অরিঞ্জয় বোস: বৃষ্টি-ফুটবল-কলকাতা। তিনটে শব্দ পাশাপাশি বসলেই যেন আস্ত একখানা কবিতা। ব্রায়ান ব্রেক অপর্ণা সেনের সিক্ত মুখমণ্ডলে বর্ষা আর বাংলার যে চিরকালীন মাধুর্য ফ্রেমবন্দি করেছেন, এ কবিতার আবেদন যেন তার থেকেও কিঞ্চিৎ বেশি। এই মিতায়তন পরিসরেই যে মাতন লুকিয়ে আছে, তা যেন বাঙালির বুকে বেজে ওঠা অলৌকিক মেঘমল্লার। বাড়িয়ে বললাম! বেশ, তাহলে রবিবার বিকেলে ময়দান, আরও নিশ্চিত করে বললে মোহনবাগান মাঠের আশেপাশে যদি চেনা কেউ থেকে থাকেন, তাঁকেই একবার জিজ্ঞাসা করে দেখুন।

আসলে বর্ষা আর ফুটবল যে বাঙালির চিরন্তন রোম্যান্টিক কাব্য। একবার যদি তা উপভোগের অবকাশ মেলে তবে বিসম্মিলার সানাইয়ের মতোই হাত পেতে নিয়ে চেটেপুটে নেয় বাঙালি। রবিবারের বিকেলে তাই কেবলই দৃশ্যের জন্ম। তথ্যের ধরতাই হিসাবে বলা যায়, প্রায় বছর চারেক পর এদিনই ছিল মোহনবাগান মাঠে খেলা। ওদিকে সকাল থেকেই আকাশে মেঘ-রোদের লুকোচুরি খেলা। বেলা গড়াতেই ঝিরঝিরে বৃষ্টির সুরবাহার বাঙালির মনে জাগিয়ে তুলল চিরন্তন আকুতি। এমন দিনে তারে বলা যায়… কোন কথাটি? না, এমন দিনে ফুটবল মাঠে যাওয়া যায়। অতএব ঢল নেমেছে ফুটবলপ্রেমীদের। সেই চেনা জয় মোহনবাগান স্লোগান’-এ বর্ষার রোববার যেন আরও একবার স্নাত হল। একটু খেয়াল করলে কান মাতলে ওই মুখরিত ধ্বনি থেকে কথাগুলোও ক্রমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ‘চল রে চল সবে চল ময়দান/মোহনবাগান করে আহ্বান…/লক্ষ্য মানুষ হাল ধরেছে নৌকা ভাসমান/তোমার আবার সবার বাঁচার আশা/ বলো জয় মোহনবাগান’।

[আরও পড়ুন: বারবার ভাঙড়ে প্রবেশে পুলিশি বাধা, এবার হাই কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নওশাদের]
প্রিয় ক্লাবের নামে সমর্থকরা জয়ধ্বনি দেবেন, এ তো আশ্চর্যের কিছু নেই। তবে যা নিছক ফুটবলের স্লোগান বলে মনে হয়, তা যেন আসলে বাঙালির আত্মার জয়গান, যেখানে মোহনবাগান নিছক উপলক্ষ মাত্র। বৃষ্টিনেশা ভরা বিকেলবেলা বাঙালির মনের ভিতর এই যে মাতন, এই-ই তো বাঙালির নিজস্ব পরিচয়পত্র। যে ঢাক-ঢোল-বাদ্যি বাজছে এদিন অহরহ, আসলে তা ওই আনন্দেরই গান। যে-আনন্দ ছড়িয়ে আছে আজকের আকাশে-বাতাসে। তাই যেমন করে গাইছে আকাশ, এদিন যেন তেমন করেই বাঙালি গেয়ে উঠল তার প্রাণের গান। মানুষের ভিড়ে ভিরে মুখরিত কলরবে সে গান ছুঁয়ে ফেলল চিরকালের বাঙালির মনের আকাশটিকে। বটতলার দিকে ভিড়ে ভিড়াক্কার। কে বলবে, বাঙালি তার উইকএন্ড কাটায় কেবল ওটিটি আর শপিংমলে!

