৩২ শ্রাবণ  ১৪২৬  রবিবার ১৮ আগস্ট ২০১৯ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

রাজদীপ সরদেশাইয়: ’৯০ সালের শুরুর দিকের এক শীত। অলস দুপুরবেলা। আমরা কয়েকজন জড়ো হয়েছি দিল্লির হুমায়ুন রোড রেসিডেন্সে ‘বহুজন সমাজবাদী পার্টি’-র প্রতিষ্ঠাতা কাঁসিরামের বাড়িতে। আমাদের জন্য চা হাতে এগিয়ে আসছেন এক তরুণী। এমন সময় কাঁসিরাম সেই তরুণীর দিকে নির্দেশ করে বললেন, ‘একদিন এই মেয়ে বাবাসাহেব আম্বেদকরের স্বপ্নপূরণ করবে!’ তাঁর নির্দেশক তর্জনীর ডগায় লেগে ছিল গর্বের গাঢ় রং।

তাঁর সেই উক্তির তালে তখন সম্মতিসূচক মাথা নাড়াব কী, কিছুক্ষণ প্রায় থ বনে চেয়ে রয়েছিলাম আমি, পরনে সালোয়ার কামিজ সেই ‘মেয়ে’-র দিকে, যিনি আমাদের ‘রাজনীতিতে জাতপাতের ভূমিকা’ সম্পর্কিত কেঠো এক আলোচনা চলাকালীন বেশিরভাগ সময় প্রায় নিশ্চুপ শ্রোতা হয়ে বসে ছিলেন। তাঁকে আজ চিনতে কোনও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। মায়াবতী তখনও রাজনীতির জাতীয় ময়দানে তেমন গৌরী নন। যদিও, এমপি হিসাবে প্রথম নির্বাচনে জিতে গিয়েছেন। আর, কিছু বছর পরেই, তিনি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে আসতে চলেছেন। তিনি হয়ে উঠছেন এমন এক রাজনীতিবিদ, যাঁকে কোনওভাবেই আর হেলাফেলা করা যাবে না।

[এক শুভ্র ঋজুতার অবসান]

গত সপ্তাহে সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব এবং ‘বিএসপি’ নেত্রীর যুগ্ম সাংবাদিক বৈঠকে ‘বহেনজি’-র সঙ্গে আমার ওই প্রথম আলাপের কথা মনে পড়ে গেল। ভারতের আগামী প্রধানমন্ত্রী উত্তরপ্রদেশ থেকেও তো হতে পারেন– এই আশার কথা বলে যখন যাদবমশাই মায়াবতীর দিকে তাকালেন যখন, কেন কাঁসিরামের সেই দূরদর্শিতার কথা মনে পড়বে না, কেনই বা অবাক হব না বলুন? তবে কি সত্যিই বহেনজি ভারতের প্রথম ‘দলিত’ প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য প্রার্থী?

একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে মনে হতে পারে, এই প্রশ্ন আষাঢ়ে চিন্তা ছাড়া আর কিচ্ছু না– বিএসপির আজ পার্লামেন্টে একখানিও এমপি আসন পড়ে নেই। তাঁর ‘উত্তরপ্রদেশ’ নামক দুর্গেই মায়াবতী পরপর তিনটে নির্বাচনেই (দু’টি বিধানসভা এবং একটি লোকসভা) পরাজিত; কিঞ্চিৎ কয়েকটি সাফল্যের স্বাদ তা-ও দুর্ঘটনার মতো তিনি পেয়েছেন– নবাগত কর্মীদের মাধ্যমে দলের বিস্তৃতি ঘটিয়ে। লক্ষ করলেই দেখা যাবে, তাঁর পর্বতপ্রমাণ ভোট অংশীদারিত্বেও খানিক চিড় ধরেছে– আগের সেই সর্বজনীন দলিত আইকনের নিরিখে তিনি আজ নিতান্তই একজন ‘সাব-কাস্ট’ যাদব নেত্রী। এমনকী, বিভিন্ন দুর্নীতি এবং অসমঞ্জস ধনসম্পত্তির দায়ে প্রায় গলা অবধি ডুবে রয়েছেন তিনি আর তাঁর পরিবার। এর সঙ্গে তাঁর রাজনীতিগত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে খামখেয়ালিপনা এবং যখন তখন সিদ্ধান্ত বদলে নেওয়ার গুণ– স্বল্পমেয়াদি সুবিধার্থে তিনি জোট ভাঙতে বা গড়তে খুব একটা বেশি সময় নেন না।

