২ ভাদ্র  ১৪২৬  মঙ্গলবার ২০ আগস্ট ২০১৯ 

BREAKING NEWS

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

২ ভাদ্র  ১৪২৬  মঙ্গলবার ২০ আগস্ট ২০১৯ 

BREAKING NEWS

কবীর সুমন: ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসের শোভাযাত্রায় চলেছে একবগ্‌গা মানুষের মূঢ়তার মতো উদ্ধত ও নিরেট সাঁজোয়া গাড়ি, মূর্খের ঔদ্ধত্যের মতো ঊর্ধমুখী কামান, বুভুক্ষুদের খেতে না দিয়ে কল্পিত শত্রুনিধনের জন্য টাকা, শুধু টাকা শুধু টাকা শুধু টাকা খরচ করে বানানো ক্ষেপণাস্ত্র! এই টাকা দিয়ে স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী ভারত তার ক্ষুধার্ত প্রজাদের খেতে দিত যদি।

[রাজপথে প্রথমবার ‘বজ্র’, বৃহত্তম গণতন্ত্রের শক্তি দেখল দুনিয়া]

নিন্দুকে বলে ভারতের শতকরা অন্তত ৭০ জন দু’বেলা খেতে পায় না। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক বছর তিনেক আগে আমাকে জানিয়েছিলেন– একদিন ভোরবেলা তাঁর শহরের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখেন ছোট্ট একটি মেয়ে, গায়ে ময়লা ফ্রক, তার বাঁহাতের তালু থেকে ডানহাত দিয়ে কিছু একটা তোলার ভান করে মুখে পুরে দিয়ে চিবচ্ছে। ভদ্রলোক দেখতে পান বাঁহাতের তালুতে কিছুই নেই। তিনি জানতে চান– ‘কী খাচ্ছ গো?’ রাস্তার একপাশে বসে ওই কাজটি করে যাওয়া মেয়েটি বলল– ‘খিদে খাচ্ছি।’

ভদ্রলোকটি আমাকে বলেছিলেন, ‘আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম ঈশ্বর কোথাও আছেন কি না। দেখতে পেলাম না তেমন কাউকে।’

আজ থেকে বছর পঁয়তাল্লিশ আগে গঙ্গার ধারে দাঁড়িয়ে একা একা ভেলপুরি খাচ্ছিলাম এক বিকেলে। হে সাধারণতন্ত্র, বিকেলটি ছিল বেশ। আসন্ন সন্ধের পথ চেয়ে ছোট্ট চামচ দিয়ে খবর কাগজের ঠোঙা থেকে ভেলপুরি খাচ্ছি, হঠাৎ অনেকটা তলা থেকে একটা কচি গলা বলে উঠল, ‘কাগজটা ফেলো না, ওটা আমি চাটব।’ মাথা নিচু করে দেখতে পেলাম ময়লা প্যান্ট পরা খালি গা একটি ছেলে। বেশ ছোট। এতটাই, যে, মাথাটা অনেকটা উঁচু করে সে আমার খাওয়া দেখছে– সাধারণতন্ত্র দিবসে রাজধানীর নির্দিষ্ট পথে গড়গড় করে যাওয়া কামানগুলো যেভাবে কাকে যেন দেখে। কাকে দেখো তোমরা, কামানের দল? মুখ উঁচু করে কাকে দেখো? আকাশটাকে? না কি এই সাধারণতন্ত্রের শত্রুদের? কোথায় থাকে তারা? কতটা উঁচুতে? ওই যে ছেলেটা আমাকে বলল, ‘কাগজটা ফেলো না, ওটা আমি চাটব’– ওর খিদে পেয়েছে। ও কি আর সাধারণতন্ত্র দিবসের শোভাযাত্রা দেখতে রাজধানীতে যাবে? সেখানেও তো অমন ছেলেমেয়ে আছে, যাদের সারাক্ষণ খিদে পায়! কী অন্যায় কথা ভাবো, সাধারণতন্ত্র!
১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি এই দেশের সংবিধান কার্যকর হয়েছিল। ওইদিন সাধারণতন্ত্র হয়ে উঠেছিল এই দেশ। ওইদিন থেকে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ হয়েছিলেন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি। স্বাধীনতা যোদ্ধারা লড়াই করেছিলেন ভারতের জন্য। জন্ম নিল ভারত আর পাকিস্তান– দু’টি দেশ।

আমি অবিভক্ত ভারতে জন্মাইনি, জন্মেছি ভাগ-হওয়া ভারতে। স্কুলে পড়ার সময়ে সাধারণতন্ত্র দিবসে স্কুলের বন্ধুদের সঙ্গে মিছিলে গিয়েছি। স্কাউটিং করার সময়ে এই দিবসের শোভাযাত্রার পথে ভিড় সামলেছি। প্রজাদের ভিড়। সামলাচ্ছে স্কুলের প্রজাছাত্রছাত্রীরা স্কাউট আর গাইডের পোশাক পরে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাটা যাঁরা সামলেছেন, তাঁরা কখনও বলেননি আমাদের ‘সাধারণতন্ত্র দিবস’ বস্তুটি কী! মনে পড়ে না স্কুলে কখনও সাধারণতন্ত্র দিবস নিয়ে রচনা লিখতে হয়েছিল কি না। স্বাধীনতা দিবসের উপর লিখতে হয়েছিল।

কিন্তু সাধারণতন্ত্র দিবস?

কে যেন আমাদের একবার বলেছিলেন– দেশের সংবিধানে সব বলা আছে– কীভাবে, কোন নীতিতে চলবে দেশটা, কেমন হবে তার আইন, কোন জিনিসগুলো চলবে, কোনগুলো চলবে না, কার কোন অধিকার আছে, কার কোন অধিকার নেই, ইত্যাদি। আর, সেই সংবিধান যেদিন কার্যকর হয়েছিল সেই দিনটাই ‘সাধারণতন্ত্র দিবস’।
সাধারণতন্ত্রে জনগণ ভোট দিয়ে সরকার গড়েন। কিছু বছর হল ভোট দিচ্ছেন জনগণ ইভিএম যন্ত্রের সাহায্যে। এদিকে শোনা যাচ্ছে এর আগের সাংসদ নির্বাচনের ভোটে ইভিএম যন্ত্রে নাকি কারচুপি হয়েছিল! লন্ডনে একটা সাংবাদিক বৈঠকও হয়ে গেল এইরকম কথা বলে। কারচুপি যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তো সেটা হয়েছে টাকার জোরে। খবরটা এতদিন টাকার জোরে চেপেও রাখা হয়েছে। তাই যদি হয়, তো তন্ত্রটা তো অর্থের বলতে হয়। অর্থতন্ত্র, ক্ষমতাতন্ত্র। সাধারণতন্ত্র আর কোথায়!

[সাধারণতন্ত্র দিবসে বড়সড় সাফল্য সেনার, উপত্যকায় নিকেশ ২ জঙ্গি]

দেশের একাধিক সংকট যার মীমাংসা কিছুতেই হচ্ছে না, সরকার মীমাংসা চায় বলেও মনে হচ্ছে না, সেগুলোর কারণ যে কী– তারও কোনও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষ দিতে পারছে না অনেক কাল। তার একটা হল ‘কাশ্মীর সমস্যা’। কাশ্মীরের রাজা চলে এসে ভারতে যোগ দিলেন মানে কি রাজ্যের প্রজারাও সবাই ‘ভারতীয়’ হয়ে গেলেন? প্রজারা কী বলেন, তা জানার একটা মোটামুটি সহজ উপায়: ‘গণভোট’। এই সাধারণতন্ত্রের কাশ্মীরি প্রজাদের অনেকে তা চেয়েছেন, কিন্তু ভারত, যা দেখা যাচ্ছে, সেই আত্মনির্ধারণাধিকারে সম্মত নয়। অর্থাৎ, নামে সাধারণতন্ত্র, আসলে রাজতন্ত্র গোছের। রাজা এলেন চলে। প্রজারাও কি কাতারে কাতারে তাঁর সঙ্গে চলে এসেছিলেন? তা তো না। কাশ্মীরের রাজার অত্যাচার, একদেশদর্শিতা ও অবিচারের বিরুদ্ধে প্রজারা একসময়ে বিদ্রোহ করেছিলেন, রাজা তা দমন করেছিলেন নিষ্ঠুরভাবে। এ নিয়ে অনেক বই লেখা হয়েছে।

কাশ্মীরি প্রজাদের কপালে জুটল একদিকে ভারতের আর অন্যদিকে পাকিস্তানের ধাক্কা। ভারত কি সত্যিই জানতে চেয়েছে কাশ্মীরের প্রজারা কী চান? ভারত কর্তৃপক্ষ কি সত্যিই জানতে চেয়েছেন ভারতে হাজার হাজার বছর ধরে যে জনজাতিগুলির বাস, দেশের জঙ্গল-পাহাড়-নদীর অনেকটাই যাঁদের এক্তিয়ারে পড়ার কথা, তাঁরা কী চান? স্বাধীন ভারতে তাঁদের স্থান কোথায়? ‘অসুর’ নাম নিয়ে যেখানে জনজাতি আছে, সেখানে অসুর-বধের উৎসব চলে। সর্বঘোষিত সর্বজনীন উৎসব। সুযোগ পেলেই এ দেশের সুবিধাভোগী শ্রেণির কোনও না কোনও নেতা বলে বসেন– অসুর হল দেশের অশুভ শক্তি। তাদের বধ করা হবে বা হটিয়ে দেওয়া হবে। আমাদের রাজ্যেই একাধিক জনজাতি সম্প্রদায় অসুরকে স্মরণ করে দুর্গোৎসবের দিনগুলোয়, তাঁর মূর্তি গড়া হয়, গান-বাজনা হয় তাঁর সম্মানে। একই সাধারণতন্ত্রে প্রজাদের মধ্যে নানা মৌলিক অমিল, যেগুলি এমনকী ধর্মাচার ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। এসব মৌলিক বিভেদ ও প্রশ্ন চেপে রেখে শুধুই যদি সামরিক কুচকাওয়াজ, মারণাস্ত্র প্রদর্শন আর নানা রাজ্যের নাচগান ও রকমারি বেশভূষার ওপর জোর দেওয়া হয়, তাহলে এমনিতেই ব্যাপক জনস্বার্থের জায়গায় বৃহৎ শ্রেষ্ঠীস্বার্থ ও দলস্বার্থ প্রধান হয়ে ওঠার এই বেসামাল যুগ আরও বেসামাল অবস্থা ডেকে আনতে পারে।

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং