Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • রবিবার
  • ৭ জুন ২০২৬
Hungary

প্রোপাগান্ডা রাজনীতি গণতন্ত্রের অংশ নয়, পথ দেখাচ্ছে হাঙ্গেরি

‘টিসজা পার্টি’ গত ১৬ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে পূর্ব ইউরোপ থেকে উৎপাটিত করার পরে, ১৮ মাসের ব্যবধানে, প্রথমবার হাঙ্গেরির সরকারি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন নতুন প্রধানমন্ত্রী ম্যাগার। আর, মনে করিয়ে দেন– মিথ্যে ও একদলীয়, প্রোপাগান্ডামূলক ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুৎসা করার নিউজ পরিবেশনের ট্র‍্যাডিশন ভাঙতে চান।

Advertisement
সুমন ভট্টাচার্য
সুমন ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: জুন ৬, ২০২৬, ১২:৩৪

link
সুমন ভট্টাচার্য
সুমন ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: জুন ৬, ২০২৬, ১২:৩৪

options
link
প্রোপাগান্ডা রাজনীতি গণতন্ত্রের অংশ নয়, পথ দেখাচ্ছে হাঙ্গেরি zoom

পথ দেখাচ্ছে হাঙ্গেরি। সেখানকার নতুন প্রধানমন্ত্রী পিটার ম্যাগার। যে পাবলিক ব্রডকাস্টিং সিস্টেম ছিল ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রীর ধামাধরা, তাদের চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন তিনি। বহুদলীয় গণতন্ত্রে– কণ্ঠস্বর সকলের সমান জরুরি।

‘আপনারা মিথ্যের চাষ করেন। আপনারা প্রোপাগান্ডা ছড়ান। এত দিন ধরে আপনারা একটি স্বৈরতন্ত্রের পক্ষ নিয়ে মানুষকে ভুল বুঝিয়েছেন। সরকারি অর্থ ব্যবহার করে এই মিথ্যে ও অমূলক প্রোপাগান্ডা বন্ধ করে দেব। আপনাদের পাবলিক ব্রডকাস্টিং চ্যানেল বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

Advertisement

খুব ঠান্ডা গলায় সঞ্চালিকার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কথাগুলি যিনি বলছিলেন, তিনি হাঙ্গেরির নতুন প্রধানমন্ত্রী, সপ্রতিভ ও সুদর্শন, পিটার ম্যাগার। ভিক্টর অরবানের ১৬ বছরের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে তিনি পূর্ব ইউরোপে স্বস্তির হাওয়া নিয়ে এসেছেন। দানিয়ুবের তীরে এখন সেই উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নতুন প্রধানমন্ত্রীর এইভাবে সংবাদ মাধ্যমকে ‘বদলে’ দেওয়ার কথা বলা নিয়েও তুমুল আলোচনা, বিতর্ক।

পিটার ম্যাগার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি শুধু যে সঞ্চালিকার চোখা-চোখা প্রশ্নের উত্তরে নিজ-দলের অবস্থান ও সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক, কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী অরবান ধ্বংস করে দিয়েছিলেন– এসবের সবিস্তার উল্লেখ করেছেন তা-ই নয়; দেশের মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা-সহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে যে একদলীয় শাসন, কার্যত স্বৈরতন্ত্রের নগ্ন রূপ, তাও নির্বংশ করার কথা বলেছেন।

অভিযোগ, ভিক্টর অরবান পূর্ব ইউরোপে একনায়কতন্ত্রী, একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু রেখেছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ঘনিষ্ঠ সুহৃদকে নির্বাচনে জেতানোর জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভান্স পর্যন্ত বুদাপেস্টে গিয়েছিলেন। এরপরেও অরবান কী করে ভোটে হারলেন, তা নিয়ে জল্পার শেষ নেই।

‘টিসজা পার্টি’ গত ১৬ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনকে পূর্ব ইউরোপ থেকে উৎপাটিত করার পরে, ১৮ মাসের ব্যবধানে, প্রথমবার হাঙ্গেরির সরকারি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন নতুন প্রধানমন্ত্রী ম্যাগার। আর, মনে করিয়ে দেন– মিথ্যে ও একদলীয়, প্রোপাগান্ডামূলক ও বিরোধীদের বিরুদ্ধে কুৎসা করার নিউজ পরিবেশনের ট্র‍্যাডিশন ভাঙতে চান। বলেন যে সমস্ত দল, সমস্ত রাজনৈতিক শক্তিকে নিয়ে একটি অ্যাডভাইজারি প্যানেল তৈরি করতে চান, যারা ভবিষ্যতে ‘পাবলিক ব্রডকাস্টিং সিস্টেম’-কে সামলাবে। কারণ, দেশের সব মানুষের অর্থে যদি কোনও সরকারি চ্যানেল চলে, তাহলে সেই চ্যানেল কোনও নির্দিষ্ট দলের প্রোপাগান্ডা মেশিন হয়ে উঠতে পারে না। দেশের সব মানুষের কথাই সে বলতে বাধ্য। সংবাদমাধ্যম ও স্বৈরতন্ত্রের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে ভবিষ্যতে বোধহয় হাঙ্গেরির উদাহরণ বারবার আসবে।