আবার অন্যদিকে, সমাজগত সক্রিয়তার দিক থেকে দেখলে মায়াবতী আজও একজন শক্তিশালী ভাবমূর্তি। উত্তরপ্রদেশের পশ্চিম প্রান্তের এক শহরে তাঁর বাবা ছিলেন একজন সাধারণ পোস্ট অফিস কর্মী। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমাজের খাঁজে খাঁজে আমরা তাকালে বুঝতে পারব, মেরুকরণের কাজে তাঁর মতো তীক্ষ্ণ ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া ভার। বহুজন সমাজের মণ্ডলীতে তিনি অনুপ্রেরণামূলক মূর্তি হলেও, উলটোদিকে দেশের উচ্চশ্রেণির, উচ্চবর্ণের মেট্রোপলিটন অভিজাতদের কাছে তাঁর দুর্বলতা ভারতীয় রাজনীতির এক অন্ধকার দিক নির্দেশ করে। ইনিই সেই নেত্রী, যিনি ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য রাষ্ট্রীয় রাজস্ব লুঠপাট করেছেন, নিজের মূর্তি বানিয়েছেন রাস্তার মোড়ে মোড়ে, ডিজাইনার ব্যাগ ও জুয়েলারি নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন কেতাদুরস্ত এবং নিজের জন্মদিনে কোনওরকম দ্বিধা ছাড়াই গর্বের সঙ্গে তিনি টাকার মালা গলিয়ে নেন গলায়। কিন্তু সমালোচনা করলেই উচ্চশ্রেণির দিকে উচ্চমার্গীয় তাচ্ছিল্যও ভেসে আসে এরকম– কই ব্রাহ্মণ-বেনিয়া রাজনীতিকদের গায়ে নির্বাচনের সময় সোনা-রুপো চড়ালে তো এমন কথা ওঠে না? শিকড়-ছেঁড়া সংস্কৃতি আর অন্তহীন আত্মপ্রচারের ঘনঘটার সময় তো তাদের কিছু বলা হয় না, যেখানে কিনা তাদের উপরেও গুরুতর দুর্নীতির দাগ রয়েছে!

যদিও মায়াবতীর কেবলমাত্র এমন যারপরনাই স্বৈরাচারী মনোভাবে দৃষ্টিনিক্ষেপ করে এড়িয়ে গেলে চলে না। তখন, তাঁর রাজনীতিবিদ হিসাবে জটিল ব্যক্তিত্বের প্রতি একতরফা নজর দেওয়া হয়ে যায়। একথাও ভুলে গেলে চলবে না, তিনি সর্বোপরি সমাজের প্রান্তিক এক জায়গা থেকে ভারতীয় রাজনীতির হৃদয় পর্যন্ত অসাধারণ এক ভ্রমণ পেরিয়ে এসেছেন। তিনবার উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আমরা দেখেছি, একজন প্রশাসকরূপে তিনি কতখানি কঠোর, দৃঢ়চিত্তের, বিশেষত আইনি ব্যাপারে। লখনউতে সরকারি আমলাদের প্রায়শই দেখা যায়, রাগে গজগজ করতে করতে তাঁরা স্বীকার করছেন– “মায়াবতী সবকো ‘টাইট’ রখতি থি!” এবং, তাঁর মাথার উপর দুর্নীতির বড়সড় খাঁড়া ঝুললেও, অন্যদিকে রয়েছে ‘কাজের মানুষ’ মুখ্যমন্ত্রীর জলজ্যান্ত ছবি–নয়ডা-আগ্রার মাঝে যমুনা এক্সপ্রেসওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ ‘ফাস্ট ট্র‌্যাক’ প্রোজেক্টের কাজে তিনি ভয়ংকর কঠোর ও তৎপর ছিলেন।

২০১৯-এ দাঁড়িয়ে যদিও, নন-কংগ্রেস কিংবা নন-বিজেপি নেতৃত্বের মুখ হিসাবে তিনি আজ আর কিছুই নন– না কোনও হিরোইক ফিগার, না সামাজিক পরিবর্তনের কোনও পালটা হাওয়া। কিন্তু, হিন্দিপ্রধান রাজ্যগুলিতে, যেখানে ‘মোদি ছাড়া আবার কে’ ব্যতীত আর কিছুই ভাবতে পারে না সেখানকার জনগণ, সেখানে মায়াবতীই হয়ে উঠতে পারেন তুরুপের তাস। ২০১৪-র নির্বাচনী ঢেউয়ে মোদির প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠায় তুরুপের তাস ছিল তাঁর ‘চাওয়ালা’ ইমেজ। ভাদনগরের কোন এক অজগাঁ থেকে উঠে এসে তাঁর চলাফেরা আজ ‘৭ লোক কল্যাণ মার্গ’-এর ঠিকানায়। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর কাহিনি নিঃসন্দেহে এমন এক ধ্রুপদী রূপকথা যেখানে, নির্গুণ গুণময় ‘কামদার’ সাম্রাজ্যবাদী ‘নামদার’-দের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পথ প্রশস্ত করলেন! রাজনীতির মহাপ্রাঙ্গণে রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে গল্পের এই তির শানাতেই, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে পীড়িত নেতার রূপ দিয়ে স্বতন্ত্র এক জায়গা করে দিয়েছিল।বিপরীতে, মায়াবতীর জীবন আমাদের দেয় আরও কঠিন এক লড়াইয়ের গাথামালা, যেখানে রয়েছে ভারতের সবচেয়ে জনবহুল এবং জটিল রাজ্য থেকে জাতি-লিঙ্গ-অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে উঠে আসার কথা। ‘গরিব দলিত কি বেটি’ হল সেই স্টোরিলাইন যা যুঝতে পাকা মাথার যে কোনও রাজনীতিকেরই কালঘাম ছুটবে।

এমন বিচ্ছিন্ন রাজনীতির সময়ে, যেখানে আজও বর্ণ স্বীকৃতি ভোটারদের পছন্দকে আকৃষ্ট করে, সেখানে ‘পিএম হবেন বহেনজি’ হয়ে উঠতে পারে দলিত এবং সেইসব সামাজিক গোষ্ঠীর এককাট্টা হয়ে ওঠার সমবেত স্লোগান, যারা বিশেষত উত্তরপ্রদেশে রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ক্রমাগত ফুঁসে ওঠা জোয়ারে প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছে! মফস্‌সল ও শহুরে মধ্যবিত্তবর্গ হয়তো তথাকথিত সামাজিকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন’ বিএসপি নেত্রীর প্রধানমন্ত্রিত্বের ধারণায় ক্রুদ্ধ হবে, তারা হয়তো নিজেদের অবহেলিত ভাবতে শুরু করবে; কিন্তু যেখানে তেমন উচ্চবর্ণের বাড়বাড়ন্ত নেই, উত্তরপ্রদেশের তেমন একটু গলিঘুঁজির দিকে ক্রমশ হেঁটে গেলেই দেখা যাবে– মায়াবতীর প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার উচ্চাকাঙ্ক্ষা হয়ে উঠছে নির্বাচনের এক্স-ফ্যাক্টর, যার রাজনৈতিক আবেদন কোনওভাবেই অস্বীকার করা যাবে না।

এই এক্স-ফ্যাক্টরই স্পষ্ট করে দেয়, কেন ২৫ বছরের যাদব-দলিত বিদ্বেষকে মাটি চাপা দেওয়ার সিদ্ধান্তে এলেন অখিলেশ যাদব এবং রাজনীতির জল কদ্দুর গড়ায় দেখার জন্য ট্রায়াল বেলুনটি ছুড়ে দিলেন হালকা করে। শীর্ষস্থানীয় নেতারা উপর উপর নজর রেখে চলেছেন। হয়তো এখনই তাঁরা তিরস্কারের কামড় বসাবেন না, তবে ‘জাতীয়’ নির্বাচনকে যেখানে পুষ্টি দেয় ‘স্থানীয়’ নির্বাচন– সেক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র বিস্মিত হবেন না, যদি দেখেন, বিএসপি’-র ‘হাতি’ লখনউ হয়ে দিল্লির রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন আকার আনতে সমাজবাদী পার্টি সমাজবাদী পার্টির সাইকেলে চড়ে সার্কাস দেখাতে শুরু করেছে। বহু বছর আগে সেই প্রথম আলাপের যে তরুণীকে আমি দেখেছিলাম– শান্ত, ছোট করে কাটা চুলের সেই তরুণীর আজ বিবর্তন ঘটেছে। তিনি এখন রীতিমতো একজন রাজনৈতিক যোদ্ধা, বড় কিছু পাওয়ার জন্য গুরুতর প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে তিনি প্রস্তুত, যা এককালে তাঁর গুরু ভবিষ্যদ্বাণী করে গিয়েছিলেন।

পুনশ্চ মায়াবতী, অনেকটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মতোই– জাঁদরেল স্বভাবের এবং প্রশ্ন পছন্দ করেন না। তা, এক বিরল উপলক্ষে আমার একবার তাঁর সাক্ষাৎকার নেওয়ার বরাত জুটেছিল। স্পষ্ট মনে পড়ে, দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন করায় তিনি কেমন আমার উপর ক্রোধে ফেটে পড়ে বলেছিলেন– “আপনারা এই মিডিয়ার লোকজন, সবক’টাই উঁচু জাতের ‘মানুওয়াদি’!” স্বীকার করতেই হবে, তিনি সম্পূর্ণ ভুল ছিলেন না। সমাজের অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই অধিকাংশ নিউজরুমের ক্ষমতা ও প্রভাবের অবস্থানগুলিতে দলিতদের জন্য স্থান খুবই নগণ্য।

[‘কংগ্রেস-মুক্ত’ ভারত ও কিছু প্রশ্ন]

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং