Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৮ জুন ২০২৬
West Bengal

সম্পাদকীয়: যত জেলা তত লাভ

আগামী দিনে কাজের প্রয়োজনে আরও জেলা তৈরি হবে।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ৩, ২০২২, ১৯:২২

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: আগস্ট ৩, ২০২২, ১৯:২২

options
link
সম্পাদকীয়: যত জেলা তত লাভ zoom

যত জেলা, তত বেশি কাজের সুযোগ। তত বেশি উন্নয়ন। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ থেকে অন্যান্য অনুদান, সব বিষয়ে কার্যক্ষেত্রে বেশি টাকা পাওয়া। সাধারণ মানুষেরও সুবিধা। সদর, জেলা অফিস, আদালত কাছে চলে আসে। জেলার শীর্ষে থাকেন জেলাশাসক। তাঁর নিচে ধাপে ধাপে ব্লক লেভেল পর্যন্ত পরিকাঠামো। আইনশৃঙ্খলার জন্য থাকেন জেলা পুলিশ সুপার। তাঁর সংযোগ থানা পর্যন্ত। লিখছেন কিংশুক প্রামাণিক

বাংলার পার্শ্ববর্তী রাজ্য বিহারের জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি। জেলার সংখ্যা ৩৮। ঝাড়খণ্ডের জনসংখ্যা ৩.২০ কোটি। জেলার সংখ্যা ২৪। ওড়িশার জনসংখ্যা ৪.৫০ কোটি। জেলার সংখ্যা ৩০। উত্তর-পূর্বে অসমের জনসংখ্যা মাত্র ৩.১০ কোটি। জেলাসংখ্যা ৩৫। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। জেলা মাত্র ২৩। স্বভাবতই বড় জেলা ভেঙে ছোট ছোট জেলা করার যে সিদ্ধান্ত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়েছেন, তা একদম সঠিক উদ্যোগ। বাংলার জেলা ২৩ থেকে বেড়ে হচ্ছে ৩০টি। আরও ১০টি বাড়লে আরও ভাল হবে। মুখ্যমন্ত্রী ইঙ্গিতও দিয়েছেন, ৫৪টি জেলা করার ভাবনা আঁর আছে।

Advertisement

কেন জেলার সংখ্যা বাড়ানোর এই ভাবনা? কারণ, যত জেলা, তত বেশি কাজের সুযোগ। তত বেশি উন্নয়ন। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ থেকে অন্যান্য অনুদান, সব বিষয়ে কার্যক্ষেত্রে বেশি টাকা পাওয়া। সাধারণ মানুষেরও সুবিধা। সদর, জেলা অফিস, আদালত কাছে চলে আসে। জেলার শীর্ষে থাকেন জেলাশাসক। তাঁর নিচে ধাপে ধাপে ব্লক লেভেল পর্যন্ত পরিকাঠামো। আইনশৃঙ্খলার জন্য থাকেন জেলা পুলিশ সুপার। তাঁর সংযোগ থানা পর্যন্ত। এই দুই কর্তাকে সামনে রেখেই জেলায় হয় যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ। জেলা যত ছোট, তত সুবিধা কাজের।

[আরও পড়ুন: ফের অর্থনৈতিক মন্দার মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্ব! কোন পথে ভারত?]

তৃণমূল সরকারের অভিমুখ যেদিকে, তাতে বেশি জেলা হলে সবার সুবিধা। এই জামানায় সরকারি দান প্রকল্প অনেক বেশি। ১১ কোটি মানুষের জন্যই কিছু না কিছু ব্যবস্থা। ফলে প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগ নিত্য। মানুষকে সর্বদা বিএলআরও থেকে বিডিও অফিস, মহকুমা দপ্তর থেকে ডিএম অফিস যেতে হয়। বিরাট চাপ সামলাতে হয় আধিকারিকদের। ছোট জেলা কাজের বহর কমবে। আইন আদালতের ক্ষেত্রেও ছোট জেলায় খুব সুবিধা। মানুষকে নানা সময় আদালতের মুখাপেক্ষী হতে হয়।

