ইডির কার্যপদ্ধতির বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী মিছিল করলেন। মিছিল মানে প্রতিবাদ, গর্জন। মিছিল মানে নীরব মোমের আলোয় হক বুঝে নেওয়া।
এক সময় নাম ছিল ‘শোভাযাত্রা’। ভারি নরমগরম বাংলা নাম। শোভাযাত্রা বলতেই মনে ফুটে উঠত একটা ছবি। যে-ছবিতে একসঙ্গে হঁাটছে অনেক মানুষ। আনন্দের হঁাটা। খুশির হঁাটা। চলছে আলো। বাজছে বাজনা। ভাসছে বহু কণ্ঠে আনন্দের গান। ঝলমল করছে পোশাক আর মনের রং। শোভাযাত্রার মূল বার্তা, কোনও এক উপলক্ষের উৎসবায়ন। শোভাযাত্রায় প্রতিবাদ নেই। নেই কোনও রাজনীতি। আছে বহু মানুষের সমবেত উৎসার।
গান্ধীজির পদযাত্রা ভিন্ন বর্ণের, অন্য গোত্রের। পদযাত্রাতেও বহু মানুষের একত্রিত হঁাটা। কিন্তু গান্ধীজি সেই পদযাত্রার মুখ, প্রাণ এবং প্রাণন। তিনি হঁাটছেন সেই বিপুল পদযাত্রার সামনে। তঁার পিছনে হঁাটছে মানবসমুদ্র। প্রতীকী অর্থে, মহাত্মা গান্ধীর পদযাত্রায় হঁাটছে সমগ্র ভারত, ইতিহাস এই ছবির সাক্ষী।
পদযাত্রা মূলত প্রতিবাদের। গান্ধীজির পদযাত্রা ছিল ব্রিটিশ শাসন, শোষণ, পীড়ন ও অবিচারের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ এবং নীরব প্রতিরোধ এবং নিহিত শক্তির বার্তা। এই পদযাত্রার চরিত্র অবশ্যই রাজনৈতিক। তবে প্রভাবে ও প্রসারে সর্বভারতীয়।
আরবি ‘মিসিল’ শব্দ থেকে বাংলা ভাষায় এল ‘মিছিল’ শব্দটি মূলত মার্কসবাদীদের প্রভাবে। শোভাযাত্রা এবং পদযাত্রার সঙ্গে মিছিলের চাক্ষুষ সাদৃশ্য একটাই: মিছিলেও বহু মানুষের একত্র হঁাটা। কিন্তু তাদের হঁাটার ধরন ও চরিত্রে এসেছে বৈপ্লবিক বিবর্তন। মিছিল হঁাটে গর্জনে, তর্জনে, মুষ্টিবদ্ধ শাণিত, বহ্নিত এবং যুদ্ধং দেহি প্রতিবাদে। নীরব মিছিলেও থাকে লিখিত স্লোগানের উচ্চারণহীন ঘোষণা ও তর্জন।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মিছিলের মুখ’ কবিতায় মিছিলের এমন একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন এবং ছবি এঁকেছেন, যা সাধারণ বাঙালির মনে গেঁথে গিয়েছে। তঁার কবিতার মিছিলে একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত। আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত এই প্রতিবাদের হাত না আছে শোভাযাত্রায়, না আছে পদযাত্রায়। মানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত, তার আগুনের শিখার মতো কম্পমান কেশাগ্র, এবং ফসফরাসের মতো জ্বলজ্বল করা মিছিলের মুখ– এসবই সুভাষের কবিতায়, সংজ্ঞায়িত করছে মিছিলের চরিত্রকে, তাকে পৃথক করছে শোভাযাত্রা এবং পদযাত্রা থেকে। সুভাষের কবিতায় একটি দুঃখও গহন হয়ে আছে।
মিছিলের এই মুখ তিনি আর বাংলায় খুঁজে পান না, কিন্তু খুঁজে বেড়ান তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী সে-ই মুখ, নিষ্কাশিত তরবারির মতো, যে-মুখ অন্ধকারে দেখে সেই মানুষটির হাতে গুঁজে দিতে চান সুভাষ নিষিদ্ধ ইস্তাহার, যা ডাক দেবে এক জরাজীর্ণ ইমারতের ভিত ধসিয়ে দিতে। ২০০৩ সালে চলে-যাওয়া সুভাষ আমাদের মধ্যে নেই ২৩ বছর। এই ২৩ বছরে বাঙালি দেখেছে বহু উপলক্ষে কত না মিছিল। কত মানুষ বাংলার শহরে-গ্রামে নানাবিধ সমবেত প্রতিবাদে হেঁটেছে। মিছিল নতুনভাবে জন্মেওছে এই বাংলায় মেয়েদের রাতদখলের রূপকথা হয়ে। মিছিলের নবজন্ম দেখেছি নারী-পুরুষের মোমবাতি হাতে নীরব হঁাটার রোমান্টিক প্রতিবাদেও। তাই এই মিছিল চলছে। চলবে।
সর্বশেষ খবর
-
ভিনির ‘ম্যাজিক মোমেন্টে’ও অধরা জয়, ড্র দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু ব্রাজিলের
-
শান্তিনিকেতনে অরবিন্দ নিলয়ে বাণিজ্যিক নির্মাণ? বিতর্কের মাঝেই বার্তা ট্রাস্টের
-
কালীঘাটের বৈঠকে কুণাল-অভিষেক তীব্র বাদানুবাদ, পরিস্থিতি সামাল দিলেন মমতা!
-
খুলছে হরমুজ, রবিতেই ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তি আমেরিকার, বড় ঘোষণা ট্রাম্পের
-
ড্রাগনের ‘উরুভঙ্গে’ চিন সাগরে ওরা কারা? গুপ্তচর কচ্ছপ ও মাছেদের হানাদারিতে শঙ্কিত বেজিং