১ জ্যৈষ্ঠ  ১৪২৮  রবিবার ১৬ মে ২০২১ 

READ IN APP

Advertisement

সম্পাদকীয়: বঙ্গে বিজেপি বাড়ল কীভাবে?

Published by: Monishankar Choudhury |    Posted: May 1, 2021 3:43 pm|    Updated: May 1, 2021 3:43 pm

West Bengal assembly polls: The rise of BJP on Bengal | Sangbad Pratidin

ছবি: প্রতীকী

জয়ন্ত ঘোষাল: মহাভারতের যুদ্ধ আঠারো দিন হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের কুরুক্ষেত্র, আট দফার ভোট প্রায় দু’মাস ধরে হল। তবে এখন ভোটপর্ব সমাপ্ত। ভোটে কী হবে, আর কী হবে না- তা নিশ্চিত জানার জন্য আমাদের রবিবার দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু তার আগে আজ আপনাদের সঙ্গে কিছু অপ্রিয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করার লোভ সামলাতে পারছি না। মনে হচ্ছে, এই আলোচনাটা করা প্রয়োজন। প্রশ্নটা হল, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এত রমরমা কেন হল? কীভাবে হল?

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: অভিষেকের শাপে বর]

শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, বামপন্থী এবং কংগ্রেস- এই তিনটি অ-বিজেপি শিবিরেরই বক্তব্য, বিজেপি এক ঘোরতর সাম্প্রদায়িক দল। সেই সাম্প্রদায়িক দলকে নির্বাচন কমিশনের স্বীকৃতি দেওয়াই উচিত নয়! এমন কথা অতীতেও বলা হত। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বিজেপিকে স্বীকৃতি দেয়, সেই দল গোটা দেশের একটা বিপুল অংশের মানুষের ভোট পায়। অটলবিহারী বাজপেয়ী নেতৃত্বে জোট-সরকার তৈরি করেছিল। নরেন্দ্র মোদি এককভাবে বিজেপিকে ক্ষমতার মসনদে বসিয়েছেন। সুতরাং আমি-আপনি সাম্প্রদায়িক বললেও ভোট প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশন কিন্তু বিজেপিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেনি।

জাতীয় রাজনীতির আলোচনা আমার আজকের উপজীব‍্য নয়। আমার একটাই প্রশ্ন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শ্রীবৃদ্ধির কারণ কী? পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির একজনও বিধায়ক ছিল না। আজ বিজেপির ৩ জন বিধায়ক। শতকরা ভোট ক্রমশ বাড়ছে! লোকসভা নির্বাচনে ২০১৯ সালে বিজেপি ১৮টা আসন লাভ করেছে। পঞ্চায়েত এবং পুরসভা-স্তরে, অল্প হলেও, বিজেপি তার অস্তিত্ব কিছুটা ধীর গতিতে প্রতিষ্ঠা করেছে।

বিজেপি ক্ষমতায় আসবে কি আসবে না- সেটা ভিন্ন প্রশ্ন। আসা উচিত কি না, সেটাও ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু বিজেপি যে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে রাজনৈতিক দল হিসাবে ‘অ্যাচিভার’- এ ব‍্যাপারে কি আপনি কোনও ভিন্ন মত পোষণ করতে পারেন? শ‍্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘জন সংঘ’-র প্রতিষ্ঠাতা। তারপর ‘জন সংঘ’ থেকে বিজেপির রূপান্তর। ১৯৮৪ সালে সাংবাদিকতায় আসার পর, দিল্লিতে এসে, ১৯৮৭ সাল থেকে বিজেপি দলটাকে কভার করছি। সুতরাং, বিজেপিকে বাইরে থেকে নয়, অনেকটা ভিতর থেকে দেখেছি। একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আজকের উত্থানটা শুধুমাত্র ‘জয় শ্রীরাম’ নামক একটি ‘হিন্দি’ স্লোগানের জন্য নয়, বিজেপির এই উত্থান শুধুমাত্র ধর্মীয় মেরুকরণের জন্য নয়, শুধুমাত্র হিন্দুত্ববাদের জন্যও নয়। বিজেপি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠন করবে, তার জন্য বাঙালি বিজেপি হয়ে গিয়েছে- এমনও নয়। এই প্রতিটি বিষয় নিশ্চয়ই কোনও না কোনও একটা ফ‍্যাক্টর হিসাবে বিজেপির পুরো প‍্যাকেজের মধ্যে আছে। কিন্তু শুধুমাত্র এসব কারণেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির শ্রীবৃদ্ধি- এমন বলা উচিত হবে না। দেখতে হবে, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে কোন পরিসর দখল করেছে?

তৃণমূল শাসক দল। শাসক দলের পাশাপাশি স্বাভাবিক নিয়মেই বিরোধী দলের অস্তিত্ব থাকে। অতীতে সিপিএম শাসক দল ছিল, কংগ্রেস বিরোধী দল ছিল। সেই বিরোধী দলের রাজনৈতিক পরিসর তৃণমূল কংগ্রেস দখল করল পরবর্তীতে। তৃণমূল কংগ্রেস বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কীভাবে তা করল, কেন করল- সে এক অন্য ইতিহাস! কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই এটা সম্ভব করতে পেরেছেন। সেই উত্থানের নেপথ্যে কংগ্রেসের নেতিবাচক ভূমিকার কথাও অস্বীকার করা যায় না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে প্রণব মুখোপাধ্যায়, সোমেন মিত্র, সীতারাম ইয়েচুরি প্রমুখের রাজনৈতিক জাজমেন্টে অনেক ভুলও ছিল, ছিল অনেক ইগো-র সমস্যাও।

তারপর মমতা যখন শাসক হলেন তখন সিপিএম, এবং পরে কংগ্রেসও, বিরোধী দলের অবস্থান নিল। এটাই হওয়ার কথা। কিন্তু সেই বিরোধী রাজনৈতিক পরিসরও তারা হারাল। ২০১৯-এ সিপিএমের একটা বড় অংশের ভোট বিজেপিতে চলে গেল। প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করে না। কংগ্রেস ও সিপিএমের সেই শূন‍্যস্থানটা বিজেপি সুকৌশলে দখল করল। তবে শুধু বাম-কংগ্রেস নয়, তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ বৃদ্ধিও বিজেপির বৃদ্ধির সহায়ক হয়েছে! বিজেপি এটা কীভাবে করতে সক্ষম হল? বলে রাখা ভাল, বিজেপির এই পশ্চিমবঙ্গ দখলের চেষ্টা কিন্তু নতুন নয়। অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানির সময় থেকেই হচ্ছে। কিন্তু এমন কী কাজ মোদি এবং অমিত শাহ করেছেন, যার ভিত্তিতে তাঁরা বিজেপিকে রাজনৈতিকভাবে এতটা গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারলেন?

২০১৪ সালের ৯ আগস্ট বিজেপির পুনরুত্থানে এক নতুন পর্বের সূচনার দিন। সেদিন নয়াদিল্লির জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে পৌঁছনোর সমস্ত রাস্তা দলীয় পতাকার ব‍্যানারে সজ্জিত হয়ে উঠেছিল। দলীয় কর্মীদের মধ্যে সাংঘাতিক উন্মাদনা ছিল। আমি সেই দিনটার সাক্ষী। দিনটা ছিল ২০১৪-র বিজয়ের পর আয়োজিত প্রথম জাতীয় কার্যনির্বাহী সমিতির বৈঠকের প্রথম দিন। অমিত শাহ-কে দলের সভাপতি নির্বাচিত করার ব‍্যাপারে বিজেপির সংসদীয় দল সবুজ সংকেত আগেই দিয়ে দিয়েছিল। সেদিন, ওই বৈঠকে সেই সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেওয়া হয়েছিল। অমিত শাহ-র বিজেপির সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার পর মোদি-শাহ জমানার সূচনা হয়েছিল। অমিত শাহ সভাপতি হয়ে পাঁচ হাজার শব্দের একটা দীর্ঘ ভাষণ দিয়েছিলেন। তাতে দলের অভিমুখ, কর্মসূচি, লক্ষ‍্য, দলীয় কাঠামো কী হবে- সব ব‍্যাপারে বিশদভাবে বলেছিলেন। অনেকেই বলেন, অমিত শাহ কিন্তু আমাদের দেখা গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের থেকে একেবারেই আলাদা। তিনি দলে ‘আরএসএস’-এর ‘প্রবাস কর্মসূচি’ চালু করলেন। শুধু নিজে নন, অন‍্যান‍্য নেতাদেরও সবক’টি রাজ্য ঘুরতে বাধ্য করলেন। নিজের টিম তৈরি করলেন। সদস্যসংখ্যা কীভাবে বাড়ানো যায়- সে ব‍্যাপারে নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানের ব‍্যাপারে সক্রিয় হবেন। কেননা, বিজেপি-কে যদি সর্বভারতীয় দল হতে হয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণ ভারত এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চল সর্বত্র বাড়তে হবে। পশ্চিমবঙ্গকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তিনি সেদিনই বলেছিলেন। বিজেপির ‘সদস্যতা মহাঅভিযান’ অমিত শাহ-র মস্তিষ্কপ্রসূত একটি কর্মসূচি ছিল। এজন্য দেশজুড়ে প্রায় ৩৯,৬৮২ কিলোমিটার পথ তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন। বুথে বুথে জনসংযোগ স্থাপন করতে হবে, জেলায় জেলায় পার্টি অফিস তৈরি করতে হবে, প্রত্যেক পার্টি অফিসে একটা করে লাইব্রেরি তৈরি করতে হবে- এই কাজগুলো মোবাইলের মাধ্যমে, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার করে দলের প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়াতে হবে।

এসব ভাবনা-চিন্তা অমিত শাহ-র অনেক দিন থেকেই ছিল। মোদি পরপর তিনবার গুজরাটে জয়লাভ করেছেন। কিন্তু অমিত শাহর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল দিল্লির দিকে। যে সময়ে তিনি নিজের জীবনের সর্বাপেক্ষা কঠিন অধ্যায়টি অতিবাহিত করেছেন, সেই সময়েই দিল্লির দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছিলেন। ঠিক সেই একইভাবে দিল্লি থেকে পশ্চিমবঙ্গে আসার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। এই প্রস্তুতি নিয়ে বিজেপি ব্যস্ত ছিল। জেলায় জেলায় আরএসএসের নানা সংগঠন, বনবাসী সমিতি, আরএসএসের শিক্ষা সংগঠন কাজ করছিল। পশ্চিমবঙ্গের ভোট তখন অনেক দূরে ছিল। ২০১৯-এর অনেক আগে থেকেই এই কাজ তারা শুরু করেছে। মানুষের কাছে বিজেপি এই ভাবমূর্তিটা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যে, তারা একটা নতুন ধরনের রাজনৈতিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা পশ্চিমবঙ্গে করতে চায়।

সবশেষে আরও একটা বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ। জওহরলাল নেহরু ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর যে জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন, তাতে বহুত্ববাদ থাকলেও, সেই জাতীয়তাবাদের প্রয়োগে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’ হয়েছিল বলে অভিযোগ। পশ্চিমবঙ্গে ৩০ ভাগ সংখ্যালঘু মানুষ বসবাস করেন। সুতরাং বিজেপির আলেখ্য হয়ে উঠল- ভারতীয় আদি সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হয়ে কিছুটা পাশ্চাত্য মডেল আর সংখ্যালঘু তোষণ বা সংখ্যালঘু ভোটব‍্যাঙ্কের রাজনীতি। এই প‍্যাকেজের বিরুদ্ধে বিজেপি চিরকালই সরব‌।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে যে অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি, তার পটভূমিতে অন‍্য কোনও রাজনৈতিক বিকল্প না থাকার দরুনই বিজেপিকে গ্রহণ করার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠেছে। সিপিএম যখন শাসক দল ছিল, তখন তৃণমূল ছিল বিকল্প। এখন বিজেপি সেই বিকল্পের জায়গাটা নিয়ে নিয়েছে। বিজেপি মধ‍্যবিত্ত, অভিজাত ভদ্রলোক শ্রেণির কাছে একটা বার্তা দেওয়ারও চেষ্টা করছে, বার্তাটি হল, তারা যে-জাতীয়তাবাদের কথা বলছে, তাতে শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন হবে। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে তারা সংখ্যালঘু সমাজের প্রতি আলাদা রাজনৈতিক আনুগত্য প্রকাশ করবে না। তারা প্রত্যেকের বিকাশের জন্য কাজ করবে।

পশ্চিমবঙ্গে দাঙ্গার ইতিহাস আছে। ’৪৭ সালের আগে এবং স্বাধীনতার সময় গান্ধীজিকে কেন নোয়াখালি চলে যেতে হয়েছিল, সেসব ইতিহাস আমরা জানি। এমনকী, সংবিধান পরিষদে গান্ধীজি থাকতে পারেননি। নেহরু একবার নিজেই বৈঠকে বলেছিলেন, গান্ধীজি এই সমিতিতে থাকতে পারছেন না, কারণ রাজ্যে রাজ্যে যে-সমস্ত জায়গায় দাঙ্গা হচ্ছে, সেসব জায়গায় তিনি যাচ্ছেন। পশ্চিমবঙ্গেও এই দাঙ্গার পটভূমি ছিল। ‘গ্রেট ক‍্যালকাটা কিলিংস’-এর কথা আমরা সবাই জানি। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বড় দাঙ্গা হয়েছে। সেই দাঙ্গাপীড়িত পশ্চিমবঙ্গকে নতুন প্রজন্ম হয়তো দেখেনি, কিন্তু প্রবীণ প্রজন্ম দেখেছে। দেশভাগ ভারতে একবার হয়েছে। কিন্তু বাংলা দু’বার ভাগ হয়েছে। তার ফলে এখানে হিন্দু-মুসলমান, উদ্বাস্তু, অনুপ্রবেশকারী– এসব বিষয় যথেষ্ট সংবেদনশীল। সেই অবকাশেই বিজেপি তার প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছে। এখানে আমার প্রশ্ন একটাই, আমরা বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক বলছি। বলছি যে, তারা পশ্চিমবঙ্গে বহুত্ববাদী বাঙালির ট্র্যাডিশনকে ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে। সবই ঠিক আছে। কিন্তু এই রাজনীতির মোকাবিলায় ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি কী করেছে?

সুতরাং, বিজেপিকে যদি সত্যি সত্যি আগামী দিনে রুখতে হয়, তাহলে কিন্তু শুধু শঙ্খ ঘোষের কবিতা দিয়ে আর সম্পাদকীয় নিবন্ধে ‘পথে এবার নামো সাথী’ ঘোষণা করে তথাকথিত বামপন্থী র‍্যাডিক্যাল সংস্কৃতিতে চিঁড়ে ভিজবে না! কফিহাউস থেকে শুরু করে বেঙ্গল ক্লাব- সর্বত্র শিরা ফুলিয়ে মুষ্টি পাকিয়ে লাভ হবে না। বিজেপির মতো একটা সর্বভারতীয় দল, যেখানে মোদি ও অমিত শাহ-র মতো ভোট মেশিন আছে, তাদের মোকাবিলা করার জন্য সুদৃঢ়, দীর্ঘমেয়াদি রণকৌশল নিতে হবে।

[আরও পড়ুন: সম্পাদকীয়: টিকাদান চালিয়ে যেতেই হবে]

Sangbad Pratidin News App: খবরের টাটকা আপডেট পেতে ডাউনলোড করুন সংবাদ প্রতিদিন অ্যাপ
নিয়মিত খবরে থাকতে লাইক করুন ফেসবুকে ও ফলো করুন টুইটারে

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement

Advertisement