১১ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২৭  সোমবার ২৫ মে ২০২০ 

Advertisement

শ্রীরামকৃষ্ণের ত্যাগ ও শুদ্ধতার দৃষ্টান্তে প্রভাবিত নেতাজির যৌনচেতনা

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: January 23, 2019 9:29 am|    Updated: January 23, 2019 12:03 pm

An Images

রাহুল দাশগুপ্ত: ‘যৌনতা’ নিয়ে বিশ্বের তাবড় তাবড় ভাবুক, চিন্তাবিদ, মনীষী, লেখক, শিল্পী চিন্তা করেছেন। সুভাষচন্দ্র বসুও এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম নন। মনোবিশ্লেষণের যুগান্তকারী দার্শনিক সিগমুন্ড ফ্রয়েড প্রথম জানান, শৈশবেই একজন মানুষের মধ্যে যৌনচেতনার উন্মেষ ঘটে। সুভাষচন্দ্রর ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছিল। নিজের আত্মজীবনীতে সেসব কথাই অকপটে তিনি লিখেছেন। কিন্তু তার পাশাপাশি লিখেছেন সংযম ও নৈতিকতার প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথাও। মহাত্মা গান্ধী থেকে চে গেভারা, রবীন্দ্রনাথ থেকে রোমা রোঁলা যে পথের পথিক, তাকেই অনুসরণ করেছেন সুভাষচন্দ্র বসু।

শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অন্তর্মুখী স্বভাবের। লাজুক ও মুখচোরা। স্পর্শকাতর, অনুভূতিপ্রবণ ও আবেগপূর্ণ। নিজের সম্পর্কে এসব বিশেষণ তিনি নিজেই দিয়েছেন। নীতিশাস্ত্র সম্বন্ধীয় সংস্কৃত শ্লোকগুলি আগ্রহের সঙ্গে পড়তে তিনি ভালবাসতেন। তাই তিনি লেখেন, ‘মনুষ্যজীবনে অন্য যে কোনও জিনিসের চাইতে নৈতিক মূল্যকেই অধিক গণ্য করা উচিত।’ এই সময়ই, তখন তিনি সেকেন্ড ক্লাসে উঠেছেন, ‘বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় যাকে যথার্থভাবে যৌনচেতনা বলে, তা আমার মধে্য দেখা দিতে শুরু করেছিল।’ তখন সুভাষচন্দ্রর বয়স ১৪। সুভাষচন্দ্র সেই সময় উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ পড়ছেন। কালিদাসের কাব্য ও ‘মহাভারত’-এ নৈসর্গিক দৃশে্যর বর্ণনা পরমানন্দে উপভোগ করছেন। পাশাপাশি তিনি এটাও অনুভব করছেন, ‘আমার মানসিক গঠনে কোনও কোনও দিক থেকে অস্বাভাবিকতার স্পর্শ ছিল।’ যদিও, যৌনচেতনাকে তিনি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই মনে করেছেন এবং লিখেছেন, ‘এই বয়সে যা খুবই স্বাভাবিক, সেই যৌনচেতনা আমার মধ্যে দেখা দিয়েছিল।’

কিন্তু ওই বয়সে তিনি তা বুঝতে পারেননি।

তাই লিখেছেন, ‘যাকে আমি অস্বাভাবিক ও চারিত্রিক দুর্বলতা বলে মনে করতাম, আর যাকে দমন অথবা অতিক্রম করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলাম।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমার যা প্রয়োজন ছিল– আর যা আমি নিজের অজ্ঞাতেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম– তা ছিল একটি মূল নীতি যা অবলম্বন করে আমার সমগ্র জীবন গড়ে উঠতে পারবে। আর সেই সঙ্গে জীবনে আর কোনও কিছুর প্রতি আকৃষ্ট না হওয়ার এক দৃঢ় সংকল্প।… যেহেতু আমি দুর্বল ছিলাম, সে কারণে এ লড়াই ছিল তীব্র। জীবনের লক্ষ্য স্থির করা আমার কাছে ততটা কষ্টকর ছিল না, যতটা ছিল, সেই একমাত্র লক্ষ্যে সমগ্রভাবে মনোনিবেশ করা,’ কারণ, তা করতে হত ‘অন্য সব প্রলোভনকে সাহসের সঙ্গে পাশ কাটিয়ে’।

