Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৮ জুন ২০২৬
Kolkata Book Fair

বইমেলা ওপারে, এপারে

এদিকে বৈষম্যের নিকৃষ্ট ছবি দেখাচ্ছে একুশের বইমেলা।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৫, ১৬:৩১

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৫, ১৬:৩১

options
link
বইমেলা ওপারে, এপারে zoom

বাংলাদেশ জন্মের পঞ্চাশ বছর পরও তীব্র উৎসাহে বিক্রি হত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাদেশি কবি-সাহিতি্যকের লেখার চাহিদা ছিল তুঙ্গে। কম-বেশি চার কোটি টাকার বই বিক্রি হত প্রতি বছর। এপার সাগ্রহে কিনত ওপারের বই। সেই প্যাভিলিয়ন এবার নেই বইমেলায়! লিখছেন কিংশুক প্রামাণিক

শীত চলে গিয়েছে প্রায়। পলাশে প্রকৃতি রাঙা হয়ে ওঠার অাগে সরস্বতীর মন্ত্রপাঠের সঙ্গে-সঙ্গে বসন্তের অাগমনী বাতাস। প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনায় মন মানিয়ে উঠুক, না-উঠুক গঙ্গা ও পদ্মাপাড়ে দুই বইমেলা ঘিরে দু’টি চিত্র হয়তো সবার নজর এড়িয়ে যায়নি। সল্টলেকে ‘আন্তর্জাতিক কলকাতা পুস্তকমেলা’ নতুন বইয়ের ম-ম গন্ধে মাতোয়ারা। স্থায়ী প্রাঙ্গণ পেয়ে দিনে-দিনে এই মেলার গ্ল্যামার উদ্ভাসিত। হয়তো ময়দানের ধুলো হারিয়েছে, কিন্তু অাধুনিকতার ছেঁায়ায় নতুন স্থানের ধ্বনি সুমধুর। অামাদের মেলায় কোনও দল-মত নেই, কোনও বৈষম্য নেই। নেই ছুৎমার্গ। সারা বিশ্বের মানুষের উপস্থিতিতে কলকাতার মেলা ‘অান্তর্জাতিক’, ছিল, এখনও অাছে। উদ্বেল সেই বইবাজারে এবার খানিক ছন্দপতন। সব অাছে। কিন্তু নেই বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন। দেখা মিলছে না তাদের প্রকাশকদেরও। এই প্রথম মাঘের বিকেলে বাংলাদেশের বইপ্রেমীদেরও ভিড় নেই কলকাতায়।

Advertisement

ওপারের দৃশ্যটি খুবই কদর্য। ঢাকার একুশের বইমেলায় বৈষম্যের নিকৃষ্ট ছবি প্রদর্শিত হল তথাকথিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের সৌজনে্য। অসহিষ্ণুতার চেনা পথ ধরে ডাস্টবিনের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে পলাতক পদত্যাগী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রক্তমাখা মুখ। এক ছাত্রনেতা তথা মনোনীত উপদেষ্টা হাসতে হাসতে সেই ডাস্টবিনে ময়লা ফেলছেন। সময় বদলে যায়, রাজা হয় ফকির। এই অহংকারীদের দশা হাসিনার মতো হবে, তা-ও একদিন দেখাবে সময়। কার্যকারণে কোনও মিল না-থাকলেও দু’টি ঘটনাকে উপেক্ষা করার উপায় নেই। কারণ, দু’টির অকুস্থল বইমেলা।

