৬ ফাল্গুন  ১৪২৬  বুধবার ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও বাঁকা কথা ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

কিংশুক প্রামাণিক: ‘সান্তাবুড়ো কী করে জানতে পারল আমার কী কী চাই?’

ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে দরজায় টাঙানো মোজার মধ্যে প্রিয় রং-পেনসিল, নেলপালিশ, চকোলেট দেখে আত্মহারা আমার শিশুকন্যা একবার এই প্রশ্নটি করেছিল। বিস্ময়ের চোখ তার এই কারণে যে, ২৪ ডিসেম্বর রাতে যা যা চেয়ে সে ঘুমোতে গিয়েছিল, বড়দিনের ভোরে তা-ই তাকে উপহার দিয়েছে সান্তা ক্লজ।
আচমকা একগাদা গিফট পেয়ে একবারও সেই শিশুর মনে হয়নি, এমন অলৌকিক কাণ্ড আবার হয় নাকি! বাড়িতে বাবা আছে, মা আছে, ঠাকুমা, জেজে আছে। তারাও তো গিফট কিনে ভরে দিতে পারে মোজা দু’টিতে। সান্তা বলে সত্যিই কেউ আছে নাকি যে আসবে?

মনে হয়নি। মনে হয়নি এই কারণে যে, ততদিনে সাহেব সান্তার নিশ্চিন্ত অনুপ্রবেশ ঘটে গিয়েছে বঙ্গসমাজে। ক্রমে ক্রমে সান্তা অর্জন করেছে বিশ্বাস এবং ভালবাসা। ২৫ ডিসেম্বর তাই শুধু লন্ডনের বিগ বেন নয়; সান্তাবুড়ো ঝুলি নিয়ে হাজির কোচবিহার থেকে কলকাতা, বসিরহাট থেকে মেদিনীপুরের গ্রামেও। ভোজবাজি দেখিয়ে শিশুদের কাছে সে ‘জাদুকর পি সি সরকার’। নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদা, বাটুল দি গ্রেট, ঠাকুমা’র ঝুলির বাংলায় আরও এক শিশুবন্ধু হাজির। নাম তার: সান্তা ক্লজ। লাল টুকটুকে পোশাক, সাদা দাড়ি—গোঁফের সান্তা বৃদ্ধ হলেও বড়দিন উৎসবের আসল যৌবন যেন সে-ই। এই সান্তা সবার। সম্প্রীতির মহানায়ক।

[আরও পড়ুন: রাম মন্দির তো হল, এবার কি তালিকায় কাশী-মথুরা?]

সান্তার এই বিপুল জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়েই। ক্রিসমাস এলেই সান্তা আসে। সবাই তার পরশ পেতে চায়। মজার কথা হল, সান্তা যে খ্রিস্টান– সেটা অবশ্য কারও মাথায় থাকে না। শিশুরা কখনও জানতে চায়নি সান্তার ধর্ম কী। ভেদাভেদের বিষে আহত আমাদের দেশেও সান্তার আগমন নিয়েও কারও প্রশ্ন নেই। কেউ জিজ্ঞেস করে না– সান্তা কেন হিন্দু নয়, কেন নয় মুসলমান।

সান্তার (যদিও বাঙালিদের উচ্চারণ ‘শান্তা’) প্রতি এ যুগের শিশুদের এই অগাধ বিশ্বাস অবশ্য আমাদের ছেলেবেলায় ছিল না। আমাদের বড়দিন মানে ছিল বার্ষিক পরীক্ষা শেষ, ছুটি শুরু। দে ছুট মামার বাড়ি, নইলে দার্জিলিং। বড়দিনের বিকেলে গির্জায় ঢু মারা ছিল অভ্যাস। তখন মনেও হত না, আমার ধর্ম হিন্দু। সেদিন সান্তা ক্লজকে চিনতামই না সেভাবে! বরং তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতাম খড়ের গাদায় ফুটফুটে সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুটির দিকে। মাদার মেরির কোলে হাসছে স্বয়ং যিশু। মাটির মূর্তি, অথচ কী জীবন্ত! সবাই বলত, আজই নাকি যিশুর জন্ম হয়েছিল।

আজও সেই ২৫ ডিসেম্বর। পরে জেনেছি, এদিনই প্রভু যিশুর জন্মদিন– এমন কোনও প্রমাণ নেই। এমনকী, বাইবেলেও কিছু বলা নেই। এটা একটা ধারণা মাত্র। তাই বলে যিশুর নাগরিকত্ব নিয়ে হইচই হতে পারে না। বরং এ কথা সবাই বিশ্বাস করে, কুমারী মরিয়মের কোলে প্রভু যিশু এসেছিলেন ‘ঈশ্বরের বরপুত্র’ হয়ে। এই জগৎকে মুক্তির পথ দেখাতে যেমন যুগপুরুষরা বিভিন্ন ধর্মের বাণী নিয়ে এসেছেন যুগে যুগে, ‘জেসাস ক্রাইস্ট’-ও তেমন এক ঈশ্বরপ্রেরিত মহামানব। মানুষের বিশ্বাসে সেই পুরুষোত্তমের জন্ম যদি হয় ২৫ ডিসেম্বর, তা হলে সেটাই সত্যি।

এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠে না। তাঁর জন্মের প্রমাণ দেখাতে কোনও নথিপত্রের দরকার নেই। ভাগ্যিস জেরুজালেমে কোনও এনআরসি অথবা নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের প্রশ্ন ওঠেনি! কেউ বলেনি ডিটেনশন ক্যাম্পের কথা! যদিও ঘোড়ার আস্তাবলে যাঁর জন্ম, তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পের গল্প শুনিয়ে কী হবে?

ভগবান শ্রীরামচন্দ্র অযোধ্যায় জন্মেছিলেন। এটাই আমাদের বিশ্বাস। রামায়ণ তাই বলে। এ-ও মানুষের বিশ্বাস, যেখানে বাবরি মসজিদ ছিল, সেটাই ছিল রামের জন্মস্থান। কার্যত এ কথা সুপ্রিম কোর্ট বলে দেওয়ার পর রাম জন্মভূমি-বাবরি মসজিদ মামলার দীর্ঘদিন পর নিষ্পত্তি হয়েছে। ভাল হয়েছে। সবাই সেটা মেনেও নিয়েছে।

রাম তিনি রামই। হজরত মহম্মদ যেমন আল্লা-প্রেরিত শেষ নবি, তেমনই রামও ঈশ্বরের প্রতিনিধি। এঁরা যেহেতু মহামানব, সেই জন্য এঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। যত দায় সাধারণ মানুষের। তাদের প্রমাণ করতেই হবে এই দেশেই সে জন্মেছে, এখানেই মরছে। চোদ্দোগুষ্টির পঞ্জি হাতড়াতে হচ্ছে ‘আমি ভারতীয়’ বোঝাতে।

যিশুর আবির্ভাবের সঙ্গে অবশ্য সান্তাবুড়োর আগমনের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু বড়দিনের সঙ্গে সান্তা জড়িয়ে গিয়েছে তার শীতকালীন উপস্থিতিতে। উৎসবের প্যাকেজ পরিপূর্ণ। চৈত্রমাসে গ্রামবাংলার পথেঘাটে শিব, কালীবেশে যুবকদের দেখা যায়। সেই গাজন উৎসবের পর আসে বাংলা নববর্ষ। ঠিক তেমনভাবেই
সান্তাবুড়ো ঝুলি নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজি নতুন বছর বরণের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় ২৫ ডিসেম্বর থেকে।

লাল পোশাকে একমুখ সাদা দাড়ি-গোঁফের সান্তাকে চিনতে কোনও অসুবিধা হয় না। নিজের সাজেই সান্তা নির্বিকল্প। সাহেবরা বিশ্বাস করে, শুধু ঝুলি থেকে উপহার উজাড় করে দেওয়া নয়, লোকনাথবাবার মতো রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে বিপদে পড়লে সান্তা ক্লজ মানুষকে রক্ষা করে। তাকে নিয়ে অনেক অলৌকিক লোকগাথা আছে। শুনলে শিউরে উঠতে হবে।

মনে হয়, আমাদের এমন একজন সান্তা ক্লজ এলে বেশ ভাল হত, যে ভারতবাসীকে বিপদে-আপদে রক্ষা করবে। এক লহমায় বদলে দেবে সমাজটাকে। যার ঝুলি থেকে বেরিয়ে আসবে সমাজকে রক্ষার একের পর এক উপহার। এমন এক সমাজ যেখানে ধর্মের নামে, জাতের নামে অত্যাচার থাকবে না। দাঙ্গার আগুনে ভোটের অঙ্ক নির্ধারিত হবে না। লালসায় ক্ষতবিক্ষত হতে হবে না নির্ভয়াদের। সাধারণ মানুষকে বাজারে যাওয়ার আগে ভাবতে হবে না পিঁয়াজের দাম কত। বাস্তুচ্যুত হয়ে এসে নতুন ঘর বেঁধেও ভাবতে হবে না আমার নাগরিকত্ব থাকবে কি না?

শাসক বলছে, এখন নাকি দারুণ দিন এসে গিয়েছে। মানুষ খুব সুখে আছে। শাসক তার রাজনীতির কথা বলছে। মানুষ বলছে অন্য কথা। মানুষ দেখছে, দেশের পরিস্থিতি আজ অস্থির। গণতন্ত্র আক্রান্ত। শুধু ধর্মীয় বিভাজন অথবা জাতপাতের বৈষম্য নয়, সব ক্ষেত্রেই চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা। দেশের অর্থনীতির হাল খারাপ হতেই সামাজিক রক্ষাকবচগুলি একে একে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ জানে না কাল কী হবে। তারা খুব অসহায়। শিক্ষার কদর নেই। শিক্ষান্তে কাজের গ্যারান্টি নেই। চাকরি করলেও ভয়– কবে চাকরি চলে যাবে! ব্যবসা করলেও কবে তা লাটে উঠবে কেউ জানে না। ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা আদৌ পাওয়া যাবে তো? স্বল্প সঞ্চয় গরিব মধ্যবিত্তের সব। কিন্তু সেই পুঁজির নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ। এই নেই-নেই—এর মধ্যে প্রতিবাদী হলে বিপদ। কার উপর কী আক্রোশ নেমে আসবে কেউ জানে না! দাদাগিরি, পার্টিবাজি, কাটমানির সমাজে নিজেকে মানাতে না পারলেও গেল! মেরুদণ্ড সোজা রেখে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ হওয়াটাই জরুরি। যত প্রতিবাদ হবে তত মঙ্গল।

কিন্তু হয় কই? এই সময় সান্তাবুড়োটাকে হাতের মধ্যে যদি পাওয়া যায় কেমন হবে? ঝুলি উজাড় করে উপহার দেবে সান্তা। ওর তো দানের শেষ নেই। সবার জন্য ওর ঝুলি। অামরা চাইব, এমন এক সমাজ যেখানে খিদে থাকবে না। ক্রোধ থাকবে না। লোভ থাকবে না। থাকবে না কোনও বিভাজন। সমান অধিকারের এক সমাজ চাই। আসুন আজ স্বপ্ন দেখি, আর কেক কাটি। স্বপ্ন দেখতে এখনও ট্যাক্স বসেনি। যেমন বসেনি সান্তাকে ভালবাসতে। যদিও যে কোনও দিন শুনতেই পারি–কে সান্তা? ও তো খ্রিস্টান! তফাত যাও!

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং