১৫ অগ্রহায়ণ  ১৪২৮  বৃহস্পতিবার ২ ডিসেম্বর ২০২১ 

READ IN APP

Advertisement

নোট বাতিল: মায়ের থেকে মাসির দরদ বেশি নয় তো?

Published by: Sangbad Pratidin Digital |    Posted: November 11, 2016 3:24 pm|    Updated: November 11, 2016 3:24 pm

Can't We be More Social Than Active in Social Media?

অজস্র কথার জাগলারি কি ভুলিয়ে দিল আমরা আসলে কী পারি? অযথা আতঙ্ক না ছড়িয়ে যদি একজন মানুষ দু’জন মানুষকে বোঝাতেন, তবে কি পরিস্থিতি একটু সহজ হত না? বন্দুক প্রশাসনের ঘাড়ে রেখে আমরাই বা কতটা দায়িত্ব পালন করলাম? উত্তরের খোঁজে সরোজ দরবার

‘মরমীয়া তুমি চলে গেলে দরদী আমার কোথা পাব, কারে আমি এ ব্যাথা জানাব?’- বড় দরদ দিয়েই গেয়েছিলেন সতীনাথ মুখোপাধ্যায়৷ সত্যি প্রকৃত দরদী থাকা কপালের জোর৷ এ পোড়া জীবনের ব্যথাটুকু কেউ যদি অনুভব করেন, মন্দ কী! তবে দরদীর ভূমিকায় মায়ের থেকে মাসির দড় হয়ে উঠলে, আখেরে তা ‘দর্দ’ হয়ে ওঠার সম্ভবনাই বেশি৷ এই সময়ে দাঁড়িয়ে অন্তত সেরকমই একটা চিরতা গেলা অনুভূতি হচ্ছে৷

এই ক’দিন আগেই এক ঝাঁ-চকচকে রেস্তরাঁয় গাড়িচালককে ঢুকতে না দেওয়া নিয়ে উত্তাল হয়েছিল কলকাতা৷ বেশ একটা প্রতিবাদের মিঠে উত্তাপে গা সেঁকে নিয়েছিল গতে বাঁধা শহর৷ কেউ কেউ তো সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেও দিয়েছিলেন, তিনি তাঁর কাজের লোককে নিয়ে কীরকম বহুজাতিক রেস্তরাঁয় ডিনার করেছেন৷ কে কেমন করে ড্রাইভারের সঙ্গে খাবার ভাগাভাগি করে নেন, কাজের লোকের সঙ্গে একই কাপে কারা কেমন চা পান করেন-এমন ভুরি ভুরি নমুনায় ভরে উঠেছিল ভার্চুয়াল দেওয়াল৷ বহু মানুষ আশ্বস্ত হয়েছিলেন এই ভেবে যে, এই আকালেও শহরের মনটি অন্তত নষ্ট হয়ে যায়নি৷ অতি উত্তম৷ প্রশ্ন হল, সেই মনটি নোট বাতিলের ক্ষেত্রে গল কোথায়?

প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর থেকে আর কিছু হোক না হোক, জুকেরবার্গের থলি ভরে উঠেছে৷ যেভাবে মানুষ হামলে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় রাগ-ক্ষোভ-হতাশা-প্রতিবাদ ব্যক্ত করেছেন, তার তুলনা মেলা ভার৷ এত এত প্রশ্নের ছড়াছড়ি যে সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রশ্ন বিচিত্রা বলে ভ্রম হয় মাঝে মধ্যে৷ আর এ সব প্রশ্ন, প্রতিবাদ সেই সাধারণ মানুষের জন্য, যাঁরা নাকি ‘কলকেতার তলায়’ থাকে৷ সত্যি তো এরকম হুট করে একটা ঘোষণা করে দিলেই হল? কে বলেছে গরিবগুর্বো মানুষের পাঁচশো, হাজার টাকা নেই! এবার তারা কী করবে? হাতে গোনা কটা টাকা মাত্র যখন সম্বল, তখন কী করে সংসার চলবে! এই তো অমুকের রান্নার মাসি বলছেন, টাকা সব খেলনা হয়ে গেল৷ তমুকের ঠিকে মাসি বললেন, উপার্জন সব ফেলনা হয়ে গেল৷ অতএব হায় হায়! সুতরাং ছিঃ ছিঃ! হে প্রধানমন্ত্রী, আপনি সাধারণ মানুষের কথা ভাবলেন না? এরকম একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বৃহত্তর ভারতবর্ষের কথা চিন্তা করলেন না? এটা কীরকম হল!

কী হল, কী হল করে গেল গেল রব উঠেছে৷ সাধারণ মানুষের প্রতি উদ্বেগের ঘটায় রাতের ঘুম নষ্ট হয়েছে শিক্ষিত সমাজের৷ রাত ভোর হয়ে যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ আর দোষারোপ তবু থামে না৷ হ্যাঁ, সাধারণ মানুষের যে ভোগান্তি হবে তা নিশ্চিত প্রশাসন জানত৷ সে কথা স্বীকারও করে নেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তার স্পষ্ট নির্দেশিকা ছিল৷ যদি মেনেও নিই যে, ‘কলকেতার তলায়’ থাকা এই শ্রেণি তা বুঝতে অপারগ৷ কিন্তু এই সর্বজ্ঞ শিক্ষিত দরদি শ্রেণির তা বুঝতে তো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়৷ কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া তন্নতন্ন করে এমন একটা বার্তা দেখলাম না, যেখানে কেউ ঘোষণা করছেন যে তিনি তাঁর বাড়ির কাজের লোকটিকে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে নিয়েছেন৷ যাঁদের আইডেন্টিটি কার্ড নেই তাঁদের জন্য উদ্বেগ থাকা ভাল৷ কিন্তু এরকম একটা পরিসর তো হতে পারত যে, সেই মানুষটার হয়ে টাকা যাঁর আই কার্ড আছে তিনি জমা করে দিচ্ছেন৷ তাতে কী আর ইতরবিশেষ হত! প্রখ্যাত এক টিভি চ্যানেলে দেখলাম, আইটির ভাইটি গোছা গোছা টাকা রাতেই জমা করতে গিয়েছেন৷ তাঁকে দেখে নিশ্চয়ই তাঁর বাড়ির কাজের লোকটি খুব একটা স্বস্তিতে থাকবেন না৷ কিন্তু পঞ্চাশ দিনের সময়সীমা যখন আছে, তখন এই অতি ব্যস্ততার কী প্রয়োজন ছিল? যদি ব্যক্তিগত প্রয়োজনের নিরিখে থেকেও থাকে, তাহলে ওই জমা করার মুহূর্তে কি তিনি তাঁর কাজের লোকটির কথা ভাবলেন! ভাবলেন তো না৷ কই টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি তো বললেন না যে, আমি অমুখকেও ডেকে এনেছি, যাতে ও অসুবিধায় না পড়ে! অথচ এই কলকাতাই নাকি কাজের লোকের সঙ্গে এক কাপে চা খায় বলে মোক্যাম্বোর ঘটনার সময় আত্মপ্রসাদ লাভ করেছিল৷ আর এইখান থেকেই দরদীর মুখ-মুখোশে যেন ঠোকাঠুকি লাগার শুরু৷

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? সেই পুরাতন সহজ পাঠ, আপনি বাঁচলে বাপের নাম৷ নিজেরটা নিশ্চিত হলে তারপর খানিকটা ছদ্ম বৌদ্ধিকতার অনুশীলন৷ যে মেকি বুদ্ধিজীবিতা এক কাল্পনিক গ্রামের ধারণা তৈরি করে৷ কথায় ‘স’ এর টান দেওয়া এক ধরনের ভাষাকেই সাব অল্টার্নের ভাষা বলে ধরে নিয়ে গ্রাম-মফস্বল তথা ওই কলকেতার তলায় থাকা শ্রেণির প্রতি সমানুভূতি প্রকাশ করে৷ কোথায়? না সোশ্যাল মিডিয়ায়৷ অতএব হে আমার দরিদ্রের কুটির থেকে বেরিয়ে আসা ভারতবর্ষ, দয়া করে সোশ্যাল মিডিয়ায় লগ ইন করে সহনাগরিকের উদ্বেগ চিনে নাও৷ হ্যাঁ, তোমার পরিচয়পত্র না থাকতে পারে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও না থাকতে পারে, কিন্তু আমি ধরেই নিচ্ছি যে তোমার সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকাউন্ট আছে৷ এই উদ্বেগ প্রকাশকারীদের ধরণধারণ দেখে তাঁরা যে অনেকেই পোস্ট বক্স নম্বরের বাইরে পা রাখেন না তাই-ই মনে হয়৷ এমনকী তাঁদের শহরতলির ধারণাও যেন বাংলা সিরিয়ালের অভূতপূর্ব সাফল্যেরই প্রমাণ দেয়৷ এই উদ্বেগ প্রকাশকারীরা যে ঠিক কোন শ্রেণির কথা বলছে তাদের জীবন যাপনের কোনও বৈশিষ্ট্য, চরিত্র এঁদের কথাবার্তায় আশ্চর্যজনকভাবে অনুপস্থিত৷ শুধুমাত্র শহুরে সমাজের বাইরে বিরাট জনপদ বলে যা অভিহিত করা হয়, তার মধ্যে থাকা বহু বৈচিত্রের কোনও খোঁজ থাকে না৷ রাজ্য তো দূরের কথা, একটা জেলার ভিতরও প্রত্যেকটা অঞ্চল ভেদে অর্থনৈতিক কাঠামোর যে প্রভেদ, সুবিধা-অসুবিধার যে ফারাক, তা গভীর নীরিক্ষার দাবি রাখে৷ একজন চাষির যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, এক জরি শ্রমিকের তা নয়৷ কার হাতে কোন অঙ্কের কাঁচা টাকা থাকে, তা জানতে গেলে ওই শ্রেণিগুলির নাড়ির স্পন্দন জানতে হয়৷ সাধারণ সাধারণ করে যাঁরা গলা ফাটালেন, সাধারণ সম্পর্কে তাঁদের সাধারণ জ্ঞান কতখানি তাও তাই পৃথক আলোচনার দাবি রাখে৷ এ সেইরকম এক ধারণা যা পাখি বলে কাককে টিয়া বলে খাঁচায় এনে পুরে দিতে পারে৷ এই শিক্ষিত শ্রেণি যখন উইকএন্ডে শপিং মলে ভিড় জমান, এমনকী তিনদিনের বাসি সবজিও পরম যত্নে কিনে হাতের ডেবিট কার্ডটি বের করেন, তখন রিটেল দোকান থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামের চাষিটিকে কোন হেনস্তার মুখে পড়তে হয় তাঁর খোঁজ রাখেন কি? তাহলে কী জানব, এই সাধারণের হয়ে মুখ ফোটার সঙ্গে বাস্তবিক চোখ ফোটার কোনও সম্পর্কই নেই!

তাহলে অজস্র কথার জাগলারি কি ভুলিয়ে দিল আমরা আসলে কী পারি? অযথা আতঙ্ক না ছড়িয়ে যদি একজন মানুষ দু’জন মানুষকে বোঝাতেন, তবে কি পরিস্থিতি একটু সহজ হত না? অবশ্যই এই সচেতন করার দায় ছিল প্রশাসনের৷ নোট বাতিল ঘোষণার পরদিন থেকে রাজ্যে রাজ্যে তৃণমূল স্তরে যদি লাগাতার প্রচার করা যেত, তাহলে হয়তো বিনিমূল্যের ফর্ম দুটাকায় বিক্রি হত না৷ কিন্তু সব বন্দুক প্রশাসনের ঘাড়ে রেখে আমরাই বা কতটা দায়িত্ব পালন করলাম? প্রশাসনকে দোষারোপ করা দায়িত্ব এড়ানোর সহজ উপায়৷ সোশ্যাল মিডিয়া তার সহজতম পরিসর৷ আর এ দুইকেই ভরসা করে হাত ধুয়ে ফেলে হে জনগণ, আমি-আপনি, সত্যিই কি নাগরিক দায়িত্ব পালন করলাম? কিছু খিল্লি হল, কিছু আতঙ্ক ছড়াল, কিছু দোষারোপ, কচকচি হল রাজনৈতিক ফায়দা তোলা নিয়ে কথা কাটাকাটি হল, কিন্তু তাতে ওই কলকাতার তলায় থাকা শ্রেণির কী সত্যিই কোনও সুবিধা হল!

আসলে এটা একটা প্রবণতা৷ যে প্রবণতা আমাদের জানায়, আমরা সবকিছু খুব স্বচ্ছ দেখছি৷ নোবেলজয়ী পদার্থবিদ ব্রায়ান জোসেফসন চমৎকার একটি কথা বলেছিলেন, ‘We Think That We Think Clearly, But That’s Only Because We Don’t Think Clearly’  এ কথাই যেন এখন বড় বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে৷ প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ভাল-মন্দ বিচার নিয়ে আমরা যতটা উদগ্রীব, ততটাই উদাসীন নিজেদের কর্তব্য নিয়ে৷ সব ক্ষেত্রেই তাই৷ এই সময় সকলকেই অনুমতি দেয় নিজের মতামত জানানোর৷ সে তো গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে সুস্বাস্থ্য৷ কিন্তু স্বাস্থ্য আর শরীরে অহেতুক মাংসের প্রাচুর্য এক নয়৷ সম্পদ তখন বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়৷ এই প্রবণতাও আমাদের সেই বিপদের মুখেই দাঁড় করাচ্ছে না তো?

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে