সন্দীপ মজুমদার, উলুবেড়িয়া: “আমি আর বাড়িতে ফিরতে চাই না, আমাকে অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দাও। আমার বন্ধুর দরকার নেই, আমি বাঁচতে চাই”। দু’চোখ ভরা জলে ছোট-ছোট দু’টো হাত বাড়িয়ে কেঁদে চলেছে মাত্র এগারো বছরের বালিকা। দশ বছর আগে মৃত্যু হয়েছে মায়ের। পরে নিখোঁজ হয়েছে বাবাও। তারপর থেকেই গার্হস্থ্য হিংসার শিকার ছোট্ট মেয়েটা। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় ঠোক্কর খেতে খেতে অবশেষে আপনজনদের কাছ থেকে পাওয়া মানসিক অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা পেতে স্কুল যাওয়ার সময় নিরুদ্দেশের উদ্দেশে ট্রেনে চেপে বসে সে। শুক্রবার ঘটনাটি ঘটে বাগনান থানার নবাসনে। অসহায় বালিকাকে উদ্ধার করে জিআরপি।
[দোকান থেকে ন্যায্যমূল্যের ওষুধ পাচারের অভিযোগ, ধুন্ধুমার কাণ্ড শ্যামবাজারে]
নবাসন বরুন্দা নিউ সেটআপ আপার প্রাইমারি গার্লসের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুনীতা (নাম পরিবর্তিত)। শুক্রবার নবাসনে তার দিদিমার বাড়ি থেকে স্কুল যাওয়ার নাম করে বেরিয়ে সোজা ঘোড়াঘাটা রেল স্টেশনে গিয়ে ট্রেন ধরে পশ্চিম মেদিনীপুরের পাঁশকুড়া স্টেশনে গিয়ে নামে। সেখানে স্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে তাকে কাঁদতে দেখেন কর্তব্যরত জিআরপি সিভিক ভলান্টিয়ার বিকাশ কান্তি মান্না। বালিকার কাছে বইয়ের ব্যাগ দেখে তাঁর সন্দেহ হয়। বই, ব্যাগ ঘেঁটেই সুনীতার পরিচয় জানতে পারেন। পাঁশকুড়া জিআরপি আধিকারিকদের সম্মতিক্রমে বালিকাকে তার বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হন বিকাশবাবু।

[দেড়মাসের বাঘবন্দি খেলা শেষ, বাগঘরার জঙ্গলে মিলল রয়্যাল বেঙ্গলের মৃতদেহ]
ঘটনাচক্রে তখন ওই স্টেশনেই ছিলেন বাগনানের বাসিন্দা কালিপদ দাস। তিনি বিষয়টি জানতে পেরে বিকাশবাবুকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন। তাঁরা দু’জনে বালিকাকে নিয়ে সোজা চলে আসেন নবাসনের আনন্দ নিকেতনে। সংস্থার সাধারণ সম্পাদক শ্রীকান্ত সরকার বালিকার দিদিমাকে ডেকে পাঠালে সুনীতা শ্রীকান্তবাবুর পায়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে তাকে যেন বাড়িতে না পাঠানো হয়। তাকে কোনও অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে থাকে। সুনীতাকে বোঝানোর চেষ্টা করে এও বলা হয়, অনাথ আশ্রমে পাঠালে সে তার বন্ধুদের আর দেখতে পাবে না। কিন্তু বালিকা বলে ওঠে, তার বন্ধুর প্রয়োজন নেই। সে বাঁচতে চায়। তার করুণ আকুতি উপস্থিত সকলের চোখে জল এনে দেয়। এমনকী দিদিমাকে ডেকে তাঁকে বালিকাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে বলা হলে তিনি প্রকারন্তরে নাতনীকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন। জানান, তিনি মাছ বিক্রি করেন, তাঁর স্বামী হাওড়া স্টেশনে কুলির কাজ করেন। মেয়ে দশ বছর আগে ব্রেন টিউমার হয়ে মারা যাওয়ার পর তাঁর জামাই অন্য বিয়ে করে। তখন থেকে তাঁর নাতনি সুনীতা হাওড়ার শলপে জামাইয়ের কাছেই থাকতো। এক বছর আগে জামাই হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যায়। তখন সুনীতার সৎ মা তাকে মৌড়িগ্রামে তার কাকা ও পিসিদের কাছে রেখে আসে। কাকারা সুনীতাকে অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে পাঠায়। সেখানে অত্যাচারিত হবার পর ছয় মাস আগে কাকারা সুনীতাকে নবাসনে দিদিমার কাছে রেখে যান। সুনীতার দুই দাদা অবশ্য প্রথম থেকেই দিদিমার কাছে মানুষ। নবাসনে আসার পর তার উপর তার দুই দাদা শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালাত বলে সুনীতা জানায়। আর সেই কারণেই সে বাড়ি ছেড়ে পালাতে চেয়েছিল। সুনীতা জানায় ‘মা’ কী জিনিস, তা সে কখনও জানতে পারেনি। ছোট থেকেই সৎ মায়ের মার আর গালাগালি খেয়ে সে বড় হয়েছে। বাবা নিরুদ্দেশ হবার পর সৎ মা আবার বিয়ে করে। তারপর তার আর স্থান হয়নি সে সংসারে। কাকা, পিসিরা তাকে দিয়ে অন্যের বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করাতো। সেখানে মারধরের সঙ্গে জুটতো গায়ে সিগারেটের ছেঁকা।
বালিকাকে যখন আর কেউ ফিরিয়ে নিতে শুনে দিদিমার সম্মতিতে আনন্দ নিকেতনের সম্পাদক শ্রীকান্ত সরকার বালিকার যাবতীয় দায়িত্ব নিজে কাঁধে তুলে নেন। আপাতত সুনীতাকে আষাড়িয়া বিবেকানন্দ সেবা সমিতিতে রাখা হয়েছে, পরে তাকে কোনও লেডিস হোস্টেলে ভর্তি করা হবে বলে জানান শ্রীকান্তবাবু। তিনি বলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন কন্যা সন্তানদের সুরক্ষার জন্য সবুজশ্রী, সবুজ সাথী, কন্যাশ্রী-সহ একাধিক প্রকল্প চালু করেছে, তাদের মানুষ করার অধিকাংশ দায়িত্বই সরকার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে, তখনও কন্যা সন্তানদের এইভাবে নির্মম সামাজিক ব্যাধির শিকার হতে হচ্ছে দেখে হতবাক হতে হচ্ছে।

[আসিফার বিচারের দাবিতে রাত জাগবে শহরের পড়ুয়ারা]
সর্বশেষ খবর
-
বান্ধবীর বাবার ‘যৌন লালসা’র শিকার তরুণী, গ্রেপ্তার অভিযুক্ত
-
গুলির অবস্থান জানতে ডিজিটাল এক্স রে, ৩ সদস্যের নজরদারিতে বারুইপুরের প্রভাসের ময়নাতদন্ত
-
ভারতীয়দের বিপদ বাড়ছে? এইচ ১বি দুর্নীতিতে ট্রাম্পের ‘সন্দেহভাজন’ তালিকায় কগনিজ্যান্ট!
-
কোথায় হতে পারে ২১ জুলাই পালন? বিকল্প জায়গা জানাতে রাজ্য পুলিশের ডিজির কাছে ঋতব্রত শিবির
-
হরমুজে জাহাজ চলতে দেওয়া হোক, ট্রাম্পের ‘ভয়ংকর হামলা’র পরই সংযত থাকার বার্তা ভারতের