Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
Legal Rights

স্বাধীনতার শেষ, আইনি অধিকারের শুরু

এক সপ্তাহের কম সময়ে এলাহাবাদ হাই কোর্ট লিভ ইন নিয়ে দু’টি রায় দিয়েছে। একটি মামলায় একজন বিচারপতি বলেন, আইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদ না হলে ‘লিভ ইন’ করা যাবে না। অন্য মামলায় ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেয়, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে যদি কোনও সাবালিকা লিভ ইন করে তবে তা আইনত দণ্ডনীয় নয়।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মার্চ ৩০, ২০২৬, ২১:৪৯

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মার্চ ৩০, ২০২৬, ২১:৪৯

options
link
স্বাধীনতার শেষ, আইনি অধিকারের শুরু zoom

এক সপ্তাহের কম সময়ে এলাহাবাদ হাই কোর্ট লিভ ইন নিয়ে দু’টি রায় দিয়েছে। একটি মামলায় একজন বিচারপতি বলেন, আইনিভাবে বিবাহবিচ্ছেদ না হলে ‘লিভ ইন’ করা যাবে না। অন্য মামলায় ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেয়, বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে যদি কোনও সাবালিকা লিভ ইন করে তবে তা আইনত দণ্ডনীয় নয়। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও আইনি অধিকার, নৈতিকতা ও আইনি পরিসরের আলোচনা কি স্ফুটাস্ফুট হল? লিখছেন প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত

অনামিকা আর অঞ্জু দু’জনেই উত্তরপ্রদেশের মেয়ে। কিন্তু ওরা যে একে-অপরের পরিচিত সে-কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। অথচ দু’জনেই পড়েছে এমন সমস্যায়, যেখানে বুনিয়াদি স্তরে মিল বা সাদৃশ্য থাকলেও, দু’জনের ক্ষেত্রে ফল হয়েছে ভিন্ন।

Advertisement

আর, এই ভিন্ন ফলাফলের জন্যই দু’জনের সমস্যা জড়িয়ে পড়েছে অদ্ভুত এক গেরোয়।
অঞ্জু বিবাহিত। অনামিকা বিয়ে করেনি এখনও। বয়স সদ্য আঠারো পেরিয়েছে, অনামিকার মায়ের এমনই দাবি। তার মা আর বাড়ির লোকদের আরও দাবি যে, বাড়ি ছেড়ে চলে এসে অনামিকা যে-লোকটির সঙ্গে একত্রে বসবাস করছে, সেই পুরুষটি, যার নাম নেত্রপাল, বিবাহিত। তার স্ত্রী বর্তমান এবং স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ বা ডিভোর্স হয়নি। শুধু তা-ই নয়, অনামিকার বাড়ির লোকদের আরও অভিযোগ, ওই বিবাহিত পুরুষটি অনামিকাকে ফুসলে বাড়ি থেকে বের করে নিয়ে এসে তার কাছে রেখে একত্রবাস করছে, যাকে বলে, ‘লিভিং টুগেদার’।

অনামিকার বাড়ি, মানে, তার পিত্রালয় শাহজাহানপুরের জেলার জৈতপুর থানার আওতায়। তার মা এবং বাড়ির কয়েকজন তাকে ফুসলে নিয়ে আসার জন্য নেত্রপালের নামে থানায় অভিযোগ জানিয়েছে। ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (পূর্বতন নাম ‘ইন্ডিয়ান পেনাল কোড’), ৮৭ ধারায়, সেই অভিযোগের ভিত্তিতে, যাতে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করতে না পারে, তার জন্য অনামিকা ও নেত্রপাল দ্বারস্থ এলাহাবাদ হাই কোর্টের।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-র ৮৭ ধারার বিষয়বস্তু: অপহরণ করে, জোর খাটিয়ে, বা ভুল বুঝিয়ে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনের চেষ্টার জন্য দণ্ড নির্ধারণ।

ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-র ৮৭ ধারার বিষয়বস্তু: অপহরণ করে, জোর খাটিয়ে, বা ভুল বুঝিয়ে কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন বা স্থাপনের চেষ্টার জন্য দণ্ড নির্ধারণ। অনামিকা আর নেত্রপালের দাবি, অনামিকা সাবালিকা। সে স্বেচ্ছায় বাস এবং সহবাস করেছে নেত্রপালের সঙ্গে। তার জন্য নেত্রপাল কোনওরকম জবরদস্তি করেনি বা ভুল বোঝায়নি বা মিথ্যার আশ্রয় নেয়নি। ওরা যা করেছে, দু’জনে জেনে-বুঝে করেছে। ওদের আরও ভয়, অনামিকার বাড়ির লোকজন নাকি প্রতিহিংসাবশত ওদের উপর শারীরিক আক্রমণ করতে পারে, এমনকী মেরেও ফেলতে পারে, যাকে ‘অনার কিলিং’ বলে। তাই ওরা সুরক্ষা চেয়েছে উচ্চ আদালতের কাছ থেকে। তা, সুরক্ষা দিয়েছে এলাহাবাদ হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। জাস্টিস মুনির এবং জাস্টিস তরুণ সাক্সেনা বলেছেন, ‘নৈতিকতা’ এবং ‘আইন’ দু’টি এক ব্যাপার নয়। তঁাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনামিকা আর নেত্রপালের একত্রবাসে আইন কোনওভাবে লঙ্ঘিত হয়নি এবং তাদের কাজ যেহেতু ‘অপরাধ’ রূপে গণ্য করা যায় না, তাই তাদের গ্রেফতার করা যাবে না, এবং অনামিকার বাড়ির লোকদেরও বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছেন ওদের কোনও শারীরিক ক্ষতি যেন তারা না করে। শুধু তা-ই নয়, অনামিকা আর নেত্রপালের নিরাপত্তার দায়িত্বও আদালত ন্যস্ত করেছেন শাহজাহানপুর জেলার পুলিশ সুপারের উপর।

এই খবর ও রায় ঘিরে শোরগোল পড়েছে ইতিমধ্যে। তবে ডিভিশন বেঞ্চ যেদিন এই রায় দিল, তার ঠিক ৫ দিন আগে, ওই ন্যায়ালয়েরই আর-একজন বিচারপতি বিবেককুমার সিং রায় দিয়েছিলেন অঞ্জুর রিট আবেদনের। অঞ্জু বিবাহিত, কিন্তু স্বামীর সঙ্গে থাকে না। থাকে, মানে ‘লিভ ইন’ করে যার সঙ্গে, সেই লোকটিও বিবাহিত। এদের দু’জনেরই স্বামী বা স্ত্রী বর্তমান, এবং কারও ডিভোর্সও হয়নি।

অঞ্জু আর তার সহবাস বা সঙ্গবাসের সঙ্গী হাই কোর্টের কাছে আবেদন করে নিরাপত্তা চেয়েছিল তাদের যে-যার বিবাহিত স্বামী বা স্ত্রীর থেকে। অর্থাৎ, তারা যেন অঞ্জু আর ওই লোকটির সঙ্গবাস বা সহবাসে ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। সেই সঙ্গে রাজ্য সরকারকেও মামলায় পক্ষভুক্ত করে প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা দাবি করা হয় ওই আবেদনে।

এখানে কিন্তু অন্য কথা বলে হাই কোর্ট। বিচারপতির পর্যবেক্ষণের কিয়দংশের সংক্ষিপ্তসার হল: ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার অসীম বা অবাধ নয়; এটি নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ সাপেক্ষে। একজনের স্বাধীনতা সেখানেই শেষ হয়, যেখানে অন্যজনের আইনগত অধিকার শুরু হয়। যেমন, দাম্পত্য জীবনে স্বামী বা স্ত্রীর একে-অপরের সঙ্গ পাওয়ার যে আইনি অধিকার রয়েছে, তাকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অজুহাতে কেড়ে নেওয়া যায় না। অর্থাৎ, একজনের স্বাধীনতা কখনওই অন্যজনের আইনি অধিকারকে খর্ব করতে পারে না।’
জাস্টিস সিং খারিজ করলেন অঞ্জু আর তার সঙ্গীর আবেদন। বললেন, তারা যেহেতু আইনত বিবাহিত, তাই তাদের স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের পরেই তারা অন্য কারও সঙ্গে ‘লিভ ইন’ করতে পারবে। বিচারপতি অবশ্য সেই সঙ্গে এও বললেন, অঞ্জুর স্বামী বা তার সঙ্গী লোকটির স্ত্রী যদি তাদের বিরুদ্ধে সহিংস পথ অবলম্বন করে তার জন্য অঞ্জুরা পুলিশের দ্বারস্থ হতেই পারে।

বিচারপতির পর্যবেক্ষণের কিয়দংশের সংক্ষিপ্তসার হল: ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার অসীম বা অবাধ নয়; এটি নির্দিষ্ট কিছু বিধিনিষেধ সাপেক্ষে।

একই আদালতের ভিন্ন বিচারপতিদের দু’টি আদেশের ভিন্নমুখিতা মানুষের মনে প্রচুর প্রশ্ন জাগিয়ে দেয়। কেউ হয়তো এই ব্যাপারটি প্রসঙ্গে ‘দ্বিচারিতা’-র মতো কঠিন বিশেষণও ভেবে ফেলতে পারে। প্রশ্ন উঠবে, অনামিকাদের মামলায় ডিভিশন বেঞ্চ যে ‘মর‍্যালিটি’ বা নৈতিকতাকে আইনের থেকে আলাদা রাখার কথা বলল, সেই নৈতিকতার সংজ্ঞাই-বা কেমন? কোন যুগের সমাজের প্রেক্ষাপটে সেই নৈতিকতার মাপকাঠি ধার্য হবে? নৈতিকতার প্রশ্নে কি একত্র করা যাবে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেকটি ভারতীয় নাগরিককে?

এমন প্রশ্নের উত্তর দেবে সমাজবিদ, আইনবিদ, ইতিহাসবিদ, রাজনীতিবিদ এমনকী দার্শনিকরাও। উত্তর পাওয়া খুব সহজ হবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু ৫ দিনের ব্যবধানে আসা কতকটা একই প্রসঙ্গে দু’রকম রায়ের ব্যাপারে ২-১টি বৈশিষ্ট্যের দিকে চোখ ফেরানো যেতেই পারে।

অনামিকা আর নেত্রপালের মামলায় কোনওভাবে জড়িয়ে থাকেনি অন্য একজন নারী। সে এই মামলার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। অথচ তার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়নি বিন্দুমাত্র। সে আর কেউ নয়, নেত্রপালের ধর্মপত্নী। ডিভিশন বেঞ্চের রায় তার বিরুদ্ধে নয়, বরং অনামিকার পরিজনদের বিরুদ্ধে। যাদের বাড়ির অষ্টাদশী এক বিবাহিত পুরুষের সঙ্গলাভের মোহে ঘর ছেড়েছে। কিন্তু নেত্রপালের ঘরে ‘পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর’ নিয়ে যে রয়ে গেল, তারপর প্রতি নেত্রপালের অনুভূতির প্রসঙ্গ যদি উঠত, তাহলে জাস্টিস মুনির এবং জাস্টিস সাক্সেনা কী করতেন, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ঠিক এই কারণেই জাস্টিস সিং-কে রায় দেওয়ার সময় ভাবতে হয়েছে– স্বামী আর স্ত্রী দু’জনের আইনি অধিকারের স্ফুটাস্ফুট সীমারেখার বিষয়টি। সেই প্রশ্ন ডিভিশন বেঞ্চের সামনে আসেনি। যদি আসত, তাহলে রায় কেমন হত বলা মুশকিল।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক আইনজীবী
[email protected]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.