২৬ আষাঢ়  ১৪২৭  রবিবার ১২ জুলাই ২০২০ 

Advertisement

বাংলা হরফে বাংলা ভাষার সহবাস

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: February 21, 2019 4:54 pm|    Updated: February 21, 2019 4:54 pm

An Images

অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায়: নয়ের দশকের শেষের দিকে যখন এই কম্পিউটার বস্তুটি জাঁকিয়ে বসছে দেশজুড়ে, ঘটনাচক্রে, সেই সময়েই গেল-গেল রব উঠেছিল বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়েও। গ্লোবালাইজেশনের দুনিয়া দু’গালে রেকারিং চড় কষিয়ে, নিলডাউন রেখে, গিলে ফেলছে বাংলাকে। আর তাতে আরেক ডিগ্রি যোগ করেছে সেই সময় কম্পিউটারের আগমনি গান। তাতে বাংলায় লেখা যায় না! ‘রোমান’ অর্থাৎ ইংরেজি কি-বোর্ড। যেহেতু কম্পিউটারেই সব করতে হবে, আর কম্পিউটারে ইংরেজিই চলে, আর সবকিছুর পিছনে চালচিত্র ধরে আছে এমন একটা সমাজ যেখানে ইংরেজিরই জয়জয়কার– তাই বাংলা এক্কেবারে বাউন্ডারি লাইনের ধারে।

এই সময়, সাধারণ মানুষের জানাবোঝার আড়ালে, ২০০৩-এ ‘অভ্র’ নামে একটি কি-বোর্ড সফ্‌টওয়্যারের আবির্ভাব হল যাতে বাংলা হরফে লেখা যায় এমন সবকিছু টাইপ করার উপায় আছে। আগেও বাংলা টাইপের সফ্‌টওয়্যার ছিল কয়েকটা। কিন্তু তাদের ব্যবহারের জন্য আলাদা করে টাইপিং শিখতে হত। এবং তা ছিল বেশ কষ্টসাপেক্ষ। এবার যে এই ‘অভ্র’ এল, তাতে বাংলা লেখা গেল সহজ। ‘ফোনেটিক্‌স’-এ লেখা। মানে, যে কায়দায় রোমান (ইংরেজি) হরফে বাংলা টাইপ করা হয়, সেইরকমভাবে। এই শুরু হল ‘বিপ্লব’।

প্রথমেই যেটা হল, প্রকাশনার ব্যাপারটা সহজ হয়ে গেল। ফলে আগে যেখানে পাঁচটা বই, কাগজ বা ম্যাগাজিন বেরত, সেটা একলাফে হয়ে গেল পাঁচশো। ফলে লেখার আর লেখকের চাহিদা বাড়ল। এতে সাহিত্যের মান বিশেষ বাড়ল কি না অন্য প্রশ্ন। কিন্তু পেটের তাগিদে বাংলা ভাষার প্রয়োজন বাড়ল তাতে সন্দেহ নেই। লেখকরা বেশিরভাগই কাগজে-কলমে লিখে লেখা জমা দিতেন, আর প্রকাশক তা বাংলায় কম্পোজ করে নিতেন। এই সময়েও যে প্রবীণ, বিখ্যাত লেখকরা সফ্‌টওয়্যারে বাংলা লিখছেন, তা নয়। কিন্তু আস্তে আস্তে বাংলা সফ্‌টওয়্যার হাতে এল লেখকদের। ফলে হাতে-লেখার পাশাপাশি নবীন লেখকদের হাত ধরে, চুঁইয়ে চুঁইয়ে সফ্‌টওয়্যারে লেখা বাংলা বাড়তেই থাকল। তারপর ব্যাপার যেখানে এসে দাঁড়াল যে, এই প্রজন্মের লেখকদের যদি বলা হয় পাঁচশো শব্দের একটা লেখা দিতে হবে, সে প্রথমে ডেডলাইন না খুঁজে, কম্পিউটার খোঁজে!
এই সঙ্গেই আরও দু’টি ঘটনা ঘটল গায়ে গায়ে।