কলকাতা বইমেলার ৪৮ বছর বয়স হল। বহু দিন ধরে সেখানে বাংলাদেশের উজ্জ্বল উপস্থিতি। অামরা ওদের ‘ভাই’ বলে ভালবেসেছি। বুকে নিয়েছি। ক্রমে-ক্রমে পরিসর বেড়েছে। মেলার প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার স্কোয়ার ফিট জুড়ে থাকত বাংলাদেশের প্যাভিলিয়ন। সুদশ্য তার রূপ। বঙ্গ সংস্কৃতিকে পাথেয় করে সাজানো হত প্রতিটি দেওয়াল। একাকার হয়ে যেত বাংলার গান কবিতা, নাটক, রং-তুলি। ভিড়ে গিজগিজ করত প্যাভিলিয়ন।
ওপার থেকে মেলা দেখতে অাসতেন সরকারি প্রতিনিধি, কবি-সাহিত্যিক, সংস্কৃতিপ্রেমীরা। বাংলাদেশ জন্মের ৫০ বছর পরেও তীব্র উৎসাহে বিক্রি হত ‘বঙ্গবন্ধু’-কে নিয়ে লেখা বই। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাদেশি কবি-সাহিতি্যকের লেখার চাহিদা ছিল তুঙ্গে। কম-বেশি ৪ কোটি টাকার বই বিক্রি হত প্রতি বছর। এপার সাগ্রহে কিনত ওপারের বই। সেই প্যাভিলিয়ন এবার নেই বইমেলায়! তাদের কোনও বইও সেভাবে খুঁুজে পাওয়া যাচ্ছে না। বড় পাবলিশার্সের নিজস্ব পাবলিকেশনে বাংলাদেশি লেখকদের বইগুলি অবশ্য অাছে। ওপার নিয়ে কারও কোনও অাগ্রহ অাছে বলে মনে হচ্ছে না। মেলা মেলার মতো হইহই করে চলছে। বাংলাদেশ অাছে কী নেই, তাতে কারও মাথাব্যথা নেই। কেন?

নিকট বন্ধু বেইমান হয়ে গেলে যেমন মন ভেঙে যায়, উপেক্ষা গুরুত্ব পায়, বিষয়টা খানিকটা তেমনই। গত কয়েক মাসে বাংলাদেশের অাচরণ এপারের সংবেদনশীল বাঙালি মনকে যতটা কষ্ট দিয়েছে, তা ছিল ভাবনার অতীত। কখনও অামরা ভাবিনি, রবীন্দ্র-নজরুলের গানে দুই ভাগ হতে পারে। কখনও ভাবিনি ‘মুক্তিযুদ্ধ’ অামাদের নয়।

মেলায় এবার অামেরিকা অাছে, জার্মানি অাছে, স্পেন অাছে, অাছে মেসির দেশ অার্জেন্টিনা, তবু পড়শি বাংলাদেশ নেই। তাদের কি ডাকা হয়নি? না কি তারা অাসেনি? প্রশ্নটা করলাম বইমেলা কমিটির মুখ্য কর্মকর্তা গিল্ডের সভাপতি ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়কে। ত্রিদিববাবু ও গিল্ড সম্পাদক সুধাংশুশেখর দে মেলার মূ্‌ল অায়োজক। দু’জন দু’টি বিখ্যাত পাবলিকেশনের কর্তা। মেলা সফল করতে তঁাদের অনেক স্বপ্ন। কেন বাংলাদেশ অনুপস্থিত? ত্রিদিববাবু বললেন, ‘বইমেলায় সবচেয়ে বড় প্যাভিলিয়ন পায় বাংলাদেশ। এবার তাদের দিক থেকে কোনও অাবেদন অাসেনি। যার ফলে অামরাও অগ্রসর হইনি।’

বুঝলাম। কিন্তু ত্রিদিববাবু যেটা বলতে পারলেন না তা হল, গত জুলাই-অাগস্টের পর বাংলাদেশে যে ভারতবিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়েছে, সীমান্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের উপর অাক্রমণের ঘটনা ঘটেছে তার প্রভাব শুধু সমাজজীবন নয়, পড়েছে সংস্কৃতিতেও। দুই বাংলার অাদানপ্রদান স্তব্ধ কূটনৈতিক অশান্তিতে।

বাংলাদেশে সুনীল, সমরেশ, শংকর, শীর্ষেন্দু, সঞ্জীববাবুদের বইয়ের বরাবর দারুণ বাজার। প্রতিদিন বই রপ্তানি হত। সব বন্ধ হয়েছিল ঝামেলার শুরু থেকে। এবার বাংলাদেশের বর্তমান শাসকরা কলকাতা বইমেলা থেকে নিজেদের সরিয়ে নিলেন। এতে হয়তো তাদের দেশের মৌলবাদীদের খুশি করা যাবে, কিন্তু দুই বাংলার বইপ্রেমীদের হৃদয় ভেঙে দিলেন তঁারা। এই সিদ্ধান্তে অারও বোঝা গেল, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবস্থা এখন যে-স্তরে দঁাড়িয়েছে তাতে অাগামী দিনে দুই বাংলায় বন্ধুত্ব অারও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

