শান্তনু কর, জলপাইগুড়ি: খোদ সহকর্মী এমনকি আধিকারিকদের কাছ থেকে সামান্য সহযোগিতা না পেয়ে অপমানে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলেন জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্তব্যরত এক স্বাস্থ্যকর্মী। মৃত্যুর আগে লিখে রাখা তিন পাতার সুইসাইড নোটে করোনা মোকাবিলার কাজ করতে গিয়ে নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা লিখে গিয়েছেন জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরের ঘুঘুডাঙা সাবসেন্টারের সুপারভাইজার পদে কর্তব্যরত দেবাশিস চক্রবর্তী।
লিখে গিয়েছেন, সরকারি নির্দেশে গ্রামে করোনার লালারস সংগ্রহের জন্য জায়গা চিহ্নিত করতে গিয়ে গ্রামবাসীদের কাছ থেকে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। ঘটনায় এক চিকিৎসক এবং কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীর ইন্ধন ছিল বলে সুইসাইড নোটে উল্লেখ করে গিয়েছেন তিনি। তাতে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মী মহলে। বৃহস্পতিবার জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রমেন্দ্রনাথ প্রামাণিককে ঘেরাও করে বিক্ষোভ দেখান জেলার বিভিন্ন প্রান্তে করোনা মোকাবিলার কাজে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীরা। অভিযুক্তদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তাঁরা।
স্ত্রী রাখি চক্রবর্তী জানান, মঙ্গলবার কাজ থেকে ফেরার পর জলপাইগুড়ি শহরের সোনালি স্কুল সংলগ্ন বাড়িতে থাকা বৃদ্ধা মা, কলকাতায় লকডাউনে আটকে পরা মেয়ের খবর নিয়ে নিজের ঘরে চলে যান দেবাশিসবাবু। ঘরে ঢুকে লিখতে বসে যান তিনি। জানান, খিদে নেই তাই রাতে কিছু খাবেন না। বুধবার বেশ বেলা করে ঘুম থেকে ওঠেন। রাখি জানান, ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে কেমন অসংলগ্ন লাগছিল তাঁকে। হঠাৎ কুয়োর কাছে চলে যান। সোজা কুয়োয় ঝাঁপ দেন। চিৎকার শুনে ছুটে আসেন প্রতিবেশীরা। উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় সদর হাসপাতালে। চিকিৎসকরা জানান, আগেই কীটনাশক খেয়ে নিয়েছিলেন দেবাশিসবাবু। রাতে মৃত্যু হয় তাঁর। ভাই জয়ন্ত কুমার চক্রবর্তী জানান, সরকারি নির্দেশ মেনে ঘুঘুডাঙায় গ্রামে লালারস সংগ্রহ কেন্দ্রের জন্য জায়গা চিহ্নিত করছিলেন দাদা। তাতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন বেশ কয়েকজন গ্রামবাসী। হেনস্তার শিকার হতে হয়। সহকর্মীরাও সহযোগিতা করেননি তাঁকে। পরিবর্তে হেনস্তায় ইন্ধন দেয় তারা। গোটা ঘটনা ঘটেছে জানতে পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। আর তারপরই আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দাদা।
[আরও পড়ুন: উত্তরপ্রদেশ থেকে সাইকেলে ঘরমুখী ১১ জন শ্রমিক, ছিনতাইবাজের কবলে খোয়ালেন সর্বস্ব]
জানা গিয়েছে, জেলার প্রতিটি সাব সেন্টার এলাকায় একটি করে কোভিড টেস্ট সেন্টার করার পরিকল্পনা নেয় জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। গ্রামের কোন জায়গায় করলে সব মানুষের পথে পরীক্ষা করাতে আসতে সুবিধা হবে সেই জায়গা চিহ্নিত করে জানাতে বলা হয় দেবাশিসকে। স্বাস্থ্য কর্মীদের একাংশের অভিযোগ, গ্রামে যাতে কোভিড টেস্ট সেন্টার না হয় তার জন্য স্থানীয় প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রের চিকিৎসকের প্ররোচনায় স্বাস্থ্যকর্মীদের একাংশ দেবাশিসবাবুর বিরুদ্ধে গ্রামবাসীদের খেপিয়ে তোলেন। তার ফলে তাঁকে অপমানিত হতে হয়। দীপেন ঘোষ নামে এক স্বাস্থ্যকর্মীর দাবি, যারা দেবাশিস চক্রবর্তীকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করল তাদের শাস্তি হোক। না হলে স্বাস্থ্যকর্মীদের মনোবল ভেঙে যাবে।
জলপাইগুড়ি সদর ব্লকে কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মী প্রসেনজিৎ লালা জানান, গ্রামের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক ছিল ওই স্বাস্থ্যকর্মীর। করোনা মোকাবিলায় প্রথম দিন থেকেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। গ্রামবাসীদের সচেতন করা, বাইরে থেকে কেউ এলে সরকারি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে তাঁদের পর্যবেক্ষণে রাখা, সরকারি নির্দেশ মেনে একের পর এক কাজ দায়িত্ব নিয়ে করে যাচ্ছিলেন। তারপরেও এমন মর্মান্তিক পরিণতি হল তাঁর। মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক রমেন্দ্রনাথ প্রামাণিক বলেন, “অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। তিন পাতার একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার হয়েছে। সেই সুইসাইড নোটের ভিত্তিতে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। দায়িত্ববান কর্মী হিসেবে জেলার স্বাস্থ্যকর্মী মহলে পরিচিত ছিলেন দেবাশিস। আগস্ট মাসে চাকরি জীবন থেকে অবসর নিতেন তিনি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” করোনা আবহে অপ্রত্যাশিত এই ঘটনায় শোকস্তব্ধ স্বাস্থ্যকর্মীরা।
[আরও পড়ুন: পাকিস্তানের হিন্দু নির্যাতনের ছবি-ভিডিও তেলিনিপাড়ার বলে ভাইরাল সোশ্যাল মিডিয়ায়]
সর্বশেষ খবর
-
জমি কেলেঙ্কারি ও তোলাবাজির অভিযোগ! পুলিশের জালে তৃণমূলের আরও এক প্রাক্তন বিধায়ক
-
যুদ্ধের ধাক্কায় বেসামাল, ফুরিয়ে এসেছে অস্ত্র! এবার হার মানবে ইরান?
-
নবদ্বীপের ‘ত্রিপলচোর’ তৃণমূল চেয়ারম্যানের মামলাই লড়লেন না আইনজীবীরা! এজলাসের বাইরে ‘চোর’ স্লোগান, পড়ল ডিম
-
৬ ঘণ্টায় দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি! রেলমন্ত্রীর বুলেট ট্রেন ঘোষণায় খুশির হাওয়া উত্তরে
-
রক্তারক্তি কাণ্ড! হাসপাতালে অশোক ভট্টাচার্য, কেমন আছেন বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা?