জেলার তিনজনের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদেরই একজন তপসিখাতা পাকুড়িতলার কমল রায় (৩০)। পেশায় গাড়িচালক কমল তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ১৪ আগস্ট গাড়ি করে তারাপীঠে গিয়েছিলেন। ১৭ অগস্ট তাঁদের ফেরার কথা ছিল। কিন্তু ফেরার আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ড। আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যু হয় চারজনের। সেই আগুন শুধু কমলের জীবনই কেড়ে নেয়নি। পুড়িয়ে দিয়েছে একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যৎ। পুজোও।

পুজো আসছে। বাইরে আলো জ্বলবে, ঢাক বাজবে, নতুন জামা পরবে কত শিশু। আর তপসিখাতার এই ছোট্ট বাড়িটিতে পুজো মানেই এবার আরও একবার মনে পড়বে সেই মানুষটার কথা, যিনি মেয়েকে নতুন ফ্রক পরিয়ে বলতেন, “আমার মেয়ে এক্কেবারে রানি।” এবার সেই রানি বাবাকে ছাড়া বড় হবে।

দুর্গাপুজো ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'দেবীপক্ষ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Share this article on

The article link is copied.