স্বামী বিবেকানন্দর রচনা পাঠ করতে গিয়ে সুভাষচন্দ্র রামকৃষ্ণ পরমহংসর প্রতি আকৃষ্ট হন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘রামকৃষ্ণের উপদেশগুলির মূলকথা ছিল– কাম ও কাঞ্চন ত্যাগ। তিনি মনে করতেন, আধ্যাত্মিক জীবনে কোনও মানুষের যোগ্যতা বিচার করতে হলে, এই দ্বিবিধ ত্যাগের মাপকাঠিতেই তা বিচার্য। কামকে একেবারে জয় করার অর্থ যৌন প্রবৃত্তিকে মহৎ প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করা, যার দ্বারা যে কোনও পুরুষ প্রত্যেক নারীকেই মাতৃবৎ দেখতে পারে।… রামকৃষ্ণের ত্যাগ ও শুদ্ধতার দৃষ্টান্তের ফল হয়েছিল এই যে, আমার সমস্ত কুপ্রবৃত্তির সঙ্গে প্রচণ্ড লড়াই হয়ে উঠেছিল অনিবার্য।’ এছাড়াও ছিলেন বিবেকানন্দ।

সুভাষচন্দ্র লিখেছেন, ‘আমার সামনে এখন নতুন একটা আদর্শ ছিল, যা আমার হৃদয়ে আগুন জ্বালিয়েছিল– নিজের মুক্তিসাধন এবং পার্থিব আকাঙ্ক্ষাসমূহ বিসর্জন দিয়ে ও সব অন্যায়ের বিধিনিষেধ থেকে বের হয়ে এসে মানবসেবাকে সফল করে তোলাই ছিল আমার লক্ষ্য। যে সমস্ত শ্লোকে বিদ্রোহের কথা ছিল সেগুলির প্রতিই আকৃষ্ট হতে লাগলাম।… বিবেকানন্দের আদর্শ প্রচলিত পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে আমার সংঘর্ষ ডেকে এনেছিল। মনকে সংস্কারমুক্ত করার কাজে বিবেকানন্দ আমার অনেকখানি সহায় হয়েছিলেন। বিবেকানন্দের প্রেরণায় আমার বিশ্বাস জন্মেছিল যে, আত্ম-বিকাশের জন্য বিদ্রোহ প্রয়োজন– শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন কেঁদে ওঠে, তখন চতুষ্পার্শ্বের বন্ধনের বিরুদ্ধেই সে প্রতিবাদ জানায়।… আমি দুর্বল ছিলাম, আর এই লড়াই যত দীর্ঘদিনব্যাপী স্থায়ী হয়েছিল, তাতে জয়লাভ করা সহজ ছিল না। মানসিক উত্তেজনা ও অশান্তি তাই প্রতিনিয়ত লেগেই ছিল, মাঝে মাঝে তার সঙ্গে যুক্ত হত নৈরাশ্যবোধ। আমার চাইতে বেশি বা কম অনুভূতিপ্রবণ মনের অধিকারী হলে অনেক সহজেই তা কাটিয়ে ওঠা যেত, কিংবা যন্ত্রণার তীব্রতা হত অনেক কম। আমার জন্য যা জমা ছিল তা আমাকে ভোগ করতেই হয়েছে।’