অাসলে, বাংলাদেশ অার সহজ-সরল দেশ নেই। তাই বইমেলার ডাস্টবিনে হাসিনার মুখ দেখে অবাক হইনি। এই ছাত্ররাই বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের নায়ক ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমানের মূর্তির মাথায় প্রস্রাব করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করে সব স্মারক ধ্বংস করেছিল। এরা জানেই না বাংলা ভাষা অান্দোলনের অাবেগ! এদের থেকে অার কী অাশা করা যায়। ‘স্বাধীনতা’ ফেরানোর কথা বলে প্রতিহিংসার রাজনীতি মাথাচাড়া দিয়েছে। হাসিনা পালিয়ে গিয়েছেন। এখন তঁার দল অাওয়ামী লিগ যাতে অার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না-পারে তার জন্য রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানো হচ্ছে। মানুষ হাসিনার স্বৈরাচারের অবসান চেয়েছিল। ভেবেছিল ছাত্ররা দায়িত্ব নেবে। কিন্তু ক্ষমতা চলে গিয়েছে মৌলবাদীদের হাতে। পাকিস্তান সেনাদের বুটের নিচে ক্ষতবিক্ষত হয়ে থাকা জাতিকে স্বাধীন দেশ গড়ে দিয়েছিল ভারত, এখন বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করে থাকা শক্তি সেই পাকিস্তানের গলা জড়িয়ে ধরছে। দুই দেশের মধে্য সরাসরি বিমান, জাহাজ চলাচল শুরু করছে। শুরু করেছে প‌ণ‌্য পরিবহণ।

এই পরিস্থিতিতে কী করে অাশা করা যায় কলকাতা বইমেলায় প্যাভিলিয়ন দেবে বাংলাদেশ?
৩৪ বছর পর পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন হয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে মরিচঝঁাপি, বিজনসেতু, সঁাইবাড়ি, ধানতলা বানতলা থেকে কেশপুর, ছোট অাঙারিয়া, সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাইয়ের মতো সাংঘাতিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ ছিল। তবু ২০১১ সালে পরিবর্তনের পর বইমেলায় কোনও ডাস্টবিনে জে্যাতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যদের রক্তমাখা মুখ লাগিয়ে অসম্মান করেনি মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়ের সরকার। বরং জে্যাতিবাবুর জন্মদিনে ফুল-মিষ্টি নিয়ে ইন্দিরা ভবনে যেতেন মমতা। বুদ্ধবাবুর পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতেও যেতেন অসুস্থতার খবর পেলেই। দিল্লিতে ৩০০ অাসনের গরিষ্ঠতায় ভর করে সরকার চালালেও কোথাও জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর মূর্তি ভাঙতে যায়নি নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। ভারতে সরকার অাসে-যায়।

নতুন সরকার এসে নতুন কোনও পলিসি হাতে নেয়। কিন্তু সবাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধ। অাইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। ভারতে সংবিধানকে পদদলিত করা হয় না। রাজনৈতিক দলে মতবিরোধ থাকে, সংঘর্ষ বাধে, কিন্তু তা সীমাবদ্ধ রাজনৈতিক পরিসরে। কিন্তু বাংলাদেশে যা চলছে তা গণতন্ত্রের পক্ষে ভয়ংকর। চোর তাড়িয়ে ডাকাত এসেছে। ‘গণতন্ত্র’ কথাটা বইয়ে লেখা থাকলেই হয় না। তা তৃণমূল স্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে শাসক-বিরোধী সবার দায়বদ্ধতা দরকার। যারা বৈষম্য-বিরোধী ছাত্র অান্দোলন করেছিল তাদের কার্যকলাপে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য। তাই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়করা অসম্মানিত। নিজেদের হেরিটেজকে অস্বীকার করা এই বাংলাদেশের ছাত্রদের রুখবে কে? যত দিন না বাংলাদেশে নির্বাচন করে নতুন সরকার অাসবে, তত দিন বইপ্রেমীদের স্বস্তি নেই। ‘অামরা-ওরা’র ফারাক অারও বাড়বে কলকাতা থেকে ঢাকা।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.