নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি মোতাবেক, ২০১৬ সালে ক্ষমতায় এসে বিহারে মদ ‘নিষিদ্ধ’ করে দেন নীতীশ কুমার। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে’ (‘এনএফএইচএস’)-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট বলছে, বিহারিবাবুদের মদ্যপান ১.১% বেড়েছে। নিষেধের ফলে আবগারি খাতের আয় গেল জলে। উল্টে চালানি মদ অনেক সময় ‘ভেজাল’ হওয়ায় অসুস্থতা এমনকী মৃত্যু ঘটল মানুষের। লিখছেন, চিরঞ্জীব রায়।
মূলত মহিলাদের ব্যালট বাক্সে টানতে ২০১৫ সালের নির্বাচনী প্রচারে রাজ্যে মদ্যপান ‘নিষিদ্ধ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন নীতীশ কুমার। যুক্তি ছিল, বিহারের মাটি থেকে নেশা নির্বাসিত হলে পরিবারে নারীর উপর অত্যাচার কমবে, গরিবের কষ্টার্জিত টাকা মদে বয়ে যাবে না, এবং মদ-বিনা দিনযাপনে স্বাস্থ্যের উন্নতি হবে। পাটনার চাণক্যের চাল খেটেছিল। এবং তিনি কথা রেখেছিলেন। জিতে এসেই ২০১৬ সালে রাজ্যে মদ ‘ব্রাত্য’ করে দিলেন। উত্তম পদক্ষেপ। কিন্তু ১০ বছর পরে দেখা যাচ্ছে, নিষিদ্ধকরণের জেরে সুরাপান ইতিহাস হয়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া দূরস্থান, বিহারের মানুষ মদ-কে আরও ভালবেসে ফেলেছে! কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের ‘ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে’ (‘এনএফএইচএস’)-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট জানাচ্ছে, বিহারিবাবুদের মদ্যপান উল্টে ১.১% বেড়ে গিয়েছে। ‘নিষিদ্ধ’ করা সত্ত্বেও বেড়েছে, অর্থাৎ, সারা দেশে সাড়া ফেলে জনদরদি আইন চালু হলেও সেটা কার্যকর করায় পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
আরও পড়ুন:
২০১৬ সালের নিষেধাজ্ঞার আগেই ‘এনএফএইচএস’-এর তথ্যে রাজ্যে মদ্যপানে ভাটা দেখা দিয়েছিল। ২০০৫-’০৬ সালের ৩৫% থেকে ২০১৫-’১৬ সালে মদ্যপায়ীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২৯%। মজার কথা, ওই ১০ বছরেই নিয়মিত পানাসক্তের সংখ্যা বেড়ে যায় ৬ শতাংশ। তখন এর দরুন সরকারের অবাধ লাইসেন্স নীতিকে দায়ী করা হয়েছিল। ‘এনএফএইচএস’-এর ২০১৯-’২০ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, মদ-নির্বাসনের প্রথম দিকে মূলত প্রশাসনিক কড়াকড়িতেই– পুরুষের মদ্যপান নেমে আসে ২৯ থেকে ১৭ শতাংশে। বিবাহিতদের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, সুরাপ্রেমী স্বামীর সংখ্যাও কমেছে ১০ শতাংশ। ভাল প্রবণতা। কিন্তু ‘ড্রাই স্টেট’-এ তো এক বিন্দু মদও পাওয়ার কথা ছিল না! যে-কথা ছিল না, আইন প্রয়োগের পরেও সেটা নির্বিবাদে ঘটছে, তার কারণ ওই একটাই, সরকারি ঘোষণা ও তার বাস্তবায়নের মধ্যে বিস্তর ফারাক। মদের দোকান ‘বন্ধ’ করে দিলেই সুরাপায়ীর কাছে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় না।
তথাকথিত এক ‘ড্রাই স্টেট’-এ সস্তার সেই মদ আঁকড়ে ধরার ফল হল, ২০২১ সালে পশ্চিম চম্পারণ ও গোপালগঞ্জে মদের বিষক্রিয়ার বলি হয় ৪০ জন। পরের বছরের ডিসেম্বরে সরণ জেলায় ঘটে বিষমদের সবথেকে বড় হামলা। বলি হয় ৭৩ জন। ২ বছর পড়ে সরণ ও শিওয়ানে ফের ৩৫ গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়।
চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে মতিহারিতে একই কাণ্ড ঘটে।
গুজরাত সুরাশূন্য ঘোষিত হওয়ার পরে এখন পার্শ্ববর্তী রাজস্থান, দমন, হরিয়ানা এমনকী পাঞ্জাব থেকে ট্রাক ট্রাক দারু সে-রাজ্যে গুদামজাত হয়। তারপরে ‘বালটিওয়ালা’-র হাতে হাতে নির্বিঘ্নে বাড়ি বাড়ি ‘পোঁটলি’ পৌঁছে যায়। নাগাল্যান্ডের জোগানদার অসম, অরুণাচল এবং মায়ানমার। মণিপুরেও মদ প্রবাহিত হয় অসম, মিজোরাম এবং মায়ানমারের খুগা, তুইথাম খংখাই ইত্যাদি সীমান্ত দিয়ে। নির্যাসটা হল, বিহার রাজ্যটি কোনও অগম্য মরুভূমির মাঝখানে বা পাহাড়চূড়ায় নয়। তার তিনদিকে উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড এবং পশ্চিমবঙ্গ, যেখানে মদ বিক্রিতে বিন্দুমাত্র বিধিনিষেধ নেই। মাথার উপর নেপালের সঙ্গে ৭২৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ এবং প্রায় অরক্ষিত সীমানা। তাই শুধু মদ নয়, হেরোইন, আফিম, গাঁজা, স্ম্যাক বা কাফ সিরাপ সমেত সমস্ত নেশার সরঞ্জামের দ্বার একরকম অবারিত। রাজ্যের মদের দোকানে তালা ঝুলিয়ে দিলেই আন্তঃরাজ্য এবং আন্তর্জাতিক সীমান্তে শাটার নেমে যাবে না, তার জন্য যথোপযুক্ত পাহারাদারি লাগবে, খুব অবাক কথা, এটা বিহার সরকার ভাবেনি।
এর কয়েকটি শোচনীয় পরিণতি ঘটেছে। রাজ্যের বাইরে থেকে চোরাচালান হয়ে আসা মদ অনেক বেশি দামে কিনতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে বিহারবাসী নিঃস্ব হয়েছে। ২০১৬ সালের আগে আবগারি খাতে রাজ্যের আয় ছিল ৩১০০ কোটি টাকা, বিহারের বার্ষিক রাজস্বের ১৪%। মদ বন্ধ হয়নি, অথচ সেই আয়ও গিয়েছে জলে। চালানি মদ অনেক সময়ই ‘ভেজাল’ হওয়ায় অসুস্থতা, এমনকী জীবনের বিনিময়ে তার দাম দিতে হয়েছে।
বাকি দু’টি বিষয় আরও মারাত্মক। বাইরে থেকে চোরাচালানির পরিমাণ যথেষ্ট না হওয়ায় রাজ্যজুড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো ‘অবৈধ’ চোলাই তৈরির ভাটি গজিয়ে উঠেছে। তথাকথিত এক ‘ড্রাই স্টেট’-এ সস্তার সেই মদ আঁকড়ে ধরার ফল হল, ২০২১ সালে পশ্চিম চম্পারণ ও গোপালগঞ্জে মদের বিষক্রিয়ার বলি হয় ৪০ জন। পরের বছরের ডিসেম্বরে সরণ জেলায় ঘটে বিষমদের সবথেকে বড় হামলা। বলি হয় ৭৩ জন। ২ বছর পড়ে সরণ ও শিওয়ানে ফের ৩৫ গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়। চলতি বছরের মার্চ ও এপ্রিলে মতিহারিতে একই কাণ্ড ঘটে। প্রশাসন ও পুলিশের হিসাবে ‘বৈধ’ মদের দোকান বন্ধ হওয়ার পর থেকে সরণ, শিওয়ান, গয়া, ভোজপুর, বক্সার, গোপালগঞ্জ, দুই চম্পারণে অন্তত ৪০০ মানুষ বেআইনি চোলাই মদের শিকার হয়েছে। বেসরকারি হিসাবে সংখ্যাটা কয়েক হাজার।
২০১৬ সালের আগে আবগারি খাতে রাজ্যের আয় ছিল ৩১০০ কোটি টাকা, বিহারের বার্ষিক রাজস্বের ১৪%। মদ বন্ধ হয়নি, অথচ সেই আয়ও গিয়েছে জলে। চালানি মদ অনেক সময়ই ‘ভেজাল’ হওয়ায় অসুস্থতা, এমনকী জীবনের বিনিময়ে তার দাম দিতে হয়েছে।
‘ইনস্টিটিউট ফর হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট’ বা ‘আইএইচডি’-র সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে, আরও শোচনীয় যা ঘটেছে, তা হল, মদের আকালের সুযোগ নিয়ে নেশাপ্রিয়দের জীবনে মাদকের চুপিসারে ঢুকে পড়া। নানা মাদকের সম্ভার চোরাপাচারের জন্য হাত বাড়ালেই নেপাল তো ছিলই– বিহারের, বিশেষ করে মাওবাদ-সন্ত্রস্ত এলাকা– যেমন: জামুই, নওয়াদা, ঔরঙ্গাবাদ, গয়া ইত্যাদি জেলায় গাঁজা চাষ হয়েছে। আফিমের কারবার বেড়েছে। অর্থাৎ, নীতীশের স্বপ্নপূরণ করে বিহারের নেশামুক্তি ঘটেনি বরং সে সমাজের ও বয়সের বিভিন্ন ধাপে সে আরও ডালপালা ছড়িয়েছে।
