সম্প্রতি নিজের বাসভবনে প্রাতরাশের চা-চক্রে বর্তমান ‘এনসিপিআই’ সাংসদদের ডেকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি আলোচনা চক্রে সবার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিলেন। বললেন বছরে একবার অন্তত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এবং নমো যে রাজনীতিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে সচেতন, সবাই বুঝলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই স্বাস্থ্য সচেতনতার বার্তা কিন্তু তাঁর প্রভাতি চা-চক্র আয়োজনের মধ্যেই আছে।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, প্রসিদ্ধ জাপানি চা-দার্শনিক ওকাকুরা কাকুজো তাঁর ‘দ্য বুক অফ টি’-এ জানিয়েছেন— ‘দেয়ার ইজ সামথিং ইন দ্য নেচার অফ টি দ্যাট লিডস আস ইনটু আ ওয়ার্ল্ড অফ কোয়ায়েট কনটেমপ্লেশন অফ লাইফ।’ হালের রাজনীতিকরা নানা টেনশনে ভুগছেন। জীবনে নিবিড় ধ্যানের প্রয়োজন তাঁরা ভুলেছেন। এই চা-চক্রের গভীর ব্যঞ্জনা শান্ত জীবনবোধের কথা মনে করিয়ে দিল।
চা শুধু এক কাপ পানীয় নয়— এ এক আশ্চর্য সামাজিক পরিসর। সেখানে রাজনীতি যেমন আসে, তেমনই আসে সাহিত্য, প্রেম, বন্ধুত্ব, নিঃসঙ্গতা আর আড্ডা।
এই প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে জর্জ অরওয়েলের ‘নাইস কাপ অফ টি’ প্রবন্ধটির কথা। এই লেখায় তিনি চা-কে বলছেন আধুনিক সভ্যতার এক তরল স্তম্ভ। সাধারণ বাঙালি জীবনে তো ওতপ্রোত বুননে জড়িয়ে আছে চা। মধ্যবিত্ত মধ্যবয়সি বাঙালি সকালে আজও চায়ে ভিজিয়ে দু’টি স্বাদ উপভোগ করে— বিস্কুট আর সংবাদপত্র। এছাড়া পাড়ার দোকানের চা। কাজের চেয়ারে বসে চা। অফিস আদালতের বাইরে এসে সিগারেটের ধোঁয়া মেশানো চা। দুপুরে ক্যাফেতে প্রেম বা পরকীয়ার চা। বাড়ি ফিরে সাংসারিক চা। রাতে পাড়ার আড্ডার চা। এছাড়া ডেলি প্যাসেঞ্জারদের স্টেশনের চা। তবে ‘চাওয়া পাওয়া’ ছবির উত্তম-সুচিত্রার ভাঁড়ে চা-চুমুক এবং উত্তমের উক্তি— ‘ঠান্ডা হলে মুখে দেওয়া যাবে না’— অধিকাংশ বাঙালির স্মৃতিতে ক্লাসিক।
আশ্চর্যের ব্যাপার, রবীন্দ্রনাথ তাঁর যৌবনে চায়ের মহিমা তেমন বোঝেননি। এবং বোঝার পরে চা-কে ‘শ্যামরসধারাপুঞ্জ’ বলতে দ্বিধা করেননি। আর চায়ের আড্ডাকে বলেছিলেন, ‘অলস সময়ের বিলাসিতা’। বুদ্ধদেব বসু রবীন্দ্রনাথের এই অলস সময়ের বিলাসিতার রূপকথা রেখে গিয়েছেন তাঁর ‘সব পেয়েছির দেশ’-এ। চা এমনই হিতকর, চায়ের মৌজে অসুন্দরকেও সুন্দর মনে হয়। এই বাণী জাপানের প্রসিদ্ধ লেখক হারুকি মুরাকামির— ‘টিইজম ইজ কাল্ট ফাউন্ডেড অন দ্য অ্যাডোরেশন অফ দ্য বিউটিফুল অ্যামঙ্গ দ্য সর্ডিড।’ এই কারণেই আধুনিক পৃথিবীতে চা-সংস্কৃতির চর্চা ক্রমবর্ধমান।
শেষ পর্যন্ত তাই, চা শুধু এক কাপ পানীয় নয়— এ এক আশ্চর্য সামাজিক পরিসর। সেখানে রাজনীতি যেমন আসে, তেমনই আসে সাহিত্য, প্রেম, বন্ধুত্ব, নিঃসঙ্গতা আর আড্ডা। দ্রুতগতির এই সময়ে চায়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো তার এই থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা একটু বসা, একটু কথা বলা, একটু ভাবা। গরম চা স্নায়ুকে শান্ত করতে ও মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। এক কাপ চা তাই কখনও নিছক চা নয়; কখনও তা জীবনকে একটু ধীর, একটু সুন্দর করে দেখার অজুহাত। আর সেই কারণেই চায়ের কাপে আজও এত গল্প জমে থাকে। দশজন মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার দারুণ এক উপলক্ষ।
সর্বশেষ খবর
-
অটো চালিয়ে অসুস্থকে বিনামূল্যে পৌঁছে দেন হাসপাতালে, ভাইরাল গভীর রাতের ‘শেরনি’
-
তসরের পাঞ্জাবিতে ঠিক যেন বর! প্রাক্তন স্ত্রী সুস্মিতা মা হতেই এবার বিয়ের পিঁড়িতে সব্যসাচী?
-
হাতে ৩৫ লাখি ব্যাগ, ২১ লক্ষের ঘড়ি পরে সংসদে ‘ক্যুইন’, মহুয়ার পর চর্চায় কঙ্গনার ‘ব্যাগবতী’
-
কলকাতায় আসার ঝঞ্ঝাট নেই, এবার চাকদহ থেকে সোজা শিলিগুড়ি! এসি বাস চালু এ সপ্তাহেই
-
ওয়ানডে বিশ্বকাপের দলে ঢুকতে কী করতে হবে? এবার ‘ব্রাত্য’ শামির জন্য এগিয়ে এলেন জাহির খান