এক, সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ এল। আর দুই, কম্পিউটার-স্মার্টফোনের সঙ্গে এসে গেল বাংলা কি-প্যাড। এই দুইয়ে মিলে আর এক ধরনের বিপ্লব ঘটিয়ে দিল বাংলার ব্যবহারে। বাংলায় স্বচ্ছন্দ, কিন্তু ইংরেজিতে নয়– পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ এবং সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা এইরকম মানুষের সংখ্যাটা বিপুল। কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইন্টারনেট, ব্লগ, সোশ্যাল মিডিয়া, স্মার্টফোন আর সহজলভ্য বাংলা ‘ফোনেটিক্‌স’ কি-প্যাড মিলিয়ে এই অগণিত বাংলাভাষী মানুষের কাছে একটা অবারিত দ্বার খুলে গেল স্বাধীনভাবে নিজের মত ও মনের ভাব প্রকাশের, এবং তা নিয়ে চোখের পলকে লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার।

ইংরেজি বা অন্য যে কোনও ‘অ-মাতৃভাষা’ ব্যবহারের যে অসুবিধা ও বাধা, তা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ায় সাধারণ মানুষ লিখতে এবং ‘কমিউনিকেট’ শুরু করল কথ্য বাংলা ভাষায়। রোমান হরফে বাংলা লিখেও হয়তো সেটা সম্ভব, কিন্তু তা মনে মনে অনুবাদ করে পড়তে হয়। তাতে মজা নেই। এক্ষেত্রে একদম চেনা—জানা বাংলা হরফে লেখার এবং পড়ার সুবিধার জন্য একটা বাঁধনছাড়া ভাব এল। হয়তো কেউ জানলার সিটে বসে অফিস যাচ্ছে, পাশ দিয়ে যাওয়া স্কুলবাস দেখে তার ছোটবেলার কথা মনে পড়ল, সে মোবাইলে সঙ্গে সঙ্গে সেই কথা ছোট্ট করে লিখে পোস্ট করল ফেসবুকে। কেউ হয়তো ছোটগল্প লেখে। সে কোথাও ছাপাতে পারে না। এখন রোজ রাতে সে একটা করে গল্প পেঁৗছে দিতে পারে হাজার মানুষের কাছে। কেউ কবিতা লেখে। তার কবিতা ছাপবে কে? দরকার নেই। পরপর লেখা লিখে সে তৈরি করে ফেলছে নিজের ‘অডিয়েন্স’। কেউ জোক্‌স লিখছে, কেউ প্রতিবাদ করছে, কেউ হোয়াটসঅ্যাপে প্রেম করছে, কেউ অনুবাদ করছে গীতা, কেউ অকথ্য গালাগাল দিচ্ছে, কেউ গান লিখে অন্যকে বলছে সুর দিতে। আর এসবই হচ্ছে বাংলা ভাষায়। বাংলা হরফে।

এখন প্রশ্ন হল: এগুলো ভাল? এসব দিয়ে কি বোঝা যায় যে, বাংলা ভাষার উন্নতিসাধন হচ্ছে? বাংলা সাহিত্যের মান বাড়ছে? সম্পাদকের হাত দিয়ে পেরিয়ে আসা লেখা কি অনেক বেশি সার্থক নয়? কালজয়ী কবিতা কি লেখা হচ্ছে এইভাবে? মানুষ কি বাংলা সংস্কৃতির প্রতি সবিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠছে নতুন করে? হয়তো না। কিন্তু সেটাই শেষ কথা নয়। এখানে মূল কথাটা হল: চর্চা, অভ্যাস। দিনরাতে বেশ কিছুক্ষণ সময় একটা ভাষার সঙ্গে ভালবাসার বসবাস। সে ভাষায় কথোপকথন চালানো। আর এর মধ্যে দিয়েই বেড়েছে ব্যাপ্তি, বাড়ছে উৎসাহ। এই ইচ্ছা থেকেই অনেক মানুষ অনুপ্রাণিত হচ্ছে, নতুন করে বাংলা শিখছে, ভাবছে। বাংলায় কাজ করার স্বপ্ন রাখছে, পরের প্রজন্মকে উৎসাহ দিচ্ছে। এইগুলোও কি ফেলে দেওয়ার বিষয়?

কোণঠাসা হয়ে যাওয়া একটা ভাষার পালে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য এইরকম একটা হাওয়াই হয়তো দরকার ছিল যা এনে দিয়েছে বাংলা লেখার সফ্‌টওয়্যার ব্যবহারের অবাধ সুযোগ। বাকিটা আমাদের হাতে। আবর্জনা না বাড়িয়ে, অপচয় না করে, চলুন না গড়ার চেষ্টা করি শীলিত, আন্তরিক ভাষাসভ্যতা! বাংলাকে ফিরিয়ে দিই তার রাজমুকুট।

[শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগ ও শুদ্ধতার দৃষ্টান্তে প্রভাবিত নেতাজির যৌনচেতনা]

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement