মানুষ জীবনের সবক্ষেত্রেই জয়ী হতে চায়, কিন্তু নিজের শিষ্যের কাছে সে পরাজয়ই কামনা করে। কারণ, শিক্ষাদান কেবল একটি ‘পেশা’ নয়; এটি একটি ‘ব্রত’। ওড়িশার রাইরংপুরের ‘শ্রীঅরবিন্দ ইন্টিগ্রাল স্কুল’-এ আমি শিশুদের পড়াতাম এক সময়। সেই দিনগুলির কথা স্মরণ করে এখনও উদ্দীপ্ত হই। শিক্ষক দিবসে বিশেষ নিবন্ধ। লিখলেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু।
শিক্ষকরাই মানুষের ভাগ্য গড়ে দেন। এই শিক্ষক দিবসে, সমস্ত ভারতবাসীর পক্ষ থেকে, আমি সেসব শিক্ষকের কৃতজ্ঞতা জানাই, যাঁরা কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জীবনে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও অনুপ্রেরণার সঞ্চার করেছেন। ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের জন্মদিনটি ‘শিক্ষক দিবস’ রূপে পালিত হয়। তিনি ছিলেন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট লেখক ও রাষ্ট্রনায়ক; তবুও শিক্ষক রূপে নিজের ভূমিকাকেই তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করতেন। ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালামকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘বিজ্ঞানী’ না কি ‘রাষ্ট্রপতি’– মানুষ তাঁকে কোন পরিচয়ে বেশি মনে রাখবে বলে তিনি মনে করেন? ড. কালাম উত্তরে বলেছিলেন, তিনি ‘শিক্ষক’ রূপে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতে চান।
দক্ষতা ও চরিত্র যাঁদের শ্রদ্ধেয় করে তোলে, সেসব শিক্ষক এবং তাঁদের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষার্থীরা সর্বদা আমাদের আদর্শ হয়ে থেকেছেন। আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের আপন সন্তানের মতো ভালবাসা, প্রত্যেকের প্রতি সমান ও ন্যায়সম্মত আচরণ করা, শিক্ষার্থীদের প্রতি মেজাজ না হারানো ও ধৈর্যশীল থাকা, তৎ-সহ তাদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, এবং তাদের শেখার ক্ষমতা অনুযায়ী পাঠদান করা। শিক্ষকদের প্রতি এই গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই প্রায় তিন সহস্রাব্দ আগে তৈত্তিরীয় উপনিষদের ‘শিক্ষাবল্লী’ অংশে সেই কালজয়ী বার্তাটি দেওয়া হয়েছিল – ‘আচার্য দেব ভব’ (অর্থাৎ, আচার্য বা শিক্ষককে দেবতার মতো সম্মান করো)।
শিক্ষকদের কাহিনি এক গভীর সত্যকে তুলে ধরে: একজন স্নেহশীল ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক– শিক্ষার্থীর অন্তরে– অসীম সম্ভাবনা ও অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তুলতে পারেন। সেই উৎসাহে বলীয়ান হয়ে শিক্ষার্থীরা জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হওয়ার সাহস এবং সর্বোচ্চ লক্ষ্য পূরণের আত্মবিশ্বাস অর্জন করে।
অনেক জ্ঞানী ও স্নেহশীল শিক্ষকের সান্নিধ্য ও পরামর্শ পাওয়া আমার পরম সৌভাগ্য। অনেক সময় স্কুলের সময়ের পরেও শিক্ষকরা তাঁদের বাড়িতে আমাদের পড়াতেন এবং অত্যন্ত যত্ন-সহকারে আমাদের দেখাশোনা করতেন। সপ্তম শ্রেণি পাস করার পর উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রামের বাইরে পা রাখা প্রথম মেয়েটি ছিলাম আমিই। পরে ভুবনেশ্বরে পড়াশোনার সময়ও আমি আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রচুর ভালবাসা ও উৎসাহ পেয়ে ধন্য হয়েছি। বিনম্রচিত্তে আমার শিক্ষকদের কথা উল্লেখ করছি, কারণ তাঁদের কাহিনি এক গভীর সত্যকে তুলে ধরে: একজন স্নেহশীল ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক– শিক্ষার্থীর অন্তরে– অসীম সম্ভাবনা ও অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তুলতে পারেন। সেই উৎসাহে বলীয়ান হয়ে শিক্ষার্থীরা জীবনের কঠিনতম চ্যালেঞ্জগুলির মুখোমুখি হওয়ার সাহস এবং সর্বোচ্চ লক্ষ্য পূরণের আত্মবিশ্বাস অর্জন করে। শিক্ষকরা কেবল পাঠ্যসূচি অনুযায়ী শিক্ষাদানই করেন না; বরং নিজেদের আচরণ ও দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাঁরা শিক্ষার্থীদের এমন সব দক্ষতার পাঠ দেন, যা একটি সার্থক জীবনযাপনের জন্য অপরিহার্য। একজন শিক্ষক কেবল পথ প্রদর্শকই নন, বরং শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের যাত্রায় তিনি একজন শুভাকাঙ্ক্ষী, বন্ধু এবং সহযাত্রীও বটে।
আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের উচিত শিক্ষার্থীদের আপন সন্তানের মতো ভালবাসা, প্রত্যেকের প্রতি সমান ও ন্যায়সম্মত আচরণ করা, শিক্ষার্থীদের প্রতি মেজাজ না হারানো ও ধৈর্যশীল থাকা, তৎ-সহ তাদের কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া, এবং তাদের শেখার ক্ষমতা অনুযায়ী পাঠদান করা।
একজন ভাল শিক্ষকের গুণাবলি সম্পর্কে প্রাচীনকাল থেকে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে যে-ধারণা চলে আসছে, তা এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। বহু শতাব্দী আগে মহাকবি কালীদাস ‘মালবিকাগ্নিমিত্রম্’ নাটকে লিখেছিলেন, ভালো শিক্ষক তিনিই, যাঁর গভীর জ্ঞান রয়েছে এবং সেই জ্ঞান যথার্থভাবে অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে।
সংস্কৃতের একটি সুপরিচিত বচনে বলা হয়েছে: ‘সর্বত্র বিজয়মিচ্ছেৎ, শিষ্যাদিচ্ছেৎ পরাজয়ম্’– অর্থাৎ, মানুষ জীবনের সব ক্ষেত্রেই জয়ী হতে চায়, কিন্তু নিজের শিষ্যের কাছে সে পরাজয়ই কামনা করে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটানো, তাদের কৌতূহল জাগিয়ে তোলা, প্রশ্ন করার প্রবণতাকে উৎসাহিত করা, তাদের যুক্তি ও বিচারবুদ্ধিকে শাণিত করা এবং তাদের স্বাধীন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ রূপে গড়ে উঠতে সহায়তা করা– শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এগুলিই হল সবচেয়ে ফলপ্রসূ ও তৃপ্তিদায়ক দিক। এ ধরনের প্রেরণাদায়ক শিক্ষার মাধ্যমেই আমরা সফল উদ্যোক্তা, প্রতিভাবান বিজ্ঞানী, সৃজনশীল শিল্পী এবং এমন সব নাগরিক গড়ে তুলতে পারব, যারা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করতে সক্ষম হবে।
শিক্ষাদান কেবল একটি ‘পেশা’ নয়; এটি একটি ‘ব্রত’। এটি নিছক কোনও চাকরি বা জীবিকা নয়; বরং মানবসত্তাকে গড়ে তোলার এক পবিত্র কাজ। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক পথের দিশা দেখানোর এক মহান দায়িত্ব। শিক্ষকতার দিনগুলির স্মৃতি আমাকে এক বিশেষ তৃপ্তি ও প্রশান্তি দেয়। ওড়িশার রাইরংপুরের ‘শ্রীঅরবিন্দ ইন্টিগ্রাল স্কুল’-এ আমি শিশুদের পড়াতাম। বিভিন্ন বিষয় শেখানোর পাশাপাশি, শিশুদের সংগীত পরিবেশনা, খেলাধূলা ও নাটকের প্রস্তুতির কাজেও আমি সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতাম। এখনও স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবস উদ্যাপনের প্রস্তুতি এবং সেই অনুষ্ঠানগুলিতে শিশুদের আনন্দ ও উদ্দীপনার কথা মনে পড়লে আমি দারুণ আনন্দ অনুভব করি। শিক্ষার্থীদের নিয়ে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পিকনিকে যাওয়া এবং খেলাধূলা ও অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমে তাদের পশুপাখি ও গাছপালার জগতের সঙ্গে পরিচয় করানোর মধ্যেও আমি গভীর তৃপ্তি ও সার্থকতা খুঁজে পেয়েছি।
শিক্ষাদান কেবল একটি ‘পেশা’ নয়; এটি একটি ‘ব্রত’। এটি নিছক কোনও চাকরি বা জীবিকা নয়; বরং মানবসত্তাকে গড়ে তোলার এক পবিত্র কাজ। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক পথের দিশা দেখানোর এক মহান দায়িত্ব।
স্কুল ছাড়ার বহু বছর পরেও আমার শিক্ষার্থীরা তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ জানায়। অনেক শিক্ষার্থীর নাম তো বটেই, এমনকী আদর করে তাদের যে-ডাকনামে আমরা ডাকতাম, সেগুলিও আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি যাদের পড়িয়েছি, তাদের কাছ থেকেও আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমার বিশ্বাস, শিশুদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও কৌতূহল থেকেও শিক্ষকরা অনেক কিছু শিখতে পারেন। রাষ্ট্রপতি রূপে আমার কার্যকালের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ভবনের প্রাঙ্গনে স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি এবং তাদের পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে শিক্ষা দিয়েছি। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেখা করা এবং তাদের চিন্তাভাবনা ও ধারণাগুলো বোঝার ব্যাপারে আমি সবসময়ই আগ্রহী। তারা যা কিছু ভাগ করে নেয়, তা আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকে।
