বাবুল হক, মালদহ: ফের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির মালদহে। হিন্দু বৃদ্ধার সৎকার করলেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন। হাঁটলেন শবযাত্রাতেও। মানিকচকের শেখপুরার পর এবার ইংলিশবাজারের মিলকির ভবানীপুর। এক হিন্দু বৃদ্ধার শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন গ্রামের মুসলিম যুবকরাই। শনিবার মৃতার বাড়িতে ছুটে গেলেন স্বয়ং জেলাশাসকও। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চালু করা সমব্যাথী প্রকল্পের অনুদানের চেক মৃতার এক নাতির হাতে তুলে দেন জেলাশাসক কৌশিক ভট্টাচার্য। গ্রামবাসীদের সামনেই মৃতার স্কুলছুট এক মেয়ের পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ঘোষণাও করেছেন জেলাশাসক।
ইংলিশবাজার ব্লকের মিলকির ভবানীপুরে একটি ঝুপড়ি তৈরি করে থাকতেন ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা নির্মলা রবিদাস। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর আগে তাঁর স্বামী মারা যান। তারপর থেকে তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি থাকতেন। বড় মেয়ে রেখা রবিদাসের বিয়ে হয়েছে পুখুরিয়ায়। ছোট দুই মেয়ে অর্চনা ও টুনি তাঁর সঙ্গেই থাকত। অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করে কোনওরকমে দিন গুজরান চলছিল। কিন্তু ইদানীং বয়সের ভারে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন নির্মলাদেবী। শুক্রবার বিকেলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে পড়শি যুবকরা মিলকি গ্রামীণ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এরপর তাঁর দুই মেয়ে অর্চনা ও টুনি বুঝে উঠতে পারছিল না যে, তারা কীভাবে মায়ের মরদেহের সৎকার করবেন। তাঁদের হাতে কোনও টাকাকড়িও ছিল না। পাড়ায় কোনও আত্মীয়স্বজন নেই। আবার গ্রামে হিন্দু পরিবারও প্রায় নেই বললেই চলে।
এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে আসেন গ্রামের সেই মুসলিম যুবকরাই, যাঁরা বৃদ্ধাকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। মরদেহ সৎকারের জন্য মূল উদ্যোগ নেন গ্রামেরই এক স্কুল শিক্ষক গোলাম মোস্তাফা। সারিফ মোমিন থেকে কালু মোমিন, এনামুল শেখ, ওয়াসিম আক্রম—সহ পাড়ার যুবকরা ছুটে এসে নির্মলাদেবীর মরদেহ কাঁধে নিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার হেঁটে পাগলিকালী শ্মশানঘাটে যান। মৃতার এক নাতি টিঙ্কু রবিদাস মুখাগ্নি করেন। মুসলিম যুবকদের হাতেই দাহপর্ব সম্পন্ন হয়। গোলাম মোস্তফা বলেন, “অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি আমরা। এখানে জাত—ধর্ম দেখার কোনও প্রশ্নই আসে না। বৃদ্ধার দুই অসহায় মেয়েকে দেখে আমরা চুপ থাকতে পারিনি। তাই নিজেরাই হাসপাতালে ভর্তি থেকে শবদাহের পুরো দায়িত্ব নিয়েছি। চাঁদা তুলে মাচা বানানো থেকে সৎকার পুরোটাই আমরা করেছি।”
মালদহের মানিকচকের শেখপুরা গ্রামে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বিশ্বজিৎ রজক নামের এক যুবকের মরদেহ কাঁধে নিয়ে শবযাত্রায় শামিল হয়েছিলেন ওই এলাকার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন। এবার ফের একই নজির গড়ল মালদহের মিলকির ভবানীপুর। এদিন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এমন নজির দেখে কার্যত উচ্ছ্বসিত জেলাশাসক কৌশিক ভট্টাচার্য। ঘটনার খবর শুনে নিজেই ছুটে যান মিলকির ভবানীপুর গ্রামে। সমব্যথী প্রকল্পের চেক তুলে দিয়ে তিনি বলেন, “সম্প্রীতি ও সৌহার্দের অনন্য নজির রাখল এই গ্রাম। অসহায় বৃদ্ধার পাশে দাঁড়িয়ে মানুষের ধর্ম পালন করেছেন গ্রামবাসীরা। বৃদ্ধার স্কুলছুট মেয়েকে স্কুলে ফিরিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পড়াশোনার সমস্ত খরচ বহন করা হবে।” জেলাশাসকের সঙ্গে ছিলেন জেলা পরিষদের সহকারী সভাধিপতি গৌরচন্দ্র মণ্ডল—সহ ব্লক প্রশাসনের আধিকারিকরা। গৌরবাবু বলেন, “রাজ্যে যে সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের পরিবেশ বজায় রয়েছে, এই ঘটনাই তার প্রমাণ।”
সর্বশেষ খবর
-
‘দাবির প্রশ্ন নেই, তৃণমূল আমরাই’, জ্ঞানেশের কাছে সওয়াল ঋতব্রতদের, দলের তহবিল হারাবেন মমতা?
-
পদ নেই, তবু দল নির্বাচনী বৈঠকে হাজির মদন! সিএবির প্রাক্তন যুগ্মসচিবকে ঘিরে জোর বিতর্ক
-
জনরোষে তৃণমূল নেতারা, পাথরপ্রতিমায় জুতোপেটা, গণধোলাই! বারাসতে পা ধরে চাইলেন ক্ষমা
-
অস্বস্তিতে কালীঘাট তৃণমূল! ফ্রিজই থাকছে অ্যাকাউন্ট, ব্যাঙ্ক-পুলিশের কাছে রিপোর্ট তলব হাই কোর্টের
-
‘ডিম থেরাপি’র শিকার মহুয়া, ‘রাজনৈতিক শত্রু’র পাশে বিকাশরঞ্জন, সমর্থন অখিলেশেরও