মানুষ যদি চারটে দিন এত গ্লানিমুক্ত হয়ে ওঠার বাসনাময় হয়ে উঠতে পারে, তাহলে বাকি ৩৬১ দিন কি দোষ করল? তাহলে গলদ কোথায়? কোথাও কি উৎসবের ধারণাতেই ভুল থেকে যাচ্ছে! উত্তরের খোঁজে সরোজ দরবার
উৎসব তুমি কার? ইন্টারনেট বলবে রেখার নয় ঋতুপর্ণের৷ আর পুজোর মাইক বলবে উৎসব জনতার৷ তা সে উৎসব ফুরোল প্রায়৷ ছোটগল্পের মতো শেষ হয়েও শেষ না হওয়ার রেশ অবশ্য এখনও রয়ে আছে৷ কিন্তু আদতে যা হওয়ার তা হয়ে গিয়েছে৷ ওই দশমীর কোলাকুলির মধ্যেই মুখোশটা তুলে রাখা গিয়েছে৷ আবার গুছিয়ে গনগনে জীবনের আসরে নেমে পড়া৷ আবার প্রতিবেশীর সমৃদ্ধিতে চোখ টাটানো থেকে পরনিন্দা-পরচর্চার ক্যালেন্ডারে উল্টে যাওয়া একের পর এক পাতা৷ তাহলে এই উৎসব কোথায় গেল? কোথায় গেল সম্মিলন? কোথায় গেল মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা?
বস্তুত এই বার্তা দেওয়ার মধ্যেই উৎসবের ব্যর্থতা৷ যেমন যে কোনও শিল্পকে যখন দায়ে পড়ে বার্তাবাহক হতে হয়, সেখানেই শিল্পের ব্যর্থতা৷ নিশ্চিতই কোনও শিল্প নিজগুণে সময়কে আঁকড়ে ধরবে এবং প্রয়োজনীয় বার্তাটি লুকিয়ে রাখবে তার শিরা-উপশিরায়৷ যেমন শোণিতপ্রবাহ থেকে উপাদান পৃথক করা যায় না, অথচ শরীরের পক্ষে যা দরকার সবই তো বাহিত হয়ে চলেছে৷ শিল্পেরও তাই হওয়া উচিত৷ কিন্তু যখনই তা উচ্চকিত হয়ে কিছু বলতে যায় তখনই শিল্প পা দিয়ে ফেলে প্রোপাগাণ্ডার পরিধিতে৷ উৎসবের ক্ষেত্রেও তাই৷ যে উৎসব নিয়ে এত হইচই, এত কোটি টাকার ঝাড়বাতি জ্বলে ওঠা তা কি আদৌ উৎসবের সংজ্ঞায় পড়ে?
প্রশ্নটি অমূলক নয়, কেননা যতই মলিনতা, দীনতা ঘোচানোর কথা বলা হোক না কেন, বারেবারে ফিরে আসা উৎসব কই তা করতে সমর্থ হয় না কেন? এই চারদিন যে মানুষে মানুষে গলাগলি, হাতে হাতে ফেরি হওয়া অন্তরঙ্গতার যে উষ্ণতা, তা যদি সত্যি হয়, তাহলে বছরভর তা থাকে না কেন! এ যেন সেই বার্তাবহ সিনেমা দেখে হাততালি দেওয়া আর অপরাধের খবর দেখে জিভ চুকচুক করার সামিল৷ এমনটা তো হতে পারে না যে, সমস্ত কপটতা তুলে রেখে এই চারদিন মানুষ সত্যি সত্যিই ‘মানুষ’ হয়ে ওঠে৷ তাহলে এই চারদিন আসলে কী? উৎসব না ভণিতা!
