রাজদীপ সরদেশাই: আজকাল নির্বাচনের ইতিবৃত্ত মানেই নির্বাচন সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক মতামত, ভোটকেন্দ্রে বেমক্কা গুলি করে হাপিশ, আর রইল, যেখানে ভোট হচ্ছে সেই এলাকা সম্পর্কে লেশমাত্র ধারণা না নিয়েই খবর করতে আসা সাংবাদিকদের ভিত্তিহীন ‘ব্রেকিং নিউজ’ পাচার– সাংবাদিকতার ভাষায় যাকে বলে ‘প্যারাশুট রিপোর্টিং’। অর্থাৎ তুরীয় তাড়াহুড়ো! একে টি-২০ স্টাইল নির্বাচন ছাড়া আর কীই বা বলা যেতে পারে! আর এই কারণেই, ভারতীয় নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে কিছু আন্দাজ করা ক্রমশ দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। অদ্ভুত ও অহেতুক একজাতীয় প্রতিযোগিতা ঢুকে পড়েছে আজ, নির্বাচনে যার কোনও অর্থই হয় না। ফলে বুথপিছু টানটান উত্তেজনার লড়াই, কিছু আঁচ করাই অসম্ভব! ঠিক এই কারণেই, মধ্যপ্রদেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা মালওয়া-নিমার বেল্টে চারদিনব্যাপী নির্বাচনের দৌড়ে কোনওরকম হুইসলবাজি করার ব্যাপারে আমি নিজে থেকেই বাদ সাধব। কিন্তু নির্বাচন সম্পর্কিত এই গৌরচন্দ্রিকায় একটা কথা লিখতে আমার হাত খুবই নিশপিশ করছে! তা হল এই– সাধারণত দেখা যায় না, তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতীয় স্তরের সমস্যাগুলোর সঙ্গে আজ মাটিতে জুড়ে থাকা কাঠখোট্টা বাস্তবজীবনের বিন্দুমাত্র মিল নেই।
[‘‘১৭ মিনিটে বাবরি মসজিদ ভেঙেছি, রাম মন্দির তৈরিতে এত সময় লাগছে কেন?’’]
প্রত্যেকটা নির্বাচনী প্রচারেই রাহুল গান্ধী রাফালে চুক্তির দুর্নীতি, দুর্নীতির অঙ্কই বা কতখানি– এসব নামতা আওড়ে চলেছেন মোদি সরকারের বিরুদ্ধে। অথচ ওখানকার যতগুলো শহর ও গ্রামে আমি ঘুরেছি, প্রায় সর্বত্রই রাফাল সম্পর্কে সেখানকার বাসিন্দাদের কোনওরকম সম্যক ধারণাই নেই। যেমন ধরুন– কিশোরকুমারের জন্মস্থান খান্ডওয়া নগর, কিন্তু আজ সেখানে এই মহান গায়কের ভুবনজোড়া হাসির স্মৃতিটুকু নেই। চারদিক কেমন ঝিমিয়ে রয়েছে! এমতাবস্থায় ওখানকার বাস স্ট্যান্ডে জনৈক ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘আচ্ছা দাদা, বলতে পারেন, রাফালে কি কোনও বনের পাখি?’ এই অতুলনীয় বক্তব্যকে প্রমাণ করে সম্প্রতি ‘মাই ইন্ডিয়া অ্যাক্সিস ট্র্যাকার’-এর সমীক্ষা– মধ্যপ্রদেশে ৮০ শতাংশেরও বেশি মানুষ রাফালে সম্পর্কে কিছু জানা তো দূরের কথা, নামটাই কোনও দিন শোনেনি।
অন্যদিকে বিজেপি নেতৃত্বদের রাম মন্দির ও গো-নিধনের মতো গতানুগতিক, আবেগপ্রবণ এবং সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তৃতা নিয়েই যত ছটফটানি। যদিও তা হাতির গায়ে মশার কামড়ের মতোই ম্লান। এই তো সেদিন, মন্দিরনগরী উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের বাইরে শিবভক্তদের বেশ বড়সড় এক জটলার মাঝে বসে ছিলাম। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রথম ভোট দেবে। ‘আমরা মন্দির চাই না, মূর্তি চাই না, শহরের নতুন নামও চাই না। বরং, সরকার ওই অর্থ আমাদের মিল, ফ্যাক্টরি খোলার ব্যাপারে বিনিয়োগ করুক। তাতেই আমরা খুশি। মন্দির বননা চাহিয়ে, পর পহলে রোজগার জরুরি হ্যায়!’ প্রায় সমস্বরে এই আরজি তাদের গলা থেকে আমার দিকে ধেয়ে এসেছিল। আর প্রায় ২০ বছর হতে চলল উজ্জয়িনীর মিল বন্ধ।