এই লড়াই যখন চলছিল, তখন কী অবস্থায় তাঁর কেটেছে, তারও বর্ণনা দিয়েছেন সুভাষচন্দ্র। তিনি লিখেছেন, ‘ব্রহ্মচর্য অথবা যৌন সংযম সম্বন্ধে যে সমস্ত পুস্তক ছিল, সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি পড়ে ফেলেছিলাম। তারপর সাগ্রহে শেষ করেছিলাম ধ্যান সম্বন্ধীয় পুস্তকগুলি। অনেক চেষ্টার পর, যোগ, বিশেষত হঠযোগ সংক্রান্ত পুস্তকগুলি খুঁজে বের করে কাজে লাগিয়েছিলাম।… যা যা আমাকে করতে হয়েছে তার যথাযথ বিবরণ দিতে গেলে তা একটি পরম উপভোগ্য কাহিনি হবে। মোটেই আশ্চর্য নয় যে কেউ কেউ মনে করেছিলেন, উন্মাদ হতে আমার আর বেশি দেরি নেই।’

প্রসঙ্গত, হঠযোগের উদ্দেশ্য দৈহিক সংযম। এ প্রসঙ্গে সুভাষচন্দ্র একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তাঁর নিজের ভাষায় ঘটনাটি এরকম, ‘যোগাভ্যাসের সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হল সূর্যাস্তের পর অন্ধকারে অনুশীলন এবং আমি তাই করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একদিন ধরা পড়ে গেলাম এবং তা নিয়ে হাসাহাসি হল। একদিন রাত্রে যখন লুকিয়ে ধ্যান করছিলাম, দাসী বিছানা করতে এলে অন্ধকারে আমার সঙ্গে তার ধাক্কা লেগে গেল। যখন সে বুঝতে পারল, এক তাল মাংসের সঙ্গে তার ধাক্কা লেগেছে, তখন তার বিস্ময়টা একবার কল্পনা করুন।’

কিশোর বয়সে প্রায়ই নানারকম স্বপ্ন দেখতেন সুভাষচন্দ্র। যেসব স্বপ্ন মাঝে মাঝেই তাঁকে পীড়া দিত, তার মধে্য অন্যতম ছিল, যৌন-সম্বন্ধীয়। ‘মানুষের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী প্রবৃত্তিগুলির একটি হচ্ছে যৌন প্রবৃত্তি এবং যেহেতু যৌন তাড়নার একটি কাল আছে, সেই কারণে মাঝে মাঝে এইরকম স্বপ্ন সৃষ্টি হয়ে থাকে। তথাপি, অন্তত কিছুটা প্রতিকার লাভ করা সম্ভব। যা হোক, আমার ওই অভিজ্ঞতাই হয়েছে। পদ্ধতিটি হবে, যে বিশেষ রূপটি কাউকে তার স্বপ্নের মধে্য উত্তেজিত করে, তা মনে মনে কল্পনা করা এবং নিজেকে বারবার বলা যে এর দ্বারা আর সে উত্তেজিত হয় না– কামকে সে জয় করেছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি এমন হয় যে-স্ত্রীলোকের দ্বারা কোনও লোকের কামোত্তেজনা জন্মে, তাহলে তার পক্ষে সর্বোৎকৃষ্ট উপায় হবে, সেই রূপটিকে মাতা বা বোন হিসাবে মনে মনে কল্পনা করা।’

তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমার নিজের সঙ্গে বোধহয় সবচেয়ে তীব্র যে সংগ্রাম চালাতে হয়েছিল তা হল যৌন প্রবৃত্তির ক্ষেত্রে। যৌন প্রবৃত্তিকে দমন কিংবা মহত্তর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজন ছিল অবিরাম চেষ্টার। অদ্যাবধি তা চলছে। আমার বিশ্বাস, যৌন প্রবৃত্তিকে পরিহার করে চলা, এমনকী সক্রিয় কাম প্রবৃত্তিকে দমন করাও অপেক্ষাকৃত সহজসাধ্য। কিন্তু ভারতীয় যোগী ও ঋষিগণ উপলব্ধি করেছিলেন যে, কারও আধ্যাত্মিক উন্নতির পক্ষে তাই যথেষ্ট নয়। যে মানসিকতা প্রবৃত্তি ও আবেগের ক্রীড়াভূমি এবং যা থেকে কাম প্রবৃত্তির উদ্ভব তাকে রূপান্তরিত করা দরকার।’

