Advertisement
Advertisement

Breaking News

Mob Lynching

‘গণপিটুনি’ কেন? ‘হেট ক্রাইমে’র বিরুদ্ধে অস্ত্র হোক নাগরিক সচেতনতা

কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার পর থেকে ভারতে ‘হেট ক্রাইম’ বেড়েছে।

Editorial on how to stop Mob Lynching
Published by: Kishore Ghosh
  • Posted:July 7, 2024 5:38 pm
  • Updated:July 8, 2024 11:54 am

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে যে-ক’টি ‘গণপিটুনি’-র ঘটনা পুলিশ ও প্রশাসনকে উদ্বেগে ফেলেছে, সেই সবক’টিতেই একটি সাধারণ ‘প্যাটার্ন’ লক্ষ করা যায়। সেটা কী? লিখছেন সুমন ভট্টাচার্য

বুদ্ধদেব গুহ লিখেছিলেন, বাঙালি ‘গণ’ শব্দটাকে পছন্দ করে। ‘গণস্বাক্ষর’, ‘গণ ডেপুটেশন’, ‘গণছুটি’ ইত্যাদি আর কী! কিন্তু, এই করতে গিয়ে কখন যেন আমরা ‘গণপিটুনি’ ও ‘গণধর্ষণ’ শব্দ দুটোর সঙ্গেও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলাম, তা খেয়ালই থাকল না। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহ হয়তো দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী বাম-জমানাকে কটাক্ষ করতে গিয়ে সেই সময়কার যে কোনও কিছুর সঙ্গে ‘গণ’ শব্দটিকে জড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাটিকে নিয়ে কটাক্ষ করেছিলেন। সত্যিই তো, পশ্চিমি গণতন্ত্রকে দেখলে, যেখানে একক ব্যক্তির প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ-ই যথেষ্ট, সেখানে এই ‘গণ’ কিছু করাকে পশ্চিমের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাম-মননের প্রভাব বলেই মনে হয়। এবং এই সূত্র ধরেই মনে করতে হয়– বাম আমলে রাজ্যের কিছু নির্দিষ্ট জেলায় গণপিটুনিতে মৃত্যুর ঘটনা কেমন নিত্য অভ্যাস হয়ে গিয়েছে!

Advertisement

এই ‘গণ’-র ঘটনায় যখন কেউ একা, সে কিন্তু ভীতু, কোনও কিছুতেই অগ্রণী হয় না। কিন্তু যখনই সে যূথবদ্ধ, তখনই সে অমিত বিক্রমশালী। যূথবদ্ধ হয়ে সে ‘পকেটমার’-কে পিটিয়ে মারতে পারে, ‘ছেলেধরা’-কে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে হত্যা করতে পারে, বা ‘নিষিদ্ধ’ খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছে– এই সংশয়ে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষকে খুন করতে পারে। ‘একা’ থেকে ‘গণ’ হয়ে যাওয়ার এটাই ‘মাহাত্ম্য’! গত এক মাস ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে যখন ‘গণপিটুনি’-র সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, ‘গণ-আদালত’ বসিয়ে প্রণয়ী যুগলকে শাস্তি দেওয়ার ভিডিও ‘ভাইরাল’ হচ্ছে, তখন আবারও এই ‘গণ’-শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা, তর্কবিতর্ক চরমে উঠেছে।

Advertisement

গণপিটুনির ঘটনাগুলিতে একটা সাধারণ ‘প্যাটার্ন’ বা ‘ধরন’ চোখে পড়বে। প্রথমে কোনও-না-কোনও একটা ঘটনা ঘটবে, খুন বা অপরাধ, এবং তারপরে সেই অপরাধকে কেন্দ্র করে সুকৌশলে গুজব রটিয়ে দেওয়া হবে। কোনওরকম তথ্য, পরিসংখ্যান, মানে, সত্যের ধারকাছ দিয়ে না-হেঁটে গুজবকে রটানো হবে এমন করে– যাতে এক বা কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ‘শত্রু’ হিসাবে চিহ্নিত করে দেওয়া যায়। আর, তারপরে সেই গুজবের ফলশ্রুতি হিসাবে আরও ছোট-ছোট ‘গল্প’ বাজারে ছাড়া হবে। যেমন ধরা যাক, প্রথমে বলা হবে, কোনও শিশু বা কিশোরের খুনের নেপথ্যে ছেলেধরা দায়ী, তারপরে সেই রটনাকে পল্লবিত করতে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা কোনও পেশার লোকজনদের সম্পর্কে রটনা বাজারে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এরপর আসবে গল্পগাছা। অর্থাৎ অমুক পাড়ায় বা অমুক মহল্লায় ‘ছেলেধরা’ হিসাবে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কেউ নাকি হাতেনাতে ধরা পড়েছে, এমনটাই রটবে। যাতে তারপরে ওই নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের কাউকে দেখলেই আক্রমণ করা হয়, আর ‘গণপিটুনি’-র ঘটনা ঘটে।

