Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Nitish Kumar

পরিবারবাদ! নীতীশের বাণপ্রস্থের প্রাক্কালে রাজনীতিতে পুত্র নিশান্ত

নীতীশ কুমার রাজনৈতিক বাণপ্রস্থে যাওয়ার প্রাক্কালে পুত্রকে রাজনীতিতে টেনে নিজেকেও নামিয়ে আনলেন পরিবারবাদী লোভী রাজনীতিকদের কাতারে। না কি নিশান্তই স্বকীয়তা ভেঙে বাবার দলে যোগ দিলেন? সৃষ্টিকে স্থায়িত্ব দিতেই কি এই একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা?

Advertisement
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: মার্চ ১১, ২০২৬, ১৯:৪৯

link
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: মার্চ ১১, ২০২৬, ১৯:৪৯

options
link
পরিবারবাদ! নীতীশের বাণপ্রস্থের প্রাক্কালে রাজনীতিতে পুত্র নিশান্ত zoom
নীতীশ কুমারের ছেলে নিশান্ত কুমারই কি বিহারের পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী?

কুড়ি বছর কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকার পর কেউ যদি বলেন, রাজ্যসভার সদস্য হওয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অপূর্ণ ইচ্ছে, কথাটা শুনতে একটু কেমন কেমন লাগারই কথা। কেননা, এই কিছুকাল আগেও ওই মানুষটিকে দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখার জন্য অনুগামীদের পাশাপাশি আরও অনেকেই গলা ফাটিয়েছিলেন। বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র নেতা হওয়ার আগ্রহের ইঙ্গিতও তিনি ঠারেঠোরে দিয়ে গিয়েছেন। অথচ তিনিই, ‘বিহার-নরেশ’ নীতীশ কুমার, ভক্তরা যাঁকে ‘সুশাসনবাবু’ বলে ডাকতে পছন্দ করেন, জীবন-সায়াহ্নে এসে বললেন কিনা রাজ্যসভার সদস্য হতে পারাটাই নাকি তাঁর অপূর্ণ ইচ্ছে! কেমন কেমন তো লাগবেই!

রাজ্যসভার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন নীতীশ নিজেই তাঁর সেই গোপন অভীপ্সা ফাঁস করেন। সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, ‘সংসদীয় রাজনীতিতে ঢোকার দিন থেকেই এই বাসনা পুষে রেখেছিলাম বিধানসভা ও বিধান পরিষদের মতো লোকসভা ও রাজ্যসভারও সদস্য হব। বিধানসভা, বিধান পরিষদ ও লোকসভার সদস্য হয়েছি। এবার রাজ্যসভাতেও আসতে চলেছি।’ সেদিন দ্বিপ্রহরে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় নীতীশের সঙ্গে ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর উপস্থিতিই বুঝিয়ে দেয়, নীতীশের ইচ্ছাপূরণের আসল ‘রহস্য’ কী, তাঁকে রাজ্যছাড়া করে দিল্লি পাঠানোর নেপথ্য নায়ক কে, কী তাঁদের পরিকল্পনা এবং অপসারিতের ‘অপূর্ণ সাধ’ পূরণের যুক্তি কতটা অসার ও হাস্যকর।

Advertisement

গত বছর বিহার বিধানসভার ভোট হওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন ‘এসআইআর’ শব্দটি সর্বজনীন করে তুলেছিল। সে নিয়ে ওই রাজ্যের বিরোধী দলগুলো স্রেফ মিডিয়ায় গরম-গরম কথা বলেছিল। ড্রয়িং রুমে চায়ের কাপে তুফান তুলেছিল। ভেবেছিল তাতেই কেল্লা ফতে হয়ে যাবে। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস ময়দানে নেমে নির্বাচন কমিশনের দূরভিসন্ধির হাঁড়ি হাটে ভাঙতে যা করছে, সেভাবে মোকাবিলা করার কথা বিহারী বিরোধীরা ভাবেননি। ফলে যা হওয়ার সেটাই হয়েছিল। ২৪৩ আসনের মধ্যে বিজেপি ও জেডিইউ-এর এনডিএ জোট ২০২টি আসন জিতে নেয়। শুধু যা হোক করে জেতা নয়, বিহারে ভূমিধস জয় ছিল বিজেপির প্রথম লক্ষ্য। সেই লক্ষ্যপূরণ হওয়ার পর তারা নজর দেয় দ্বিতীয়টির প্রতি। নীতীশের হাত থেকে মুখ্যমন্ত্রিত্ব কেড়ে নেওয়া। সেজন্য তাড়াহুড়ো না করে তারা অপেক্ষায় থাকে রাজ্যসভার ভোটের জন্য।

