সুমিত বিশ্বাস,পুরুলিয়া: লোহার গেটের একটা পাল্লা বন্ধ। তার পাশে দাঁড়িয়ে দু’দুটো গাড়ি। সেই ভারী দরজা ঠেলেই সোমবার ভরদুপুরে দেখা গেল উদাস চোখ-মুখে বসে আছেন স্ত্রী সুমিতা সিং মল্ল। তাঁর পাশেই মাটিতে বসে ছেলে প্রসেনজিৎ। মা ও ছেলে দু’জনেই পঞ্চায়েত ভোটে প্রার্থী। মা জেলা পরিষদে। ছেলে গ্রাম পঞ্চায়েতে। কিন্তু এদিন ঘরেই বন্দি তাঁরা। গত শনিবার রাতের পরে তাঁরা যেন নির্বাক হয়ে পড়েছেন। শনিবার ঝাড়খণ্ডের বাইকবাহিনী হামলা চালিয়েছিল তৃণমূলের দলীয় সভায়। উদ্দেশ্য গ্রাম পঞ্চায়েত প্রার্তী প্রসেনজিতের উপরে হামলা করা। সেই হামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন বরাবাজার ব্লক তৃণমূলের প্রাক্তন সভাপতি আদিত্য সিং মল্ল। হামলাকারীদের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়াতেই লাথি-ঘুসি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন অসুস্থ আদিত্যবাবু। হামলায় গুরুতর আহত হওয়ায় তাঁকে বরাবাজার ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থকেন্দ্রে ভরতি করা হয়। রবিবার আদিত্য সিংয়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে জামশেদপুর স্থানান্তর করা হয়। গাড়িতে হাসপাতালে যাওয়ার পথেই মৃত্যু হয় প্রাক্তন তৃণমূল সভাপতির।
[শুধু হাতির দলে রক্ষে নেই দোসর দাবানল, পঞ্চায়েত ভোট থেকে ‘ছুটি’ বনকর্মীদের]
অকালে বাবাকে হারিয়ে শোকে পাথর ছেলে প্রসেনজিৎ। নির্বাক আদিত্যবাবুর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম সঙ্গী তথা স্ত্রী সুমিতা দেবীরও। তবে ওই বাইক বাহিনীর তাণ্ডবের কাছে হার মানতে রাজি নন সুমিতাদেবী। তাই শোকের মাঝেও নিয়ে নিয়েছেন লড়াই চালিয়ে যাওয়ার শপথ। একসময় স্বামীর সঙ্গী হয়েই সিপিএমের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়েছেন। বামবিরোধী রাজনীতি করার অপরাধে সিং পরিবারকে সামাজিক ভাবে বয়কট করা হয়। ধোপা, নাপিত, বাজার ঘাট বন্ধ করে এক বছর ধরে ‘একঘরে’ করে রাখে সিপিএম। সেই সময় ৭০ বিঘা ধানের জমি লুট হয়ে যায়। তবুও দমেননি। তাই স্বামীর দেখানো পথে ছেলেকে নিয়ে আবার ভোটের প্রচারে নামতে চান স্ত্রী। তে-রাত্রি শেষে হবিশ্যি করে অশৌচ শরীরেই আগামী বুধবার থেকে পথে নামবেন তিনি। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে শুরু হবে মা ও ছেলের ভোট প্রচার। এই দুঃসময়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন সাংসদ তথা তৃণমূলের জেলা পর্যবেক্ষক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফোন করে কথা বলেছেন ও সুমিতাদেবীর সঙ্গে।
[পুড়িয়ে মারতে তৃণমূল প্রার্থীর বাড়িতে আগুন, অভিযোগ বিজেপির বিরুদ্ধে]
সুমিতাদেবী এবারে পুরুলিয়া জেলা পরিষদের মানবাজার দু’নম্বর ব্লকের চার নম্বর আসনের তৃণমূলের প্রার্থী। গতবার এই বরাবাজার ব্লকের জেলাপরিষদের দু’নম্বর আসন থেকে প্রার্থী হয়ে জয়লাভ করেছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর একমাত্র ছেলে প্রসেনজিৎ রাজনীতির ময়দানে নতুন মুখ। আসলে বাবার ইচ্ছেতেই প্রার্থী হয়েছেন যুবক। সুমিতাদেবী সাদা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের কোণ মুছে বলেন, “মানুষটা ফুসফুস, লিভারের সমস্যায় কয়েকদিন ধরে ভুগছিলেন। অনেক চেষ্টা করে তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলাম। উনি চেয়েছিলেন ছেলেও ওঁর মত রাজনীতি করুক। তাই এবার প্রসেনজিতকে প্রার্থী করে। সেইকারনেই সেদিন রাতে ছেলের জন্য দলের বৈঠকে গিয়েছিলেন। কিন্তু ছেলেকে বিজেপির বাইক বাহিনীর তাণ্ডবের হাত থেকে বাঁচাতে গিয়ে চলে যাবেন, ভাবতেও পারছি না। এই সন্ত্রাসের জবাব ভোটেই দেব। তাই ছেলেকে নিয়ে অশৌচ শরীরেরই প্রচার করব।” মায়ের কথা শুনে চোয়াল শক্ত করেন বছর আঠাশের প্রসেনজিৎও। ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “আমরা কবে থেকে বলছি বিজেপি ঝাড়খণ্ড থেকে অশান্তি পাকাতে বহিরাগত ঢোকাচ্ছে। যে সকল বহিরাগত বরাবাজারে আশ্রয় নিয়ে রয়েছে তাদের কাছে প্রচুর অস্ত্র রয়েছে। পুলিশকে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিচ্ছি কিন্তু তারা কোনও কাজ করছে না। পুলিশ যদি আগে থেকে ব্যবস্থা নিত তাহলে এমন ঘটানো এড়ানো যেত।” চোখের কোনায় জল চলে আসে সুমিতাদেবীর। মুহূর্তেই আবেগ ভুলে দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত হন। ছেলেকে সাহস দেন। পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, হামলাকারী বাইক বাহিনীর বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু হয়েছে। পাঁচ অভিযুক্তই পলাতক। তবে বাইকগুলি বাজেয়াপ্ত হয়েছে। নম্বরপ্লেট দেখে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে।
ছবি: অমিত সিং দেও
সর্বশেষ খবর
-
টিসিএস ধর্মান্তকরণ মামলায় অন্তঃসত্ত্বা নিদা খানের জামিন, শ্রীকৃষ্ণের জন্মপ্রসঙ্গ টানল আদালত
-
‘আইএএস পরে হবেন, আগে আদর্শ মা হওয়া শিখুন’, ছাত্রীদের পরামর্শ উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপালের
-
উত্তরপ্রদেশে পুলিশ-গ্যাংস্টার ধুন্ধুমার গুলির লড়াই, এনকাউন্টারে খতম ৪ দুষ্কৃতী, আহত তিন পুলিশকর্মী
-
‘আমার দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত’, বৃষ্টিস্নাত কলকাতায় ছবির প্রচারে বললেন ইমতিয়াজ
-
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে লজ্জার সিরিজ হার, অধিনায়ক হিসাবেও জয়হীন, কী সাফাই শ্রেয়সের?