সাম্প্রতিকের পশ্চিমবঙ্গে যে-ক’টি গণপিটুনির ঘটনা পুলিশ ও প্রশাসনকে উদ্বেগে ফেলেছে, সেই সবক’টি ঘটনাতেও এই একই ‘প্যাটার্ন’ লক্ষ করা গিয়েছে। কোনও সংগঠিত শক্তি, সেটা কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শের প্রতি অনুরক্ত হতে পারে, বা ধর্মীয় মতাদর্শকে অনুকরণ করতে পারে, তারা তাদের শক্তপোক্ত আদর্শগত সংগঠনের ভর দিয়ে যে কোনও ধরনের রটনাকে চারা থেকে মহীরুহ করতে পারে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া– মানে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা টুইটারকে ব্যবহার করে। আমাদের রাজ্যে ঘটা সাম্প্রতিকের সব ক’টি গণপিটুনির ঘটনার পিছনে যেমন গুজবের অস্তিত্ব আছে, তেমনই সেই গুজবকে ছড়িয়ে দিতে ফেসবুক পেজ বা হোয়াটসঅ্যাপকে গ্রুপকে ব্যবহার করা হয়েছে।

সম্প্রতি একটি গণ সংগঠনের বুদ্ধিজীবী সদস্যরা দেখা করলে– মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করিয়ে দিয়েছেন– তৃণমূল সরকার ৫ বছর আগেই ‘গণপিটুনি’-র প্রতিরোধে বিল পাস করেছিল, এবং সেই বিল রাজভবনে আটকে রয়েছে। অর্থাৎ ‘হেট ক্রাইম’ বা ‘ঘৃণা থেকে তৈরি হওয়া অপরাধ’ বন্ধ করতে মুখ্যমন্ত্রী সচেষ্ট হলেও রাজভবনের থেকে সহযোগিতা পাননি। এ-কথা তো সত্যি যে, গত ১০ বছরে, অর্থাৎ কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার পর থেকে ভারতে ‘হেট ক্রাইম’ বেড়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দফতরের রিপোর্টেও বারবার সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে গো-মাংস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, শুধুমাত্র এই সন্দেহের ভিত্তিতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এত মানুষ ‘গণপিটুনি’-র শিকার হয়েছেন, যে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলি বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

ভারতের বিশ্বকাপ ক্রিকেট জেতার আবহেও আমাদের মনে রাখতে হবে ঝাড়খণ্ডেই মুসলিম যুবককে পিটিয়ে মারা হয়েছে শুধুমাত্র ক্রিকেট মাঠে গণ্ডগোলকে কেন্দ্র করে। যে-ক্রিকেটের দেশকে জোড়ার কথা, সেই ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে বিবাদ যদি ধর্মীয় উন্মাদনার জন্ম দেয় এবং কাউকে ‘গণপিটুনি’-র শিকার হয়ে মরতে হয়, তাহলে তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে! কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, তঁাদের সরকারের নিয়ে আসা নতুন ৩টি দণ্ডবিধি– যেমন ‘ন্যায় সংহিতা’-য় ‘গণপিটুনি’ রোধে কড়া শাস্তির কথা রয়েছে। কিন্তু বিরোধীরা, যঁারা ‘ন্যায় সংহিতা’-কে ‘অন্যায় সংহিতা’ বলে উল্লেখ করেন, তঁারা মনে করেন– কেন্দ্রের শাসক দলের প্রশ্রয়েই যেখানে ‘গণপিটুনি’-র মতো ঘটনা ঘটে, সেখানে নিগৃহীতদের সমর্থনে আসলে কতটা ‘ন্যায়’ দিতে আন্তরিক কেন্দ্রের বাঘা-বাঘা মন্ত্রী? তাই ‘গণপিটুনি’ রোধে আইনের পাশাপাশি সচেতনতা বাড়ানো বা কীভাবে নাগরিকদের গুজব এড়িয়ে সঠিক তথ্য জানতে আগ্রহী করে তোলা যায়, সেই নিয়েও চিন্তাভাবনা চলছে।

পশ্চিমবঙ্গ প্রশাসন নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনকেও ব্যবহার করতে আগ্রহী। ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ কিছু দিন আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেড়ে চলা ‘হেট ক্রাইম’-এর বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল– ভারত, বাংলাদেশ কিংবা শ্রীলঙ্কায় যদি ৩০০টির মতো ‘হেট ক্রাইম’-এর ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করা যায়, তাহলে দেখা যাবে– এর মধ্যে ২৩২টির নেপথ্যেই অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত কোনও বক্তব্য বা ভিডিও। সোজাকথায় বলতে গেলে সোশ্যাল মিডিয়ার তাতানি বা প্ররোচনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ‘হেট ক্রাইম’ বা ‘গণপিটুনি’-র মতো ঘটনা ঘটে। ভুললে চলবে না, পশ্চিমবঙ্গ সেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ারই অঙ্গ, আর আমাদের চারপাশে সোশ্যাল মিডিয়াই আপাতত নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। তাই কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে গুজব ছড়ানো হচ্ছে বা ‘হেট ক্রাইম’-এর পরিস্থিতি উদ্ভূত হচ্ছে– সে-বিষয়েও সতর্ক থাকা দরকার, শুধু সরকার বা প্রশাসনকে নয়, সব সচেতন নাগরিককেও।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
[email protected]

Sangbad Pratidin News App

খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