বিহারের এই সম্ভাব্য পালাবদল অনেক দিক থেকেই অভিনব।

১ মার্চ ৭৫ পেরলেন নীতীশ। মোদি-আইনে সক্রিয় রাজনীতি ছেড়ে ‘মার্গদর্শক’ হওয়ার চিহ্নিত বয়স ওটাই। তার আগেই চাণক্যের নীলনকশা তৈরি শেষ। কাপ ও ঠোঁটের ফঁাক দিয়ে চা চলকে না গেলে ১৬ মার্চের পরেই বিহারে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসবেন বিজেপির কেউ। এই স্বপ্নটাই এক যুগ ধরে দেখে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ। নীতীশের ‘অপূর্ণ সাধ মেটানো’ ও বিহারে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রিত্ব লাভ একই সঙ্গে সাঙ্গ হবে।

বিহারের এই সম্ভাব্য পালাবদল অনেক দিক থেকেই অভিনব। প্রথমত, দীর্ঘ কুড়ি বছরের ধারাবাহিকতার অবসান ঘটবে। নীতীশ কুমারে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া বিহারি সমাজ ও রাজনীতিকে এবার অন্য মানসিকতায় ধাতস্থ হতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুধু ব্যক্তি-বদল নয়; জয়প্রকাশ নারায়ণ, রামমোহন লোহিয়া, কর্পূরী ঠাকুরদের সমাজবাদী বিহার, যেখানে অনগ্রসর শ্রেণির দাপটে মাথা তুলে ‘অগ্রসর সমাজ’ সেভাবে কর্তৃত্ব ফলাতে পারেনি, সেই বিহারে ক্রমেই মাথাচাড়া দেবে বিজেপির ‘উচ্চবর্গীয়’ আদর্শ।

মণ্ডলায়নের সাম্যবাদী নীতিকে পিছনে ফেলে এগিয়ে আসবে হিন্দুত্ববাদী জাগরণ। লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারের উত্থান চার দশক ধরে বিহারে যে-সামাজিক বুনন-নকশা প্রতিষ্ঠা করেছে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপির প্রশাসন তা থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রহর গুনবে। সেই বিচ্যুতি সমাজে কী ধরনের আলোড়ন তুলবে এখনও অজানা।

লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারের উত্থান চার দশক ধরে বিহারে যে-সামাজিক বুনন-নকশা প্রতিষ্ঠা করেছে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপির প্রশাসন তা থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রহর গুনবে।

বিজেপির এই ছকবাজি নীতীশ ধরতে পারেননি এমন মনে করার কোনও কারণ নেই। আর যাই হোন, নির্বোধ নন তিনি। নির্বাচনের আগেই তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, রাজ্যের রাশ ছাড়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। নইলে কার নেতৃত্বে এনডিএ নির্বাচন করবে এই প্রশ্ন বিজেপির দিক থেকে তোলা হত না। জেতার পর কে মুখ্যমন্ত্রী হবেন, সেই প্রশ্নও উঠত না। চতুর বিজেপি বুঝেছিল, নীতীশকে রসেবশে রেখেই ভোট পেরতে হবে। মুখ্যমন্ত্রীর ‘ইগো’ আহত না করে ঘুঁটি সাজাতে হবে। একক গরিষ্ঠ দল হয়েও মোদি-শাহ জুড়ি তাই জানিয়ে দিতে দেরি করেননি যে, নীতীশ-ই মুখ্যমন্ত্রী হবেন। যদিও পরের খেলাটা তঁারা খেলেছেন গোপনে। অলক্ষে।

নীতীশ যদিও খেলাটা ধরতে পেরেছিলেন। পেরেছিলেন বলেই এতকালের তীব্র অনীহার কাছে হার মেনেছেন। লালুপ্রসাদ গোটা পরিবারকে রাজনীতির জালে জড়ালেও নীতীশ সেই মানসিকতার ধারকাছ দিয়ে হাঁটেননি। একমাত্র সন্তান নিশান্তকে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী করতে চাননি। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নিশান্তও ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত রাজনীতি-বিমুখ ছিলেন। পরিবারতন্ত্রের প্রবাহে গা ভাসাননি। এ নিয়ে নীতীশের মনে প্রচ্ছন্ন গর্বও ছিল। সেই গর্ব তাঁর রাজনৈতিক সততা ও চরিত্রকে নিষ্কলুষ থাকতে সাহায্য করেছিল। এহেন নীতীশ রাজনৈতিক বাণপ্রস্থে যাওয়ার প্রাক্কালে অনিচ্ছুক ও অনাগ্রহী পুত্রকে কেন রাজনীতিতে টেনে আনলেন, নিজেকেও কেন নামিয়ে আনলেন পরিবারবাদী লোভী রাজনীতিকদের কাতারে, সেই রহস্য এখনও অনুদ্ঘাটিত। নিশান্তই বা কেন স্বকীয়তা ভেঙে সুরসুর করে বাবার দলে যোগ দিলেন? তাহলে নীতীশ কি বুঝতে পেরেছেন, তিনি না থাকলে তঁার দল ভেঙেচুরে খানখান হয়ে যাবে? সৃষ্টিকে স্থায়িত্ব দিতেই কি তাই এভাবে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে দঁাড়ানোর প্রচেষ্টা? ছেলের রাজ্যাভিষেক ঘটিয়ে নিশ্চিন্তে থাকার বাসনা?

