ব্রিটিশ চিকিৎসক ‘স্যর’ রোনাল্ড রস-ই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন– ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্সের ভেক্টর হল স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা। শুধু ম্যালেরিয়া নয়, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা, ওয়েস্ট নাইল-সহ অনেক রোগের বাহক এই প্রাণঘাতী খুদে পতঙ্গটি। মশাবাহিত রোগ নির্মূল করাই হোক ‘বিশ্ব মশা দিবস’-এর শপথ। লিখছেন অর্ণবকুমার রায়।
আজ, ‘বিশ্ব মশা দিবস’। ১৮৯৭ সালে আজকের দিনে, ব্রিটিশ চিকিৎসক স্যর রোনাল্ড রস (জন্ম: ১৩ মে, ১৮৫৭ এবং মৃত্যু: ১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২) সেকেন্দ্রাবাদের জেনারেল হাসপাতালে (যা বর্তমানে ভারতের হায়দরাবাদে অবস্থিত) সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেছিলেন যে, ম্যালেরিয়া রোগের জীবাণু প্লাজমোডিয়াম ভাইভ্যাক্সের ভেক্টর হল স্ত্রী অ্যানোফিলিস মশা। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৮৯৮ সালে, কলকাতার ‘প্রেসিডেন্সি জেনারেল হাসপাতাল’-এ (বর্তমান এসএসকেএম হাসপাতাল) গবেষণার সময় তিনি চড়ুইপাখির শরীরে এই ম্যালেরিয়া পরজীবীর জীবনচক্রর সম্পূর্ণ রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেন। এই অসামান্য আবিষ্কার তাঁকে চিকিৎসা শাস্ত্র ও ফিজিওলজিতে ১৯০২ সালে নোবেল এনে দেয়।
রোনাল্ড রসের এই যুগান্তকারী আবিষ্কারকে সম্মান জানাতে এবং মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে যুক্তরাজ্যের ‘লন্ডন স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন’ ১৯৩০ সাল থেকে ২০ আগস্ট দিনটিকে ‘বিশ্ব মশা দিবস’ রূপে প্রথম পালন করা শুরু করে। মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বিশ্বজুড়ে দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দিবসের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে।
আরও পড়ুন:
হাঙর, বাঘ, সিংহ বা সাপের চেয়ে ঢের ক্ষুদ্র এই কীটকে মানুষের জন্য বহুগুণ বেশি প্রাণঘাতী বলা হয় সংগত কারণে।
রোনাল্ড রসের আবিষ্কারের ১২৯ বছর পরেও মশা নামের এই ক্ষুদ্র পতঙ্গটি মানুষের প্রধান শত্রু। শুধু ম্যালেরিয়া নয়, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু, জিকা, ওয়েস্ট নাইল-সহ অনেক রোগের বাহক হল এই প্রাণঘাতী পতঙ্গটি। গবেষকরা বলছেন, মশার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ইতিহাসে যে কোনও যুদ্ধের চেয়ে বেশি। বিখ্যাত ‘নেচার’ জার্নালের গবেষণা বলছে, গত ৫০ হাজার বছরে পৃথিবীতে যত মানুষ বেঁচে ছিল, তাদের প্রায় অর্ধেকই মারা গিয়েছে মশার কামড়ে
হওয়া রোগের কারণে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’-র ২০২৪ সালের রিপোর্ট অনুসারে, প্রতি বছর পৃথিবীতে ২৮ কোটির বেশি মানুষ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয় এবং এর ফলে মৃত্যু হয় প্রায় ৬ লক্ষ ১০ হাজার মানুষের। যার মধ্যে সিংহভাগই আফ্রিকার অনূর্ধ্ব-৫ শিশু। ‘প্রসিডিংস অফ দ্য ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস’ জার্নালে প্রকাশিত ২০২০ সালের গবেষণা অনুযায়ী, আফ্রিকার গ্রামাঞ্চলে দেখতে পাওয়া ‘অ্যানোফিলিস গাম্বিয়া’ মশা পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রাণীর প্রজাতি। ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-ও ‘অ্যানোফিলিস’ মশাকে মানব জাতির জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বিপজ্জনক ও মারাত্মক প্রাণী হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। হাঙর, বাঘ, সিংহ বা সাপের চেয়ে ঢের ক্ষুদ্র এই কীটকে মানুষের জন্য বহুগুণ বেশি প্রাণঘাতী বলা হয় সংগত কারণে।
পৃথিবীতে মশার প্রজাতির সংখ্যা অনেক। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর ভাইরাস রিসার্চ’-এর অধ্যাপক স্টিভেন সিনকিন্স জানান– বিশ্বে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ প্রজাতির মশা রয়েছে। তবে আশার কথা হল, এর মধ্যে মাত্র ১০০টির মতো মশার প্রজাতি মানুষকে কামড়ায় ও রোগ ছড়ায়।
সুতরাং সব মশা খারাপ না, বা সব মশা বিপজ্জনক নয়। কয়েকটি প্রজাতির স্ত্রী মশা ছাড়া অন্য কোনও মশা মানুষকে কামড়ায় না। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ডিম্বাণু পরিস্ফুটনের মাধ্যমে বংশবিস্তারের জন্য স্ত্রী-মশার দেহ উষ্ণ রাখার তাগিদ থাকে।
‘এনটোমলজি টুডে’-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কুলিসেটা’ নামের মশা প্রায়ই মানুষকে কামড়ায়, কিন্তু এদের মাধ্যমে কোনও মারাত্মক রোগ ছড়ানোর রেকর্ড নেই।
এ কারণে তারা খাদ্য হিসাবে উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীদের দংশন করে সেই রক্ত পান করে। প্রাণীজ রক্ত প্রোটিন, আয়রন ও অ্যামিনো অ্যাসিডের চমৎকার উৎস। সুতরাং একসঙ্গে অনেকগুলো হৃষ্টপুষ্ট ডিম পাড়ার জন্য স্ত্রী মশাকে রক্ত পান করতে হয়। পুরুষ মশারা ফুলের মধু ও গাছের মিষ্টি নির্যাস খেয়ে বেঁচে থাকে এবং পরাগায়নেও সাহায্য করে।
‘এনটোমলজি টুডে’-র একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘কুলিসেটা’ নামের মশা প্রায়ই মানুষকে কামড়ায়, কিন্তু এদের মাধ্যমে কোনও মারাত্মক রোগ ছড়ানোর রেকর্ড নেই। ‘টক্সোরিঙ্কাইটিস’ গণে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন প্রজাতির মশা সারা বিশ্বেই খুব সাধারণ। এরা মূলত বনজঙ্গলে বাস করে। এই মশারা রক্তের চেয়ে ফুলের মধু খেতেই বেশি ভালবাসে।

অনেকেই ভাবেন– সব মশা মেরে ফেললে ম্যালেরিয়ার মতো রোগ চিরতরে দূর হবে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন। সব মশা একবারে বিলুপ্ত হলে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খলে বড় ধাক্কা লাগবে। কারণ অনেক প্রজাতির মশা মানুষের কোনও ক্ষতি করে না। উল্টে এরা ব্যাঙ, পাখি, মাছ, বাদুড়ের প্রধান খাবার হয়ে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে। তাই শেষ পর্যন্ত মশা পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখনও বিজ্ঞানীদের অনেক কিছুই অজানা।
গবেষকদের মত, বেশ কয়েক বছর ধরে কোনও এলাকায় যদি ব্যাকটেরিয়াবাহী মশা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মশারা রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।
তাই করণীয় হল– মশা মারার চেয়ে জরুরি মশার বংশবৃদ্ধি রোধ করা। বাড়ির আশপাশে জল জমতে না দেওয়া, মশারি ব্যবহার করা, জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, সচেতন হওয়া এবং অন্যকে সচেতন করা– এসব পন্থা অবলম্বন করলে মশাবাহিত রোগ থেকে অনেকখানি নিস্তার পাওয়া যাবে বলছেন চিকিৎসকরা। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় জৈবিক মশা নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগও করা হচ্ছে। এর আওতায় মূলত পুরুষ মশার ভিতর ‘ওলবাকিয়া’ ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হচ্ছে অথবা ল্যাবরেটরিতে বন্ধ্যা পুরুষ মশা তৈরি করে প্রকৃতিতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
গবেষকদের মত, বেশ কয়েক বছর ধরে কোনও এলাকায় যদি ব্যাকটেরিয়াবাহী মশা ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম মশারা রোগ ছড়ানোর ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। এতে মশক কুল টিকে থাকলেও ডেঙ্গি-ম্যালেরিয়ার মতো রোগের উৎপাত ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। ইউরোপ বা আমেরিকা শুধু নয়, এশীয় দেশগুলিতেও ব্যাকটেরিয়াবাহী মশা ছড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভারতেও প্রাথমিক স্তরে এমন মশা নিয়ে কাজ শুরু করেছিল পুদুচেরির
‘আইসিএমআর-ভেক্টর কন্ট্রোল রিসার্চ সেন্টার’। মুম্বই ও দিল্লিতে এমন মশা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ’-এর।
রোনাল্ড রস ‘শত্রু’ চিনিয়ে দিয়ে গিয়েছেন। এখন আমাদের দায়িত্ব সেই শত্রুকে হারানো। মশাকে নয়, মশাবাহিত রোগকে নির্মূল করাই হোক ‘বিশ্ব মশা দিবস’-এর শপথ।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক শিক্ষক
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
ব্যাঙ্কের বাইরে এবার নিয়মিত টহল দেবে পুলিশ! নয়া নির্দেশিকা জারি লালবাজারের
-
যাত্রী সেজে গাড়িতে, ক্যাব চালকের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ফিল্মি কায়দায় ডাকাতি খাস কলকাতায়!
-
ইকবালের মতোই জলে ডুবে থাকে তার দিদি-বোনেরাও! ‘বাপমরা মেয়েগুলো’র চিন্তায় চোখে জল মায়ের
-
একজনের নামে ক’টা সিম কার্ড? আগস্টেই চালু হচ্ছে নয়া নিয়ম
-
রাতবিরেতে আচমকা পূর্ব বর্ধমানের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হানা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর! ঘেঁটে দেখলেন ওষুধের স্টক