প্রায় ১১ বছর আগে আমার গ্রামের বাড়িতে একটি আবাসিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সন্তান এবং যেসব শিশু তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছে, তারা এই বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। শিশুদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমি মাঝেমধ্যেই এই স্কুলে যাই। এবছর ২০ জুন, আমার জন্মদিনে, শিশুদের সঙ্গে দেখা করতে পেরে আমি খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও আমার সঙ্গে স্কুলটি পরিদর্শন করেন এবং শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করেন। তঁার সঙ্গে সাক্ষাতের সেই অসাধারণ অভিজ্ঞতা তাদের কাছে প্রেরণার এক চিরস্থায়ী উৎস হয়ে থাকবে। শিশুদের এভাবে বিকশিত হতে দেখা আমার মনে এক বিশেষ সার্থকতা ও তৃপ্তির অনুভূতি জাগায়। শিক্ষাপ্রদানের দায়িত্ব কেবল শিক্ষকদেরই নয়। যঁারা নিজেদের আচরণ ও সাফল্যের মাধ্যমে শিশুদের কাছে ‘আদর্শ’ হয়ে ওঠেন, তাঁরাও শিক্ষা ও অনুপ্রেরণার এক মূল্যবান উৎস। সন্তানদের পড়াশোনার জন্য পাঠানোর সময় অভিভাবকরা শিক্ষকদের উপর গভীর আস্থা রাখেন। তাঁরা বিশ্বাস করেন যে, শিক্ষকরা শিশুদের নিজেদের সন্তানের মতোই দেখবেন এবং তাদের নিরাপত্তা ও বিকাশের বিষয়ে সবচেয়ে বেশি যত্নবান হবেন। এই পবিত্র আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি শিক্ষকের নৈতিক দায়িত্ব। একজন শিক্ষকের মনোভাব ও আচরণ এমন হওয়া উচিত নয়, যা শিশুদের মনে ভয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে, তাদের মনোবল ভেঙে দেয় বা তাদের মধ্যে হীনমন্যতা জাগিয়ে তোলে। ভাল শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের তাদের সম্ভাবনার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে সহায়তা করেন। শিক্ষার্থীদের মানুষ রূপে গড়ে তোলার পথে সঠিক নির্দেশনা দেওয়া শিক্ষকদের এক পবিত্র কর্তব্য। যে-শিক্ষার্থীরা চিন্তায় ও কর্মে নৈতিকতা বজায় রেখে সমৃদ্ধি ও গৌরব অর্জন করে, তারাই একজন শিক্ষকের সাফল্যের জীবন্ত নিদর্শন।
সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে মূল ভিত্তি করে আমাদের দেশ একটি উন্নত জাতি হয়ে ওঠার লক্ষ্যে অবিচল গতিতে এগিয়ে চলেছে। এই যাত্রাপথে আমি চাই, আমাদের শিক্ষকরা এমন সব প্রজন্ম গড়ে তুলুন, যারা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও রীতিনীতির গুরুত্ব অনুধাবন করবে; যাদের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে এবং যারা মানবতার কল্যাণে কাজ করবে; যারা ‘অন্ত্যোদয়’-এর আদর্শকে সমুন্নত রাখবে; যারা পরিবেশ ও সকল জীবের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে; যারা ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত উৎকর্ষ সাধনে সচেষ্ট হবে এবং যারা ‘দেশ সবার আগে’– এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে যাবে। প্রতিটি নাগরিকের কাছে আমার আহ্বান: আমাদের নিবেদিতপ্রাণ ও আন্তরিক শিক্ষকদের সর্বদা সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত রাখুন। আমি একান্তভাবে কামনা করি, আমাদের তন্নিষ্ঠ শিক্ষকদের অবদানে ভারত নিরন্তর জ্ঞানার্জনের পথে এগিয়ে চলুক এবং বিশ্বকে নেতৃত্ব প্রদানের পথে অগ্রগামী হোক।
সর্বশেষ খবর
-
পরিত্রাতা পথকুকুররাই! দিব্যাঙ্গ মহিলাকে ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচাল চারপেয়ের দল, ভাইরাল ভিডিও
-
কালীনের কামব্যাকে কিস্তিমাত, নজরকাড়া রবি কিষান! কেমন হল ‘মির্জাপুর দ্য মুভি’?
-
ধ্বংসযজ্ঞ পেরিয়ে অবশেষে শান্তি! ট্রাম্পের দূত মস্কো পা রাখতেই ইউক্রেন যুদ্ধে ‘বিরতি’ ঘোষণা পুতিনের
-
ঋণ পেতে বড়সড় জালিয়াতি! ঋণখেলাপি সুভাষ চন্দ্রর বিরুদ্ধে মামলা সিবিআইয়ের
-
৮ বছর পর বারাসত স্টেডিয়ামে ফিরছে ফুটবল, এক ডার্বিতে তিন ইতিহাসের হাতছানি