আসলে উৎসব বলে যে বস্তুটি বর্তমানে চালু হয়েছে তা যে অনেকটাই বাজার নিয়ন্ত্রিত তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ এর মধ্যে ধর্মীয় ভাবটি যুক্ত থাকার ফলে বাজারের অনুপ্রবেশে আরও একটি সুবিধা হয়েছে এই যা৷ নইলে প্রতিমার সামনে চণ্ডীপাঠ হল না হল না কিংবা সন্ধিপুজোর সময়ে হেরফের হল কি না, তা বাজারের ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না৷ বরং আগে পরে বাজারের লেনদেনটি না দিলেই মাথায় হাত৷ নইলে পুজোয় বৃষ্টি হলে উৎসবের আয়োজকরা মুষড়ে পড়েন কেন, দীনতা-মলিনতা ঘোচাতে বৃষ্টি তো বাধা দেয় না৷ কোটি কোটি টাকার এই থিম, এই বিলাসের আয়োজন বস্তুতই মনে হয় মানুষের বৈভব, আধিপত্য, ক্ষমতার দম্ভপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়৷ এর মধ্যে উৎসব কোথায়? যদি মনে করা হয় কোনও এক বিশেষ শক্তিবলে এই ক’দিন সকলে অন্য মানুষে পরিণত হয়েছে, পা দিয়েছে এক মহানুভব সমানুভূতির দুনিয়ায়, তাহলে মনে হয় ভুলই ভাবা হচ্ছে৷ বরং বলা যেতে পারে এই চারদিনই এক মুখোশ চাপিয়ে নিয়েছে মানুষ৷ যার আড়াল থেকে দাঁত-নখগুলো দেখা যাচ্ছে না৷ প্রতিমা বিদায় হলেই যা সব আবার সচল, সজাগ হয়ে উঠবে৷
পাল্টা প্রশ্ন তুলে কেউ কেউ বলতেই পারেন, এত ক্লেদ-গ্লানির মধ্যে এই যে কটাদিনের সুস্থতা তা কি আকাঙ্ক্ষিত নয়? নিশ্চয়ই তা দরকার৷ প্রশ্ন শুধু, মানুষ যদি চারটে দিন এত গ্লানিমুক্ত হয়ে ওঠার বাসনাময় হয়ে উঠতে পারে, তাহলে বাকি ৩৬১ দিন কি দোষ করল? বছরভর তাহলে কেন ছোট ছোট অহংয়ের কৌটোগুলো খুলে রাখতে হয়, কেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষের বিষ চারিয়ে যায় এক মন থেকে আর এক মনে? তাহলে গলদ কোথায়? কোথাও কি উৎসবের ধারণাতেই ভুল থেকে যাচ্ছে! প্রতিদিনের যাপন আনন্দময় করে তোলার যে উৎসব, অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোয় আলোময় হয়ে ওঠার যে সুযোগ থাকে, সেই উদযাপন কি আমরা ক্রমাগত ভুলতে ভুলতে ভুলেই গিয়েছি! তাই চারদিনের উৎসবের মক ড্রিলকেই উৎসব বলে ধরে নিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছি৷
এ প্রশ্ন অবশ্য নতুন নয়৷ এই যে পাড়া পাড়ায় খুলে নেওয়া হচ্ছে টুনি বাল্ব, তাদের শেষ জ্বলায় লেগে থাকে এই প্রশ্ন৷ ছেঁড়া চালচিত্রের প্রেক্ষাপটে ধিকিধিক জ্বলা জাগপ্রদীপে জেগে থাকে এ প্রশ্ন৷ কেন চলে গেলে মা- এই শব্দবন্ধের মধ্যে লোকানো থাকে এক আক্ষেপ৷ কেন এই সুন্দর নষ্ট হবে? এখানেই প্রশ্ন জাগে, কেন এই বাজারনির্ভর প্রতীকটিকেই বা লাগবে? কেন মানুষ প্রতিদিন সামিল হতে পারে না সৌন্দর্যের উৎসবে? মনে হয়, এই ভাল থাকা, সম্মিলনের বার্তাটি যেদিন থেকে উৎসব দিতে গিয়েছে, সেদিন থেকে তা ওই প্রোপাগাণ্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ সত্যি উৎসবের সঙ্গে তার ফারাক হয়ে গিয়েছে বহু যোজন৷ যা পড়ে থাকে তা তাই স্রেফ খানিক হুল্লোড়৷
তবু বারবার ফিরে আসে একই চিত্রনাট্য৷ সফল পরিচালক নাকি তিনিই, যিনি একই ছবি বারবার দেখতে বাধ্য করান৷ কী যেন লুকনো থাকে তাঁর আস্তিনে, হাজার সমালোচনা সত্ত্বেও দর্শক সেই তুরুপের তাসের টানে বারেবারে ফিরে আসেন৷ এই উৎসবের চিত্রনাট্যও হয়তো সেরকমই কোনও সফল পরিচালকের, যিনি হুজুগে মাতাতে পারেন বছরের পর বছর৷ উৎসব তাই ফুরোয় বটে তবু নটে গাছটি মুড়োয় না৷
সর্বশেষ খবর
-
বদলে যাবে সোদপুর ও খড়দহ স্টেশনের নাম! রেলমন্ত্রকে প্রস্তাব মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তীর
-
অধিনায়কত্ব খোয়াচ্ছেন সূর্যকুমার, ভারতের নতুন টি-২০ অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার!
-
এই ৬ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে স্থগিত ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা! বড় সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তম উড়ান সংস্থার
-
প্রয়াত ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান কার্যনির্বাহী কর্তা নারায়ণ বসু
-
শ্লীলতাহানি, তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার স্বরূপ বিশ্বাস, ডিম হাতে থানা ঘেরাও ক্রুদ্ধ জনতার