অনেকটা মুখ্যমন্ত্রিত্ব দখলে রাখার এবং খানিকটা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার দিকে তাকিয়ে নীতীশ কুমারের নেওয়া এত বড় সিদ্ধান্তে আবেগ বেশি ছিল, প্রস্তুতি কম। গুজরাত, মণিপুর বা নাগাল্যান্ডের গল্প তঁার অজানা ছিল না। তবু নেপাল এবং আন্তঃরাজ্য সীমান্ত দিয়ে সংগঠিতভাবে মদ চোরাচালান আটকানোর নিশ্চিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। মদের দোকান বন্ধ করলে রাজ্যে কালোবাজারি হবেই। পুলিশ প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে, প্রয়োজনে টাস্ক ফোর্স গড়ে তুলে সেটা বন্ধ করার সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাও তিনি নেননি। বেআইনি চোলাইয়ের কারবার বাড়বে জেনেও সেই ‘ক্ষুদ্রশিল্প’ সমূলে বিনাশের কথা ভাবা হয়নি। মদ ‘নিষিদ্ধ’ করলেই রাজ্যে রাতারাতি নেশায় আসক্তি উধাও হয়ে যাবে না। এই সত্যটাকে গুরুত্ব দিলে মদের ‘বিকল্প’, অর্থাৎ মাদকের দৌরাত্ম্য রুখতেই সর্বোচ্চ কড়াকড়ি জারি উচিত ছিল। তাছাড়া, স্থানীয় প্রতিনিধি, রাজনেতা এবং মদ ও মাদক মাফিয়াদের দুষ্টচক্র ভাঙাও সহজ ছিল না। ফলে ‘নিষেধাজ্ঞা’-র পরেও মদের অবাধ স্রোত বয়েছে এবং সরকার-পোষিত একটা শ্রেণি পকেট ভরিয়ে সেটা নির্ঝঞ্জাট রেখেছে।
মানবচরিত্রের একটা আপাতবিরোধও বিহারে মদ-নিষেধের ব্যর্থতায় দায়ী। সেটা হল, কোনও কিছু বারণ হলেই শিশু থেকে বৃদ্ধের তার প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। কারণ, সেই কাজটা করে এক নিষিদ্ধ সুখ, নিজের ক্ষমতায়নের তৃপ্তি পাওয়া যায়। তাই অ্যাডাম আপেল খেয়ে ফেলে। ট্রাফিক সিগনাল ভাঙা হয়। নেশার জগতে পা দেওয়া হয়। জুয়ার বোর্ড থেকে পতিতালয়ের প্রতি চৌম্বকীয় টান অনুভব করা হয়। সরকার মদ ‘নিষেধ’ করেছে? তবে মদ জোগাড় করে ও খেয়ে পৌরুষ জাহির করা যাক! এই মনস্তত্ত্বও বিহারকে ‘ড্রাই স্টেট’ হয়ে উঠতে দেয়নি।
জামুই, নওয়াদা, ঔরঙ্গাবাদ, গয়া ইত্যাদি জেলায় গাঁজা চাষ হয়েছে। আফিমের কারবার বেড়েছে। অর্থাৎ, নীতীশের স্বপ্নপূরণ করে বিহারের নেশামুক্তি ঘটেনি বরং সে সমাজের ও বয়সের বিভিন্ন ধাপে সে আরও ডালপালা ছড়িয়েছে।
একটা তেতো সত্যি হল, যেখানে জোগানের বিন্দুমাত্র সুযোগ আছে, সেখানে মদ্যপান বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। গার্হস্থ হিংসা রোধ, গরিবের অপচয় বন্ধ করা, বা শরীর নীরোগ রাখাই যদি উদ্দেশ্য হয়– তাহলে এই সত্যটা উপলব্ধি করে বিহারে সম্পূর্ণ ‘নিষেধাজ্ঞা’ এবং মদের অবাধ জোগানের মাঝামাঝি একটি রাস্তা বেছে নেওয়া উচিত ছিল। দোকানের সংখ্যা কমানো যেত। পান করার বয়ঃসীমা নিয়ে কড়াকড়ি করা, এবং বিক্রির সীমা বেঁধে দেওয়া যেত। সরকার মদ্যপান-বিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলার প্রয়াস নিতে পারত। কিন্তু সেসব না করে এক কোপে শত্রু সাবাড় করতে গিয়ে নীতীশ বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরো করে ফেললেন। যে-ভুলের মাশুল বিহারবাসী এখনও দিচ্ছে, আগামীতেও দেবে।
আরও পড়ুন:
সর্বশেষ খবর
-
রথযাত্রা শেষে কেন মা লক্ষ্মীকে রসগোল্লা খাওয়ান জগন্নাথ? লুকিয়ে কোন পৌরাণিক রহস্য
-
‘তুম্বড় ২’-এ আলিয়া, ১০০ কোটির ‘হাস্তার লোকরহস্যে’ কোন ভেলকি দেখাবেন?
-
ইয়ামাল কাঁটায় বিদ্ধ এমবাপে, স্প্যানিশ তরুণের ডবল হ্যাটট্রিক রুখতে পারবেন ফরাসি অধিনায়ক?
-
ফের বারুইপুর, অপহরণ ও ধর্ষণের চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার যুবক!
-
অস্ত্রোপচার ছাড়াই প্রেমিকার গোপনাঙ্গের কঠিন রোগ ধরল এআই! জনসনের দাবি আদৌ সম্ভব?