BREAKING NEWS

০৮ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২৯  সোমবার ২৩ মে ২০২২ 

READ IN APP

Advertisement

Advertisement

ঋষি সুনাক তৈরি, ব্রিটেন কি প্রস্তুত?

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: January 21, 2022 11:42 am|    Updated: January 21, 2022 11:42 am

Rishi Sunak is all set, is Britain ready? | Sangbad Pratidin

ব্রিটেনের ‘চ্যান্সেলর অফ দ্য এক্সচেকার’ হিসাবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ঋষি সুনাক খুবই সফল। করোনা-আবহে একাধিক প্রশংসনীয় পদক্ষেপ করেছেন। বরিস জনসনের গদি টলোমলো। পরের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীর তালিকায় ঋষি সুনাকের নাম তাই ঝকমকাচ্ছে। কিন্তু বারাক ওবামাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে আমেরিকার মানুষ যে-ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল, ব্রিটেনের মানুষ কি তা পারবে? লিখছেন সঞ্জয় দাশগুপ্ত

প্রায় ১৩০ বছর আগের একটা দিন। তাই ১৮৯২ সালের ৬ জুলাই ব্রিটেনে ঠিক কী ঘটেছিল, কেন তারিখটি ভারতীয়দেরও মনে রাখার মতো একটা দিন- হঠাৎ এই প্রশ্নগুলি করা হলে ব্রিটেনে বা ভারতে অনেক শিক্ষিত, সচেতন মানুষও হয়তো চট করে মনে করতে পারবেন না।

একটা সাধারণ নির্বাচন হয়েছিল ব্রিটেনে। ওদিন সেই নির্বাচনের ফল বেরিয়েছিল। ভোট গণনার পর দেখা গেল, লন্ডনের ফিন্সবেরি সেন্ট্রাল কেন্দ্র থেকে লিবারাল পার্টির প্রার্থী দাদাভাই নওরোজি, তঁার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে পঁাচ ভোটে হারিয়ে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। পৃথিবীর প্রাচীনতম নির্বাচিত পার্লামেন্ট হাউস অফ কমন্‌সের অলিন্দে, এক ভারতীয় রাজনীতিকের পদচিহ্ন পড়ে, সে-ই প্রথম।

দাদাভাই নওরোজি যেদিন জিতেছিলেন, তার ১২৩ বছর পরে, ২০১৫ সালে ব্রিটেনে আর-একটি সাধারণ নির্বাচন। এবারে ইয়র্কশায়ারে রিচমন্ড (ইয়র্কস) নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে কনজারভেটিভ প্রার্থী হিসাবে জয়ী হলেন ৩৫ বছরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত তরুণ ঋষি সুনাক। সাউদাম্পটন শহরে জন্ম। এদেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যশালী, অভিজাত স্কুলগুলির একটি, উইনচেস্টার কলেজে পড়াশোনা। তারপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেখান থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড। অবশ্য ভারতীয়দের কাছে আরও একটি পরিচয় আছে ঋষি সুনাকের। তাঁর স্ত্রী অক্ষতা, ভারতের বিখ্যাত প্রযুক্তি সংস্থা ইনফোসিসের প্রতিষ্ঠাতা নারায়ণ মূর্তির কন্যা।

[আরও পড়ুন: অখিলেশ পারেন, রাহুল পারেন না! কেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এড়িয়ে চলতে চাইছে কংগ্রেস?]

দাদাভাই নওরোজি এবং ঋষি সুনাকের মাঝে আর কি ভারতীয় বংশোদ্ভূত কেউ পার্লামেন্টে নির্বাচিত হননি? হয়েছেন তো! ১৮৯৫ সালে কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী মানছেড়জি মেরওয়ানজি ভাওনাগ্রি, ১৯২২ সালে লেবার পার্টির সাপুরজি সাকলাতওয়ালা, ১৯৮৭ সাল থেকে লেস্টার ইস্ট নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে জিতে আসছেন লেবার পার্টির কিথ ভাজ। গত নির্বাচনে তো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জিতে এসেছেন ৬৫ জন অ-শ্বেতাঙ্গ এমপি। বরিস জনসনের মন্ত্রিসভায় ঋষি সুনাকের সতীর্থ প্রীতি প্যাটেল বা সাজিদ জাভেদ বা লেবার পার্টির উজ্জ্বল মুখ লিসা নন্দীর মতো এঁরা অনেকেই ভারতীয় বা পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত। কিন্তু ঋষি সুনাক প্রত্যেকের চেয়ে আলাদা।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ব্রিটেনের অর্থমন্ত্রী- এদেশের ভাষায় ‘চ্যান্সেলর অফ দ্য এক্সচেকার’ রূপে প্রধানমন্ত্রীর পরই দেশের সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদটি তঁার দখলে। স্বাভাবিকভাবেই মিডিয়া-মুখর রাজনীতির জগতে এখন তাঁর পরিচিতি- মিডিয়ার ভাষায় ‘প্রোফাইল’- তুঙ্গে। এবং চর্চিত উপস্থিতির সেই ছবিটায় রং লাগিয়েছে কোভিড-আকীর্ণ গত দু’টি বছরের দেশের অর্থমন্ত্রী হিসাবে ঋষি সুনাকের সফল ও প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগ।

লকডাউনের নিশ্ছিদ্র নিষেধাজ্ঞায় যখন ব্রিটেনের জনজীবন স্তব্ধ, সেই সংকটের মুহূর্তে সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞ, তরুণ অর্থমন্ত্রীর ৩৩ হাজার কোটি পাউন্ডের সরকারি সাহায্যের ঘোষণা অনেকের নজর কেড়েছিল। ‘ফার্লো স্কিম’- লকডাউনের ফলে যেসব ব্যবসা-বাণিজ্যের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হতে বসেছে, সেই প্রতিষ্ঠানগুলি যাতে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য না হয়, সেজন্য নতুন অর্থমন্ত্রী ঘোষণা করেন কর্মীদের বেতনের ৮০ শতাংশই দিয়ে দেবে সরকার। মাস আড়াই হাজার পাউন্ড অবধি এক-একজন কর্মীর বেতনে ভরতুকি দেবে। প্রথমে তিনমাসের মেয়াদে চালু করা এই প্রকল্পটি এতটাই জনপ্রিয় হয় এবং করোনা-বিধ্বস্ত ব্রিটিশ অর্থনীতিতে এর এতটাই প্রয়োজনীয়তা ছিল যে, বারবার মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে প্রকল্পটি জারি থাকে মোট আঠারো মাস- ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

এখানেই ফুরিয়ে যায়নি নতুন অর্থমন্ত্রীর সাহায্যের ঝাঁপি। ‘ফার্লো স্কিম’-এর চারমাস পরেই এসেছিল আরও তিন হাজার কোটি পাউন্ডের প্রকল্প, যার মধ্যে ছিল অভিনব একটি চমক। ‘ইট আউট টু হেল্প আউট’ প্রকল্প। লকডাউনের দরুন তো হোটেল, রেস্তরাঁ, পাবগুলি ধুঁকছে। তাদের উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করার জন্য যাঁরা রেস্তেরাঁ খেতে আসবেন, তাঁদের খাদ্য এবং সুরা-বর্জিত পানীয় বা সফ্‌ট ড্রিংকসের বিলের অর্ধেক, অথবা ক্রেতাপিছু সর্বাধিক দশ পাউন্ড অবধি ভরতুকি দেবে সরকার, সপ্তাহের তিনদিন- সোম,
মঙ্গল, বুধ।

দেশের অর্থমন্ত্রী যদি ‘কল্পতরু’ হন, বিশেষত সংকটের মুহূর্তে, তিনি তো জনপ্রিয় হতে বাধ্য। অনেক পর্যবেক্ষকেরই মত, ঋষি সুনাকের এসব প্রকল্প তাৎক্ষণিক জনপ্রিয়তা কেনার অপরিণামদর্শী রাজনীতি আদৌ নয়, দেশের নিদারুণ সংকটের মুহূর্তে জনদরদি, বুদ্ধিমান এক অর্থমন্ত্রীর প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। আর-একদলের অবশ্য বক্তব্য, এই বিপুল অর্থভারের বকেয়া মেটাতে হবে একদিন এই অর্থমন্ত্রীকেই। দু’-হাতে খরচ করার পর, এবারে জনসাধারণের উপর, ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর করের বোঝা, শুল্কর বোঝা বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই তাঁর।

ঠিক এইখানেই ঋষি সুনাক রক্ষণশীল দলের ছাঁচে ঢালা রাজনীতিকদের মাঝে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। মার্গারেট থ্যাচারের আমল থেকেই ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টি কর হ্রাস করা এবং দেশের অর্থনীতিতে সরকারের হস্তক্ষেপ সীমিত করায় বিশ্বাসী। করোনা সংকটের মুহূর্তে ব্যতিক্রমী হওয়ার রাজনৈতিক সাহস দেখিয়েছেন ঋষি সুনাক- অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের প্রচ্ছন্ন মদতপুষ্ট হয়ে। উদারহস্ত জনপ্রিয়তার রাজনীতির প্রথম এবং প্রধান প্রতিভূ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন-ই। তাঁর সমর্থন ছাড়া ঋষি সুনাকের এ-পথে হাঁটা সম্ভব হত না।

কিন্তু বরিস জনসন এখন প্রবল রাজনৈতিক সংকটে। করোনা নিষেধাজ্ঞা যখন মেনে চলেছে সারা দেশ, সেই সময় নিজেদের আনা বিধি-নিষেধগুলি উপেক্ষা করে একের পর এক পার্টির আয়োজন করে নিজেদের মধ্যে আমোদ-প্রমোদে রত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বেশ কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা- এই খবর বেরনোর পর এখন বরিস জনসনের আসন টলোমলো।

