Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শনিবার
  • ১৩ জুন ২০২৬
Raghu Rai

কাছে না গেলে ছবি ভালো হবে না, বলতেন কিংবদন্তি রঘু রাই

ছয়ের দশকে প্রায় আকস্মিকভাবে আলোকচিত্রের জগতে প্রবেশ। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ যোগ দেন। যুবক রঘু সে-সময় কলকাতার প্রচুর পাড়া, অলিগলি হেঁটে বেড়াতেন। এমন কোনও খাবার ডেরা বা ঐতিহাসিক স্থল নেই– যা রঘু রাই জানতেন না।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৩:৩৭

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ২৮, ২০২৬, ১৩:৩৭

options
link
কাছে না গেলে ছবি ভালো হবে না, বলতেন কিংবদন্তি রঘু রাই zoom
রঘু রাই ভারতকে দেখতে সাহায্য করেছেন।

ফোটোগ্রাফ: বাস্তবের হাতফেরতা অনুকরণ মাত্র। এই একমুখী ধারণাকে সযতনে ভেঙেছেন, গড়েছেন, বিনির্মিত করেছেন রঘু রাই। লিখছেন জহর সরকার। 

পশ্চিমের পাঞ্জাবি রঘু রাই কারও কাছে সহজে হার মানতেন না। তাই যখন উনি ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুরু করলেন, যা চলল বছরের পর বছর, আমরা বলতাম: ক্যানসার বাবাজি জানে না কার সঙ্গে টক্কর নিচ্ছে! অতএব হঠাৎ তাঁর চলে যাওয়ায় হতভম্ব হলাম। আমরা হারালাম শুধু ভারতের শ্রেষ্ঠ একজন আলোকচিত্রীকে নয়, হারালাম এই দেশের আধুনিক ফোটোজার্নালিজমের কিংবদন্তি পুরুষ ও ‘রোলমডেল’-কে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঝাংয়ে (বর্তমান পাকিস্তান)। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পরেও তাঁর ওই পেশায় মন ভরল না। ছয়ের দশকে প্রায় আকস্মিকভাবে আলোকচিত্রের জগতে প্রবেশ। ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এ যোগ দেন। যুবক রঘু সে-সময় কলকাতার প্রচুর পাড়া, অলিগলি হেঁটে বেড়াতেন। এমন কোনও খাবার ডেরা বা ঐতিহাসিক স্থল নেই– যা রঘু রাই জানতেন না। আর এসব নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করতে ভালবাসতেন। ‘তুমি কীরকমের কলকাতার ছেলে গো– এখনও ছোটা ব্রিস্টলেই যাওনি?’ পরে অবশ্য মেট্রো গলির ওই মধুশালায় গিয়ে ওই মহান ত্রুটিটি ঘুচিয়ে দিলাম।

ভারতীয় সাংবাদিকতায় কেন্দ্রীয় ভিজ্যুয়াল কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন; শেষ পর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া টুডে’-তে ‘ডিরেক্টর অফ ফোটোগ্রাফি’ রূপে দায়িত্ব পালন করেন। রাইয়ের কাজের উপর প্রাথমিকভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন অঁরি কার্তিয়ে-ব্রেসোঁ। ১৯৭৭ সালে তাঁর প্রতিভাকে
স্বীকৃতি দিয়ে ব্রেসোঁ বিখ্যাত ‘ম্যাগনাম ফোটোস’-এ তাঁকে মনোনীত করেন– ফলে রাই হলেন এই সংস্থার প্রথম ভারতীয় সদস্য। ছ’দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতের এক অনন্য ‘ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ’ নির্মাণ করেছেন– রাজনীতি, বিপর্যয়, আধ্যাত্মিকতা, এবং দৈনন্দিন জীবনের। তাঁর ছবিতে ধরা পড়েছে গত শতাব্দীর সবচেয়ে প্রধান ঘটনাগুলি।

যেমন: বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের ‘মুক্তিযুদ্ধ’-র সময় রঘু রাই শরণার্থী শিবির, সীমান্ত অঞ্চল এবং যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক মূল্যকে ধারণ করে অসংখ্য মর্মস্পর্শী ছবি তুলেছিলেন। সেসব ছবিতে ক্ষুধা, ক্লান্তি ও আশ্রয়ের সন্ধানে পালিয়ে বেড়ানো শরণার্থীদের অসহায়তা ফুটে উঠেছিল– যা সারা বিশ্বে গভীর সাড়া জাগায়, এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক শক্তিশালী ভিজ্যুয়াল দলিল রূপে যা এখনও রয়ে গিয়েছে। আর-একটি উল্লেখযোগ্য বিপর্যয়, ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডির মানবিক মাশুল, তাঁকে অমরত্ব দিয়েছে। ভোপাল দুর্ঘটনার পর একজন শোকাহত পিতার কোলে মৃত শিশু-সহ তাঁর তোলা ছবিটি বিশ্ব ফোটোজার্নালিজমের ইতিহাসে অন্যতম মর্মান্তিক চিত্র বলে বিবেচিত, বন্দিত।

ভারতের সর্বোচ্চ সংরক্ষণ স্থপতিদের মধ্যে একজন। তাঁর কাজ ও দায়িত্বর মধ্যে ছিল নয়াদিল্লির লালকেল্লা ও মহারাষ্ট্রের গুহাসমূহের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন; অমৃতসর ও পুরীর ঐতিহাসিক জনবসতির জন্য নগর সংরক্ষণ পরিকল্পনা।

এছাড়া তাঁর ভাণ্ডারে রয়েছে কয়েক হাজার বিশ্ব-কাঁপানো ব্যক্তিত্বের ছবি– বিশেষত ইন্দিরা গান্ধী, দালাই লামা এবং মাদার টেরেজার কথা মনে পড়বেই। রাই বিশ্বাস করতেন, আলোকচিত্রে প্রয়োজন ঘনিষ্ঠতা এবং নৈতিক তাগিদ। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘তুমি যদি যথেষ্ট কাছে না যাও, তোমার ছবি যথেষ্ট ভাল হবে না’– তাঁর কাজের দর্শনকে স্পষ্ট করে, যা নিমগ্ন, সহানুভূতিশীল এবং নির্ভীক। তাঁর কাজ অনায়াসে চলাফেরা করেছে তীক্ষ্ণ সাদা-কালো প্রতিবেদনধর্মী ছবির মধ্যে এবং বহুস্তরবিশিষ্ট রঙিন কম্পোজিশনের ভুবনে, সর্বদা ভারতের ‘স্পন্দন’-এর প্রতি সজাগ থেকে। বেশ কয়েকটি বিশিষ্ট সম্মানও পেয়েছেন বাংলাদেশ যুদ্ধ কভারেজের জন্য। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মশ্রী’ দিয়েছে। আর পেয়েছেন অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার– সঙ্গে দেশে-বিদেশে অজস্র চিত্রপ্রদর্শনী।

রঘু রাই কেবল ভারতের ছবি তোলেননি– তিনি ভারতকে দেখতে সাহায্য করেছেন। তাঁর ছবি জনস্মৃতিকে নির্মাণ করেছে, বিপর্যয় ও নীরব মর্যাদা– উভয়কেই দৃশ্যমান রূপ দিয়েছে। অনেকেই জানেন না রঘু রাইয়ের স্ত্রী গুরমিত কত গুণান্বিতা– তিনি রূপ, সৌম্যতা, ও সুদক্ষতার ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ভারতের সর্বোচ্চ সংরক্ষণ স্থপতিদের মধ্যে একজন। তাঁর কাজ ও দায়িত্বর মধ্যে ছিল নয়াদিল্লির লালকেল্লা ও মহারাষ্ট্রের গুহাসমূহের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন; অমৃতসর ও পুরীর ঐতিহাসিক জনবসতির জন্য নগর সংরক্ষণ পরিকল্পনা। রঘু রাইয়ের পুত্র, নীতীন রাই আলোকচিত্রী রূপে নাম করেছেন।

ভারতীয় আলোকচিত্র জগৎ হারাল শুধু একজন মহৎ শিল্পীকে নয়, বরং এমন একজন সাক্ষীকে, যাঁরর কাজ জাতির ঐতিহাসিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিল।

(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.