প্রকৃতি জুড়েও তো আজ নানা রঙের খেলা। এক ফাঁকে মেঘের সঙ্গে বচশা করেই যেন সামনে চলে এল নীল আকাশ। আর সেই অবকাশে লেবু চায়ের কাপে ঠোঁট রেখে বুক ভরে অক্সিজেন টেনে নিলেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। ঘটিগরম বিক্রি করছেন যিনি, তিনি মিঃ কুল। একটুও মাথা গরম নেই। ঠান্ডা মাথায় আবদার মিটিয়ে যাচ্ছেন সকলের। নেহাত ব্যবসা! তা আছে বটে। তবে তিনিও বোধহয় জানেন, এই উন্মাদনাটুকুই তো বাঁচিয়ে রাখে ময়দানকে, বাঙালিকেও। ক্যান্টিনের দিকে উঁকি দিলেও সেই একই ছবি। বর্ষার বেলা আর ডিমের ডেভিল কিংবা ঘুগনির বাহারি আহারে বাঙালি মজবে না, তাই আবার হয় নাকি! কেউ কেউ কেউ আয়েশি কামড় দিয়েছেন ফিশ ফ্রাইতেও। গ্যালারিজুড়ে অঢেল নাচ-গান যেন উড়ছে বাঙালির প্রাণের আরামের নিশান হয়ে।

সত্যি বলতে, এটাই তো আমার শহর। এই-ই তো আমার আমার বাংলা। যে বাংলা বর্ষাকে উপভোগ করে একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আর ফুটবলে। এই তো আমার শহর- কলকাতা। যে তিলোত্তমা বহু মানুষের মিলনমহান শিল্পসুষমা ফুটিয়ে তুলতে পারে আপন ক্যানভাসে। কখনও-সখনও এমন কথা হয় যে, ফুটবলের সঙ্গে বাঙালির প্রেমে কবে যেন ব্রেক-আপ হয়ে গিয়েছে। বিশেষত ময়দানের ফুটবল-সংস্কৃতি এখন ম্রিয়মাণ। বাঙালি এখন বিদেশি ক্লাব ফুটবল নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপ মাতায়, কিন্তু ময়দান মাতাতে পা রাখে না কাদায়। সেই সব নিন্দুকের মুখে দুয়ো দিয়ে, রোববারের বিকেলে বাঙালি প্রমাণ করে দিল, তার গেছে যে দিন তা একেবারে যায়নি। বরং সে আবার ফিরে এসেছে। নতুন রূপে, নতুন মহিমায়, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে। আজও বহাল তবিয়তেই বেঁচে আছে বাংলার ফুটবল আর বাঙালির ফুটবল-প্রেম।

[আরও পড়ুন: ‘দেশের জার্সি পরলে চোখে জল আসবে’, জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে আবেগঘন রিঙ্কু সিং]
বৃষ্টিনেশা ভরা বিকেলবেলায় বাংলার এই মুখ আমি দেখিয়াছি। আর তাই বারেবারে বলতে ইচ্ছে করে, বাঙালি আজও সেই কবিতা ভালবাসে, বৃষ্টি-ফুটবল-কলকাতা মিলেমিশে যে কবিতার জন্ম হয়। সেই অসম্ভবের খেলায় ডুব দিতে বাঙালি আজও আছে বাঙালিতেই।
সর্বশেষ খবর
-
যুদ্ধের ধাক্কায় বেসামাল, ফুরিয়ে এসেছে অস্ত্র! এবার হার মানবে ইরান?
-
নবদ্বীপের ‘ত্রিপলচোর’ তৃণমূল চেয়ারম্যানের মামলাই লড়লেন না আইনজীবীরা! এজলাসের বাইরে ‘চোর’ স্লোগান, পড়ল ডিম
-
৬ ঘণ্টায় দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি! রেলমন্ত্রীর বুলেট ট্রেন ঘোষণায় খুশির হাওয়া উত্তরে
-
রক্তারক্তি কাণ্ড! হাসপাতালে অশোক ভট্টাচার্য, কেমন আছেন বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা?
-
উনিশেই সেরার শিরোপা, ইতিহাস গড়ে ফরাসি ওপেনের নতুন রানি মীরা আন্দ্রিভা