শাসক-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ধনী হতে সাহায্য করে। ম্যাগার পরিহাস করে বলেছেন, অরবানের ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিগণ গত ১৬ বছরে যত ধনী হয়েছেন, ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারও ৪০০ বছরে তত ধনসম্পদ জোগাড় করতে পারেনি! এটিই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর লক্ষণ, মুখ। স্বৈরতন্ত্র যাকে মদত দেয়। পিটার ম্যাগার এই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-কে আক্রমণ করছেন। ব্যবসা এবং শিল্পের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সকলের সমানাধিকারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন।

পিটার ম্যাগার অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি শুধু যে সঞ্চালিকার চোখা-চোখা প্রশ্নের উত্তরে নিজ-দলের অবস্থান ও সরকারের ভবিষ্যৎ নীতি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে হাঙ্গেরির সম্পর্ক, কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী অরবান ধ্বংস করে দিয়েছিলেন– এসবের সবিস্তার উল্লেখ করেছেন তা-ই নয়; দেশের মিডিয়া, বিচারব্যবস্থা-সহ অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে যে একদলীয় শাসন, কার্যত স্বৈরতন্ত্রের নগ্ন রূপ, তাও নির্বংশ করার কথা বলেছেন। তাঁর ব্যাখ্যায় বিচারবিভাগকে পক্ষপাতহীন করার ডাক আছে, হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগের আহ্বানও আছে। ম্যাগারের যুক্তি: যদি দেশের প্রেসিডেন্ট কোনও একটি নির্দিষ্ট দলের বা প্রোপাগান্ডার অঙ্গ হয়ে যান, তাহলে তিনি আর সে-দেশের ওই সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে বসে থাকতে পারেন না।

হাঙ্গেরি তাই পথ দেখাচ্ছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের। পথ দেখাচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক ইকোসিস্টেমে বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাণিজ্য একজনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে– তা চ্যালেঞ্জ করতে হয়। পিটার ম্যাগার সেজন্যই জোহরান মামদানির পরে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নেতা।

যাঁরা পূর্ব ইউরোপের রাজনীতি নিয়ে ওয়াকিবহাল, যাঁরা জানেন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব শেষ হয়ে যাওয়ার পরও কীভাবে ভ্লাদিমির পুতিনর অঙ্গুলিহেলনে হাঙ্গেরির সরকার ও সমাজ পরিচালিত, যাঁরা জানেন এই বিষয়ে পুতিন ও ট্রাম্পের মধ্যে মতানৈক্য নেই– তাঁরা অবশ্যই বুঝতে পারবেন– হাঙ্গেরির রাজনীতি, হাঙ্গেরির নির্বাচন-সহ সেখানকার স্বৈরতান্ত্রিক ইকোসিস্টেমকে বদলে দেওয়ার ঘোষণাটি কত গুরুত্বপূর্ণ। এই স্বৈরতান্ত্রিক ইকোসিস্টেম শুধু তো সংবাদ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে না, বিচারব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করে।

শাসক-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের ধনী হতে সাহায্য করে। ম্যাগার পরিহাস করে বলেছেন, অরবানের ঘনিষ্ঠ শিল্পপতিগণ গত ১৬ বছরে যত ধনী হয়েছেন, ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারও ৪০০ বছরে তত ধনসম্পদ জোগাড় করতে পারেনি! এটিই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-এর লক্ষণ, মুখ। স্বৈরতন্ত্র যাকে মদত দেয়। পিটার ম্যাগার এই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’-কে আক্রমণ করছেন। ব্যবসা এবং শিল্পের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সকলের সমানাধিকারের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন।

পূর্ব ইউরোপের ঘটনাটি হয়তো বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে– স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটলে কী হতে পারে! এমনকী, সংবাদমাধ্যমকে বদলে নিতে হয়। কারণ, সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষ না-থাকার শর্তকে বহুদলীয় গণতন্ত্র অনুমোদন করছে না। বহুদলীয় গণতন্ত্রে ‘বিরোধী’ কণ্ঠস্বরকে সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

হাঙ্গেরি তাই পথ দেখাচ্ছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের। পথ দেখাচ্ছে স্বৈরতান্ত্রিক ইকোসিস্টেমে বিচারব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাণিজ্য একজনের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে– তা চ্যালেঞ্জ করতে হয়। পিটার ম্যাগার সেজন্যই জোহরান মামদানির পরে আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত নেতা। স্বৈরতন্ত্রের চোখে চোখ রেখে বলতে পেরেছেন: ‘আপনাদের সংবাদ মাধ্যম কিন্তু এবার বন্ধ হয়ে যাবে’।

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.