৩৪ বছরে বাম সরকার ছোট জেলা করার বিষয়টি নিয়ে কেন ভাবেনি তা তারা-ই বলতে পারবে। হয়তো এক্ষেত্রেও ছিল কোনও কৌশল। বাম আমলে তৈরি হয়েছিল ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েতি রাজ। সাধারণ মানুষের হাতে সরাসরি চলে যায় ক্ষমতা। সেই সাফল্যে বাম নেতৃত্বের হয়তো মনে হয়েছে- জেলা সদর কাছে বা দূরে তাতে কিছু যায় আসে না। মানুষ তো ঘরের কাছেই পঞ্চায়েত পাচ্ছে। ৩৪ বছরের বাম জামানায় মাত্র তিনবার জেলা ভাগ হয়। তা-ও প্রশাসনিক সুবিধার জন্য, না কি রাজনৈতিক কারণে, তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। ১৯৮৬ সালে উত্তর ও দক্ষিণ জেলায় বিভক্ত হয় ২৪ পরগনা।

১৯৯২ সালে পশ্চিম দিনাজপুর ভেঙে উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা হয়। ২০০২ সালে পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ
হয় মেদিনীপুর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন মুখ্যমন্ত্রী হন তখন বাংলায় জেলা ১৯। ফলে চেয়ারে বসেই ছোট জেলা গড়ার দিকে মন দেন। এখনও পর্যন্ত তিনি চার দফায় জেলা ভাগ করেছেন। দার্জিলিং জেলাকে ভেঙে কালিম্পং আলাদা জেলা হয়েছে। জলপাইগুড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে আলিপুরদুয়ারকে। বর্ধমান জেলার দু’টি ভাগ হয়েছে আগে ‘পূর্ব’ এবং ‘পশ্চিম’ নাম জুড়ে। পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে আলাদা হয়েছে ঝাড়গ্রাম।

এবার তাঁর পরিকল্পনা, বিরাট মুর্শিদাবাদকে ভেঙে তিনটি জেলা করা। বহরমপুর, জঙ্গিপুর ও কান্দিকে সদর করে হবে জেলাগুলি। ভাঙছে নদিয়াও। নাম হবে ‘উত্তর নদিয়া’ ও ‘দক্ষিণ নদিয়া’। উত্তর ২৪ পরগনাও তিন ভাগ হচ্ছে। বনগঁা মহকুমা নিয়ে নতুন জেলার নাম ‘ইছামতী’। নতুন জেলা হচ্ছে বসিরহাট মহকুমাও। উত্তর ২৪ পরগনায় থাকবে বারাকপুর, বারাসত, দমদম, রাজারহাট। স্বতন্ত্র পরিচয় পাচ্ছে সুন্দরবন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে ছিন্ন করে নতুন জেলা হচ্ছে ম্যানগ্রোভ কুমির আর রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের দেশ। এর বাইরে মল্লরাজাদের গড় বিষ্ণুপুরকে বাঁকুড়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে আলাদা জেলার মর্যাদা দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। নবান্ন সূত্র জানাচ্ছে, ৩০-এই সীমাবদ্ধ নয়। আগামী দিনে কাজের প্রয়োজনে আরও জেলা তৈরি হবে। ছ’মাসের মধ্যে এই সাত জেলা গঠনের প্রক্রিয়া শেষ হবে।

পড়শি রাজ্যগুলি বাদ দিলে দেশের যে বড় রাজ্যগুলি রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জেলা উত্তরপ্রদেশে। সংখ্যা ৭৫। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাটের জনসংখ্যা বাংলার চেয়ে অনেক কম হলেও জেলার সংখ্যা ৩৩। সেখানে তালুক বা মহকুমা আছে প্রায় ২৫০টি। বড় রাজ্য মহারাষ্ট্রেও জেলার সংখ্যা ৩৬। ছোট্ট রাজ্য পাঞ্জাবে জেলার সংখ্যা ২৩। হরিয়ানাতেও জেলা ২২। এই তথ্য দেখাচ্ছে আমরা কোথায় পড়ে আছি। আমাদের রাজ্যে একটি ব্লক যত বড় তার চেয়ে ছোট ছোট এলাকা এসব রাজ্যে জেলার স্বীকৃতি পেয়েছে। একটাই কারণে সেখানকার সরকার জেলার সংখ্যা বাড়িয়েছে, তা হল পরিকাঠামোগত সুবিধা ও অর্থ।

জেলাভাগে স্থানীয় আবেগ জড়িয়ে যায়। নামকরণ নিয়েও বিতর্ক থাকে। সেজন্য ২৪ পরগনা, দিনাজপুর, মেদিনীপুর, বর্ধমান জেলা ভাগ হলেও মূল নামটি বদল হয়নি। উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম করে ভাগাভাগি করা হয়। এবারও জেলাভাগে স্থানীয় সেন্টিমেন্ট গুরুত্ব পাচ্ছে। ‘মুর্শিদাবাদ’ একটি জেলার নাম থাকবে। বাকি দু’টির কী নাম হয় দেখার। অন্যদিকে শ্রীচৈতন্যর লীলাক্ষেত্র বলেই ‘নদিয়া’ নামটি রেখেই ওই জেলার দু’টি ভাগ হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী বনগা জেলার নাম ‘ইছামতী’ দেওয়ায় স্থানীয় মানুষ খুশি। ইছামতী নদীর পাড় ঘেঁষে বাসিন্দাদের আবেগকে ধরতে চেয়েছেন তিনি। একইভাবে বসিরহাট মহকুমার জেলারূপ খুব প্রয়োজন ছিল প্রশাসনিক কারণে। সেটির নামকরণ পরে হবে। সুন্দরবনকে আলাদা জেলা করার ভাবনা অনেক পুরনো। কারণ, বিশ্বের বিস্ময় এই ম্যানগ্রোভ অরণ্যের আলাদা আইডেনটিটি দরকার ছিল। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ আসেন বাঘ দেখতে। এবার সেই সুন্দরবন নিজস্ব প্রশাসনিক কাঠামো পাবে। এটা জাতীয় উদ্যানের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। মাথার রাখতে হবে- মুর্শিদাবাদ, নদিয়া ও দুই ২৪ পরগনা জেলাগুলি বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী। নিরাপত্তার স্বার্থে এই এলাকাগুলির প্রশাসনিক কাঠামো আরও শক্তিশালী করবে ছোট ছোট জেলা।

যদিও পুলিশ জেলা হিসাবে অনেকে আগেই কিছু এলাকায় বিভাজন ঘটেছিল। এবার সেই এলাকাগুলি প্রশাসনিক জেলা হতে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লোকসভা আসনভিত্তিক জেলা বিভাজন অনেকে বেশি বিজ্ঞানসম্মত হতে পারে। সেই প্রক্রিয়া কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া উচিত।

দেশ যখন স্বাধীন হয় পশ্চিমবঙ্গে ছিল ১৪টি জেলা। কলকাতা, ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি, নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বর্ধমান, বীরভূম, মালদহ, পশ্চিম দিনাজপুর, দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি। কোচবিহার তখন স্বাধীন রাজ্য। ১৯৪৯ সালে কোচবিহার ভারতে যোগ দেয়। ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর ১৯৫০ সালে কোচবিহার পশ্চিমবঙ্গের একটি জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার পর চন্দননগর ফরাসিদের হাত থেকে ভারতে আসে। ১৯৫৪ সালে অন্তর্ভুক্ত হয় হুগলি জেলার সঙ্গে। ১৯৫৬ সালে বিহারের মানভূম জেলার পুরুলিয়া মহকুমাটি বাংলায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে একটি জেলার মর্যাদা পায়।

এই হল বাংলার জেলা গঠনের ইতিহাস। স্বাধীনতার সময় ব্রিটিশদের হাতে গড়া বড় বড় জেলা সব রাজ্যই পরে ভেঙে ছোট ছোট জেলা করে নিয়েছে। কিন্তু বাংলা ছিল পিছিয়ে। সেই ঘাটতি পুষিয়ে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ ত্বরান্বিত করতে চাইছেন মমতা বন্দে্যাপাধ্যায়। এতে মানুষের লাভই হবে।

[আরও পড়ুন: দ্রৌপদী নিয়ে ভুল কিছু বলেননি মমতা, তাঁর লড়াই বিজেপির বিরুদ্ধে]

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.