স্বভাবতই কাগজেপত্রে জল্পনা শুরু হয়েছে সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের নিয়ে। সেই তালিকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস, আবাসন মন্ত্রী এবং জনসন মন্ত্রিসভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, মাইকেল গোভ, বিশিষ্ট নেতা এবং প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ এঁদের নামই রয়েছে। কিন্তু এদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষদের একটা বিরাট অংশ একমত- পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড় যদি শুরু হয়, তাহলে সেই দৌড়ে যিনি জিততে চান, তাঁর মূল প্রতিদ্বন্দ্বী একজনই- ঋষি সুনাক। কোনও কোনও পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেলে তো পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিজ ট্রাস এবং অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাকের মধ্যে ‘ঠান্ডা লড়াই’-এর জল্পনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে।

আর ঠিক এইখানেই প্রশ্নটা। ঋষি সুনাককে প্রধানমন্ত্রী হতে গেলে, কনজারভেটিভ পার্টির সাধারণ সদস্যদের মধ্যে ভোটে জিততে হবে। এই দলের সদস্যদের একটা বিরাট অংশ ছড়িয়ে আছেন ব্রিটেনের গ্রামে গ্রামে। ছোট শহরে। শহুরে কনজারভেটিভদের থেকে তাঁদের পছন্দ-অপছন্দ অন্যরকম। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের রাজনৈতিক চেতনা স্থানীয় রাজনীতির পরিসরেই বাঁধা। একটা কথা এখানে সরাসরি বলে রাখা ভাল। একুশ শতকের ব্রিটেন কিন্তু কখনওই বর্ণবৈষম্যের দেশ নয়। এই লেখা শুরু করেছিলাম দাদাভাই নওরোজি, মানছেড়জি ভাওনাগ্রিদের নিয়ে। সেই উনিশ শতকের শেষভাগ থেকেই ব্রিটেনের ভোটাররা অ-শ্বেতাঙ্গ প্রার্থীদের হাউস অফ কমন্‌সে পাঠিয়েছেন, একজন-দু’জন করে হলেও। বর্তমান পার্লামেন্টের ১০ শতাংশ এমপি অ-শ্বেতাঙ্গ। ফ্রান্সের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সেই সংখ্যাটি ৬ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় সংসদে ৪.১ শতাংশ। এমনকী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টেও মাত্র ৫ শতাংশ সদস্য সংখ্যালঘু বর্ণ বা সম্প্রদায়ের। এদেশে বসবাস করার ২৭ বছরের অভিজ্ঞতায় বলতে পারি, সাধারণ নাগরিক হিসাবে কোনও ধরনের প্রকট বর্ণবৈষম্যের শিকার হইনি কখনওই। সরকারি কোনও দফতরে তো প্রশ্নই ওঠে না। এই মুহূর্তে ব্রিটেনের নাগরিক এবং লন্ডনের একটি উপকণ্ঠের বাসিন্দা হিসাবে আমার শহরের নির্বাচিত মেয়র লেবার পার্টির সাদিক খান। দেশের অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল। শিক্ষামন্ত্রী নাদিম জাওয়াহি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ।

এতসব কথার পরেও একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। একটু এদেশের সীমানার বাইরে তাকানো যাক। অর্ধ শতকেরও আগে সাম্রাজ্য হারিয়েছে ব্রিটেন। এতদিন পরেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ঠিক যেন নিজের ভূমিকাটি খুঁজে পায়নি। সুইডেন, ডেনমার্ক বা অস্ট্রেলিয়ার মতো অর্থনৈতিক বৃহৎশক্তি, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষুদ্রশক্তি হতে ব্রিটেন রাজি নয়। আবার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চিন বা রাশিয়ার মতো বড় বাঘ হওয়ার ক্ষমতা আর নেই। যদিও দেশের জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে- স্কুলের প্রধানশিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, আইনজীবী, বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিবিদ, ব্যাঙ্ক এবং অর্থলগ্নি সংস্থাগুলির সর্বোচ্চ মহলে এখন ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি।

[আরও পড়ুন: সংযুক্তি ও বিভাজনের চিত্রনাট্য]

কিন্তু তা-ও ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাড়ি- ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনটি- প্রত্যন্ত প্রাঙ্গণ। ঋষি সুনাক হয়তো সেই ঠিকানায় যেতে প্রস্তুত। বড় বড় শহরের বুদ্ধিজীবী, সফল পেশাদার, শিক্ষিত মধ্যবিত্তদেরও হয়তো অনেকের তাতে সম্মতি আছে। কিন্তু বড় শহরের আলোকবর্তিকার বাইরের গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষ- যেখানে ছড়িয়েছিটিয়ে আছেন ঋষি সুনাকের নিজের দলের সাধারণ সদস্যরা- সেখানে?

বারাক ওবামাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। অতলান্তিক সমুদ্রের এই পারে, ঋষি সুনাক হয়তো সেই সমাজবিপ্লবের উত্তরসূরি হতে প্রস্তুত। ব্রিটেন প্রস্তুত কি?

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে