শারদোৎসবের আলো ঝলমলে থিম। অন্যদিকে বারোয়ারির সাড়ম্বর। উমাকে তাঁর চার সন্তান পরিবেষ্টিত দেখতেই অভ্যস্ত বাঙালি। তবে চেনা ব্যাকড্রপ পার করে বাঙালির পুজো-ইতিহাসের ধূলিমলিন গণ্ডিতে চোখ রাখলে থমকে যেতে হয় বইকি! কোথাও নেই অসুর, নেই চার সন্তান! দশভুজা উমার ডান আর বাম পাশে সগৌরবে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রিয় দুই সখী। জয়া ও বিজয়া।
প্রাচীনকালে সচ্ছল গেরস্তের কন্যাদের বিবাহের পর শ্বশুরবাড়িতে একা পাঠানো হত না। সঙ্গে যেতেন দাসী ও বিশ্বস্ত প্রাণের সখীরা। গিরিরাজ হিমালয় এবং মেনকার কন্যা দেবী পার্বতী যখন শিবের উদ্দেশ্যে কৈলাসে যাত্রা করেন, শাস্ত্রানুসারে তাঁর সঙ্গেও গিয়েছিলেন অষ্টসখী। এই আটজনের মধ্যে উমার সবচেয়ে প্রিয় এবং আত্মীয়তুল্য ছিলেন জয়া ও বিজয়া। ফলে মর্ত্যে বাপের বাড়িতে উমার আগমনেও এই দুই সখীর সহাবস্থান নিতান্তই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন ওঠে, মূলধারার বারোয়ারিতে কেন ঠাঁই পান না এই দুই প্রিয় সঙ্গিনী?
আরও পড়ুন:
তন্ত্রশাস্ত্র এবং প্রাচীন পারিবারিক দুর্গাপুজোর গূঢ় রহস্য অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, জয়া-বিজয়া মোটেও কেবল পৌরাণিক রূপকথা নন। তন্ত্রমতে, তারা মহামায়ার ‘যোগিনী’ বা নিত্য সহচরী। মহাস্নান, পীঠপূজা এবং শক্তিপূজার মূল তান্ত্রিক আবাহনে এই দুই সখীর স্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শাস্ত্রীয় পরিভাষায় দেবী পার্বতীর পাশ্ববর্তী শক্তিরূপে জয়া-বিজয়ার পূজন নির্দিষ্ট রয়েছে। অথচ সময়ের নিয়মে বারোয়ারি পুজোর সর্বজনীন রূপ গঠনে যখন চার সন্তানের আগমন ঘটল, তখন তান্ত্রিক উপাচারের অন্তরালে ঢাকা পড়ে গেলেন এই দুই সখী।
ব্যতিক্রম অবশ্য আজও রয়েছে বাংলার বেশ কিছু প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী পুজোয়। বর্ধমানের ধেনুয়া গ্রামের গৌরী কেদারনাথ ধামের কালীকৃষ্ণ মন্দিরের কথাই ধরা যাক। সেখানে দেবীর চেনা রণরঙ্গিণী বা ক্রোধাশ্রিত মূর্তি নেই। নেই পদতলে মহিষাসুরও! বরং শ্বেতসিংহের পিঠে আসীন একচালা মণ্ডপে দশভুজার দুই হাতে ধরা দুই সখী জয়া ও বিজয়ার হাত। দেবীর চোখে-মুখে এক উৎফুল্ল, আহ্লাদী বাৎসল্য।
একইভাবে পশ্চিম বর্ধমানের মলানদিঘি গ্রামের প্রাচীন ভট্টাচার্য বাড়িতে দুর্গার চার সন্তান পুরোপুরি অনুপস্থিত। সেখানে উমার সার্বক্ষণিক সঙ্গী শুধুই জয়া ও বিজয়া। সেই সঙ্গে হিমালয়ের জঙ্গলে দেখা মেলা দুর্লভ শ্বেতসিংহের আদলে গড়া হয়েছে দেবী বাহন। কালের নিয়মে ছাগবলি বদলে চালকুমড়ো বলি হলেও, শতাব্দী প্রাচীন এই তান্ত্রিক ও পারিবারিক প্রথায় জয়া-বিজয়ার অবস্থান এক চুলও বদলায়নি।
বারোয়ারির চাকচিক্য যাঁদের বিস্মৃতির আড়ালে ঠেলে দিয়েছে, সেই জয়া আর বিজয়া আজও নীরবে টিকে আছেন তন্ত্রের গূঢ় শাস্ত্রে এবং বাংলার প্রাচীন কুলপুজোর নিভৃত মণ্ডপে—দেবীর একান্ত সখীর মর্যাদায়।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
‘বন্ধুত্বের বন্ধন…’, জন্মদিনে ‘বন্ধু’ মোদিকে মিষ্টি শুভেচ্ছা মেলোনির
-
অন্নপূর্ণার টাকায় উমা আরাধনা, চাঁদা না নিয়েই অসাধ্যসাধন বাংলার ‘দুর্গা’দের
-
পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা যোজনা দর্জি-ক্ষৌরকারদের! তৃণমূল সরকারকে দুষে শুভেন্দু বললেন ‘পরিযায়ী বিশ্বকর্মাদের রাজ্যে ফেরাব’
-
এখনও হয়নি প্রতীক-সিদ্ধান্ত! ঝুলেই উপনির্বাচনে তৃণমূল প্রার্থীদের ভবিষ্যৎ, কী মত দু’পক্ষের?
-
জর্ডন থেকে ১ পয়েন্ট, ঘরের মাঠে ইরাকের ক্লাবের বিরুদ্ধে নামার আগে আত্মবিশ্বাসী ইস্টবেঙ্গলের রামিরেজ