এই ভাবনা নিতান্ত কাল্পনিক বা অমূলক নয়। দীর্ঘ দিন বিজেপির ঘর করার বিপদ তিনি জানেন। শুধু তিনি নন, অন্যদেরও তা অজানা নয়। ধর্মতলার ধরনা মঞ্চ থেকে গত রোববার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তা জানিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, প্রয়োজন ফুরলে ছুড়ে ফেলাই মোদি-শাহর রাজনীতি। জগদীপ ধনকড় কাজের সময় কাজি ছিলেন, কাজ ফুরনোর পর পাজি।
প্রয়োজন ফুরলে ছুড়ে ফেলা বিজেপির দ্বিতীয় বিকল্প। তাদের প্রথম লক্ষ্য গ্রাস করা। পূর্ণ অথবা আংশিক। প্রতিপক্ষ কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিজ দেহে লীন করা। সোজা বাংলায় গিলে ফেলা।

অসম গণ পরিষদের ইতিহাস মনে পড়ছে? গোয়ার মহারাষ্ট্রবাদী গোমন্তক পার্টি? কিংবা অদূর অতীতের শিরোমণি অকালি দল, বিজু জনতা দল? অথবা এই হালের শিবসেনা, এনসিপি? বিজেপির ঘর যারাই করেছে, কোনও না কোনও সময় তাদের প্রায় সবাইকেই অস্তিত্ব রক্ষার অসম লড়াইয়ে নামতে হয়েছে। নীতীশের জীবদ্দশায় জেডিইউয়ের পরিণতিও তেমনই হত গত বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলে। কিংবা এখন মুখ্যমন্ত্রিত্ব ছেড়ে সম্মানজনক নিষ্ক্রমণের পথে হাঁটার প্রস্তাবে সম্মত না হলে।

দীর্ঘ দিন বিজেপির ঘর করার বিপদ তিনি জানেন। শুধু তিনি নন, অন্যদেরও তা অজানা নয়।

অশক্ত নীতীশের বার্ধক্যের বারাণসী হিসাবে রাজ্যসভাকেই বেছে নিয়েছেন মোদি-শাহ জুটি। সেই সিদ্ধান্ত টলানোর মতো শারীরিক ক্ষমতা ও মানসিক দৃঢ়তা হালের নীতীশ কুমারের নেই। বিহারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিজেপির মুখ্যমন্ত্রিত্ব লাভের জন্য নীতীশের রাজনৈতিক ‘উদারতা’ অথবা বাধ্যবাধকতাই চিহ্নিত হবে।

বিজেপির মুখ্যমন্ত্রীদের তালিকায় বিহার হতে চলেছে ১৭তম রাজ্য। আরও পঁাচ রাজ্যে বিজেপি শাসক দলের শরিক। গড়গড়িয়ে এগিয়ে চলা গেরুয়া রথের গতি পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাড়ুতে এবারেও রুদ্ধ হয় কি না, কিংবা অসমে ধ্বংসস্তূপ থেকে ফিনিক্স পাখির মতো কংগ্রেস জেগে উঠতে পারে কি না সেই আগ্রহের পাশাপাশি নজর থাকবে আগামী দিনের বিহারেও। তিলে তিলে গড়ে তোলা নীতীশের দল নিশান্ত অটুট রাখতে পারবেন কি?
পুত্রের সাফল্য না কি নিদারুণ ব্যর্থতা কোনটা প্রত্যক্ষ করতে হবে নীতীশকে? সমাজবাদী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে উচ্চবর্গীয় হিন্দুত্ববাদ উত্তরপ্রদেশের মতো বিহারকেও গ্রাস করলে লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারদের শেষজীবন স্বস্তিদায়ক হবে না।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.