তিনি লিখেছেন, ‘যখন এই অভীষ্ট সিদ্ধ হয় তখন পুরুষ অথবা নারীর মধে্য কোনও প্রকারের যৌন আবেদন থাকে না এবং অপর সকলের যৌন আবেদনে অবিচল থাকাও তার পক্ষে সম্ভব হয়। কামকে সে তখন সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করতে সমর্থ হয়। কিন্তু এটা সম্ভব, না অলীক কল্পনা মাত্র? রামকৃষ্ণের মতে, এটা সম্ভব। এবং যতক্ষণ না কেউ সংযমের এই স্তরে উন্নীত হয় ততক্ষণ আধ্যাত্মিক চেতনার সর্বোচ্চ স্তরে পেঁৗছনো তার পক্ষে অসম্ভব।’ কিন্তু সংযমের সেই স্তরে পেঁৗছনো কি অতই সহজ? সুভাষচন্দ্র বসু লিখেছেন, ‘বাস্তবক্ষেত্রে অসুবিধা ছিল যে, যতই আমি যৌন প্রবৃত্তিকে দমন কিংবা মহত্তর প্রেরণায় রূপান্তরিত করার জন্য গভীরভাবে মনোনিবেশ করেছিলাম ততই তা অধিকতর শক্তিশালী হয়ে উঠছে বলে বোধ হয়েছিল– অন্তত প্রাথমিক অবস্থায় তো বটেই। যৌন সংযম আয়ত্ত করবার ব্যাপারে দৈহিক ও মানসিক কয়েকটি অভ্যাস ও সেই সঙ্গে কয়েক প্রকারের ধ্যান সহায়ক হয়েছিল।’

কিন্তু এই অভ্যাস কতটা জরুরি ছিল, এই প্রশ্নও অনিবার্যভাবে উঠে এসেছে তাঁর কলমে।

তাই লিখেছেন, ‘মানব মনে এই যৌন প্রবৃত্তি যে কিরূপ স্বাভাবিক সে সময়ে তা জানতাম না। তাই মাঝে মাঝে অবসাদ ও মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করলেও চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলাম।… প্রাণীজীবনে যেমন, মানবপ্রকৃতিতেও তেমনি যা জন্মগত প্রবৃত্তি তাকে সমূলে বিনষ্ট কিংবা মহত্তর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করতে গিয়ে আমাদের এত বেশি সময় ও শক্তি ব্যয় করা উচিত কি না, এটা একটা সঙ্গত প্রশ্ন।… আমাদের দৈহিক ও মানসিক শক্তির সঞ্চয় সীমিত। কামজয়ের চেষ্টায় তাকে এত বেশি পরিমাণে ব্যয় করার সার্থকতা কী? আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য পুরোপুরি কামজয় অর্থাৎ যৌন-প্রবৃত্তিকে সম্পূর্ণরূপে অতিক্রম করা বা মহত্তর লক্ষে্য তাকে চালিত করা কী অপরিহার্য? যদি তা না হয়, যে জীবন আধ্যাত্মিক সাধনা অপেক্ষা সমাজসেবায়, অর্থাৎ অধিকাংশ জনগণের সর্বোত্তম কল্যাণ প্রচেষ্টায় নিয়োজিত, সে জীবনে যৌন-সংযমের আপেক্ষিক গুরুত্ব কতটা? যেহেতু আমি পরিপূর্ণভাবে আধ্যাত্মিকতার আদর্শ থেকে ক্রমে সমাজসেবার জীবনে সরে এসেছি, সে কারণে যৌন বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতাগুলির পরিবর্তন হয়েছে।’ কিন্তু এই স্পষ্ট মতামত অনেক পরের ঘটনা।

ঋণ :সমগ্র রচনাবলী শ্রীসুভাষচন্দ্র বসু

প্রথম খণ্ড (আনন্দ পাবলিশার্স)

প্রতিবেদক বাংলার শিক্ষক
(মতামত নিজস্ব)
[email protected]

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement