Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • বৃহস্পতিবার
  • ৪ জুন ২০২৬
US-Iran Relation

ইরানে স্বৈরতন্ত্র সামলাতে মার্কিন দাদাগিরি, কী লাভ হল এই অপারেশনে?

দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ‘আইকন’ ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি এই সেদিন পর্যন্ত ৮টি ‘যুদ্ধ থামানো’-র দাবি করছিলেন, এবং সেজন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারও চেয়েছিলেন– বিশ্বকে ঠিক কোন জায়গায় এনে দাঁড় করালেন?

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৬, ২১:৩৬

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: মার্চ ৩, ২০২৬, ২১:৩৬

options
link
ইরানে স্বৈরতন্ত্র সামলাতে মার্কিন দাদাগিরি, কী লাভ হল এই অপারেশনে? zoom

আয়াতোল্লা আলি খামেনেই যে স্বৈরশাসন চালাতেন, তাঁর মত ও পথকে অস্বীকার করলে যে, ইরানে অন্য মত ও পথের কদর হত না, তা পরীক্ষিত সত্য। কিন্তু যেভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল সম্মিলিতভাবে তাঁকে হত্যা করল, তার নিন্দায় মুসলিম বিশ্ব মুখর। এ লেখা ছাপতে যাওয়া অবধি ইরান কিন্তু আক্রমণে যেতে পিছু হটেনি। কতখানি রাজনৈতিক লাভ হল এই অপারেশনে? লিখছেন সুমন ভট্টাচার্য

কঠোর হস্তে ইরানকে যিনি শাসন করেছিলেন প্রায় চার দশক ধরে, যঁার মৃত্যুর পর তোলপাড় পশ্চিম এশিয়া, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের শত বোমাবর্ষণেও যে-তেহরান এখনও মাথা নত করতে রাজি নয়– সেই মানুষটির দেশকে চেনা সত্যিই কঠিন! আয়াতোল্লা আলি খামেনেই ব্যতীত ইরানের আর যে-নামটি আমাদের কাছে সবচেয়ে পরিচিত, গত শতকের আটের দশকে, কলকাতাকে মুগ্ধ করে যাওয়া পারস্যের সেই স্ট্রাইকারের নাম– মজিদ বাসকার। ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন– মজিদ এসেছিলেন ইরানের খোররামশাহর থেকে।

Advertisement

ইতিহাস বলে, দীর্ঘ দিন ধরে চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধে মজিদের শহর খোররামশাহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কারুন নদীর তীরের সেই শহর আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় ইরানের হার না-মানা মনোভাবকে সঙ্গী করে। জেনে রাখা ভাল, ইরানের হাতে থাকা এই মুহূর্তের সবচেয়ে সাংঘাতিক ক্ষেপণাস্ত্রের নামও ‘খোররামশাহর ৪’। আর, ইরান যে ক্ষেপণাস্ত্রবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত, তা পশ্চিম এশিয়ায় (সংযুক্ত আরব আমিরশাহির দুবাই থেকে কাতারের দোহা) একের পর এক মার্কিন সেনাঘঁাটিতে হামলা চালিয়ে তেহরান তা দিব্যি প্রমাণ করে দিয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় তপন সিংহর সেই আইকনিক ছবি ‘আপনজন’-এর ‘ছেনো গুন্ডা’-র মতো করে পৃথিবীকে নিজের কবজায় রাখতে চাইছেন। লাতিন আমেরিকার ভেনেজুয়েলা থেকে মাদুরোকে তুলে আনার পরে, এবারে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে উড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাতে কি হোয়াইট হাউসের বর্তমান অধিপতির খুব রাজনৈতিক সুবিধা হল?

বোধহয় না। কারণ, এশিয়ায় যে-দেশটি এখন ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় বন্ধু, সেই পাকিস্তানেও এমন মার্কিন-বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে যে, করাচিতে আমেরিকার দূতাবাসের উপর বিক্ষোভকারীদের হামলা ঠেকাতে গুলি চালানো হলে ২০ জনের মৃত্যু হয়। এমনিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য ‘দরাজ দিল’ ইসলামাবাদ প্রশাসনও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামত কোন দিকে বুঝে খোমেইনি হত্যার তীব্র নিন্দা করেছে।

ট্রাম্প খেয়ালখুশি মতো শাসন ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে আপন ‘নিয়ন্ত্রণ’ কায়েম করতে চাইছেন।

দক্ষিণপন্থী রাজনীতির ‘আইকন’ ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি এই সেদিন পর্যন্ত ৮টি ‘যুদ্ধ থামানো’-র দাবি করছিলেন, এবং সেজন্য নোবেল শান্তি পুরস্কারও চেয়েছিলেন– বিশ্বকে ঠিক কোন জায়গায় এনে দঁাড় করালেন? মার্কিন মুলুকের সবচেয়ে বড় সংবাদপত্র এবং ইজরায়েলের প্রবল সমর্থক বলে পরিচিত ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পর্যন্ত দেখলাম, সোমবার সকালে বিরাট উত্তর সম্পাদকীয় ছেপেছে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান আক্রমণ আমেরিকার জন্য কতটা নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাড়িয়ে দিল! ইরান বুঝিয়েই দিয়েছে, যে-‘খেলা’ ওয়াশিংটন ও তেল আভিভ শুরু করেছে, সেই রণাঙ্গনে ট্রাম্প কিংবা নেতানিয়াহু যেহেতু কোনও ‘রুল বুক’ মানেননি, তাই তাদেরও কোনও নিয়মনীতি মেনে খেলার দায় নেই। কুয়েতের মার্কিন দূতাবাস ইতিমধ্যে আক্রান্ত। এরপরে বিশ্বের অন্যত্র তেহরান ছেড়ে কথা বলবে, এমন লক্ষ্মণরেখা
তারা টেনে রাখেনি!

১৯৭৯ সালে ইরানে ‘ইসলামিক বিপ্লব’-এর পর থেকেই দেশটি কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলে গিয়েছিল। ইরান কতটা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল, তা বোঝার জন্য শুধুমাত্র হলিউডের প্রায় ‘প্রোপাগান্ডা’ সিনেমা বেন অ্যাফ্লেকের ‘আর্গো’ দেখলে হবে না। সে-দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীদের, কবিদের সংকটের কথা মনে রাখতে হবে। খামেনেই একদা স্বয়ং ‘কবি’ হতে চাইলেও ইরান নিয়ম করে বিদ্রোহী ও প্রতিবাদী কবিদের জেলে পাঠিয়েছে, কখনও কখনও মৃত্যুদণ্ডও দিয়েছে। ফতোয়ার জেরে সলমন রুশদির উপর হামলার ঘটনাই-বা বিশ্ব ভুলে যাবে কী করে!

ইতিহাস বলে, দীর্ঘ দিন ধরে চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধে মজিদের শহর খোররামশাহর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কারুন নদীর তীরের সেই শহর আবার মাথা তুলে দাঁড়ায় ইরানের হার না-মানা মনোভাবকে সঙ্গী করে।

কিংবা গোলশিফতেহ ফারহানি-র কথা ধরুন, যিনি ইরানি অভিনেত্রী রূপে হলিউডে জায়গা করে নিয়েছেন, ১৯৭৯ সালের পরে পারস্য দেশের প্রথম নায়িকা হিসাবে হলিউডের সুপারস্টার লিওনার্দো ডিকাপ্রিও-র বিপরীতে ‘বডি অফ লাইজ’ (২০০৮) ছবিতে অভিনয় করে বিশ্বকে চমকেও দেন। গোলশিফতেহকেও তো শেষ পর্যন্ত ইরান ছেড়ে পালাতে হয়েছিল!
আবারও বলি, ইতিহাসের কী অদ্ভুত সমাপতন দেখুন, গোলশিফতেহ ফারহানির ইরানে করা শেষ সিনেমা ‘অ্যাবাউট এলি’, আসগর ফারহাদির যে-সিনেমা পরে বার্লিনের ‘স্বর্ণভালুক’ পাবে, তা কোনও দিন দিনের আলোই দেখতে পেত না, যদি না সেই সময়ের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ উদ্যোগী হয়ে ছাড়পত্র দিতেন।

এজন্যই বলছিলাম, ইরানকে বোঝা মুশকিল, কারণ, যে আহমেদিনেজাদ ২০০৫ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত সে-দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, জনপ্রিয়তার জন্য এক সময় মুসলিম বিশ্বে যঁার সঙ্গে টেক্কা দেওয়া মুশকিল ছিল, সেই নীল চোখের রাজনীতিক যখন খামেনেইয়ের অনুগ্রহ হারালেন, তখন এমনই অবস্থা হল যে, শীর্ষ নেতা এবং তঁার অঙ্গুলিহেলনে চলা ‘সুপ্রিম কাউন্সিল’ পরের তিনবারই আর তঁাকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়ার অনুমতিই দিল না। গোলশিফতেহ ফারহানি ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের পরিণতি দেখলে
বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না– কেন ইরানে হিজাবের বিরুদ্ধে আন্দোলন হলে, বা গণতন্ত্রের দাবিতে মানুষ রাস্তায় নামলে, সেগুলোকে কঠোর হাতে দমন করা হয়!

রঙের খেলা দোল যখন সমাগত, রক্তের যে-হোলি পশ্চিম এশিয়ায় চলছে, তাতে আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কী কী কারণ আছে? প্রথম কারণ অবশ্যই– ইজরায়েলের দিকে নরেন্দ্র মোদির সরকার যতই ঝুঁকে থাকুক, ইরানের পরিস্থিতি ঘোলাটে হলে, নয়াদিল্লির রক্তচাপ বাড়বে। কারণ, সোনিয়া গান্ধী এর আগে চিঠি লিখে যেটা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, সেই ‘পারস্য কাল’ থেকে ইরান শুধু আমাদের বন্ধু-রাষ্ট্র নয়, তেল কেনার ক্ষেত্রে আমাদের দীর্ঘ দিনের ‘পরীক্ষিত সহযোগী’। ইরানে বিনিয়োগ করে চাবাহার বন্দর তৈরি করেছে ভারত, যা চিনের প্রভাব এড়িয়ে পশ্চিম এশিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের পণ্য রফতানির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

ইতিমধ্যেই ইরানে হামলা, হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ যাতায়াতের ক্ষেত্রে অসুবিধা, তেহরানের পালটা মিসাইল আক্রমণে পশ্চিম এশিয়ায় যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ বোধহয় ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে একের পর এক দেশে খেয়ালখুশি মতো শাসন ব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলে দিয়ে আপন ‘নিয়ন্ত্রণ’ কায়েম করতে চাইছেন– প্রথমে বাংলাদেশ, তারপর ভেনেজুয়েলা, তারপরে ইরান– তাতে যদি আমরা শুধুমাত্র আমেরিকার ‘চিয়ারলিডার’ হয়ে থেকে যাই, বিশ্ব যদি এরকমই ‘ইউনিপোলার’ হয়ে যায়– তবে কোনও দিন আমরাই নিশানা হয়ে যাব না তো?

(মতামত নিজস্ব)
লেখক সাংবাদিক
[email protected]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.