টেলিভিশনে হিন্দু-মুসলিম বিতর্ক, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, ভক্তিমূলক বিষয়গুলি এখন নিউজ-চক্রের দৈনিক খাদ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। শোগুলোতে একেবারে ট্রেনিং দেওয়ানো চড়া গলা, আর সেই গলাদের যে কোনও ইস্যু নিয়ে চিলচিৎকার। কিন্তু আসল মাঠে তাদের যেই না নামাবে, আর কোনও টুঁ শব্দটি নেই– কে ‘বেটার’ হিন্দু কিংবা কোন নেতা কতবার সত্যি সত্যি কতগুলো মন্দির চষেছেন– এগুলো কোনও আলোচ্য বিষয়ই নয় তখন। বরং বিষয় তখন বিধানসভা নির্বাচনের বুনিয়াদ ‘পুরসভাকরণ’-এর দিকে ফিরে আসে, যেখানে রাজনৈতিক আখ্যানকে প্রভাবিত করে স্থানীয় বিষয়-বৈশিষ্ট্য। কৃষিভিত্তিক এই রাজ্য মধ্যপ্রদেশ, অথচ শহর-গ্রাম ভেদাভেদ অদ্ভুতভাবে নিকৃষ্টমানের। ইন্দোরে বড় বড় পোস্টার লাগানো হয়েছে– মালওয়া-র এই প্রধান নগরী ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’-এ পরিচ্ছন্নতম শহরের শিরোপা পেয়েছে পরপর দু’বছর। লেট্স গো ফর আ হ্যাটট্রিক! এই এখন তাদের গলা ফাটানোর উপকরণ। কিন্তু ঠিক ২০০ কিলোমিটার দূরেই, প্রত্যন্ত এলাকা মান্দসরে ৫ জন কৃষক খুন হয়েছিলেন পুলিশের গুলিতে। চাষের ন্যূনতম মূল্যের জন্য আওয়াজ তুলতে গিয়ে আমাদের কীরকম হেনস্তা হতে হয়েছিল, তা কিছুতেই ভোলা সম্ভব নয়। ‘স্যব পয়সা ট্রেডার লোগ লে গ্যয়ে স্যর, কিষান কে লিয়ে কুছ নেহি রহতা হ্যায়!’ বীতশ্রদ্ধ ও ক্রুদ্ধ স্বর কৃষকদের শরীর থেকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছিল। বিজেপির কিছু ছোকরা ক্যাডার এমন সময় মোটরবাইকে এসে গ্রামবাসীদের উত্ত্যক্ত করতে শুরু করে এবং নিজেদের ভাষায় তাদের ক্ষোভ দমনে উদ্যত হয়। সেই ভাষা, অন্য কোনও ভাষা নয়, কার্যত দাঙ্গার ভাষা। একটা ছোটখাটো দাঙ্গা লাগানোর মতো অবস্থা তৈরি হয়ে যায় ওখানে। সেই চিৎকার-চেঁচামেচি থামাতে না পেরে আমার যেন মনে হচ্ছিল, আবার কোনও টিভি স্টুডিও-র বিতর্কে আমি এসে পড়েছি।
যদিও এই রাগ, বিক্ষোভ মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের প্রতি ততটা নয়, যতটা না এলাকার প্রশাসন বা মন্ত্রীদের প্রতি। যা ব্যাখ্যা দেয়, কেন বিজেপি ৫৩ জন এমএলএকে বসিয়ে দিল এবং এমনকী, কেন, সাতজনের নির্বাচনের কেন্দ্র বদলে দিল। রাজনীতির ময়দানে স্বতন্ত্র এক চরিত্র চৌহানজি-মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শাসনকালের ১৩ বছর হয়ে গেল তঁার। এই গরিমা তঁাকে হিন্দি-বলয়ের অন্যতম একজন দীর্ঘায়ু নেতারূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তাঁর সাফল্যের মূলমন্ত্র সম্ভবত সহজ, সাধারণ, আড়ম্বরহীন জীবনযাপন। পেশিবহুল ও দেখাওনি-ভরা নেতাদের কালে তিনি যেন সাবেকি ভদ্রসভ্য নেতার ‘মিসিং লিঙ্ক’। সবদিকেই তাঁর বন্ধুবান্ধব, কোনও শত্রু তেমন নেই বলাই ভাল। চৌহান সেই ‘কিষান পুত্র’ যিনি সদাহাস্য, সবার আদরণীয় ‘মামাজি’!
এই স্থানীয় অযোগ্য মন্ত্রীদের উৎপাটনের লক্ষ্যে বিরোধী এক জবরদস্ত সংগ্রামের আয়োজন করা এবং একইসঙ্গে জনপ্রিয় এই মুখ্যমন্ত্রীর চেয়েও কার্যকর জননেতার অভ্যুত্থান ঘটানো এখন কংগ্রেসের মস্ত চ্যালেঞ্জ। যেখানে কংগ্রেস একটার পর একটা নির্বাচনে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে, তার উপর এই এলাকা ‘আরএসএস’-এর অন্যতম ঘাঁটি, সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সক্ষম এক কর্মী-সংগঠন গড়ে তোলা- অর্থাৎ এই চ্যালেঞ্জ, মোটেও মুখের কথা নয়। এলাকার এক মিষ্টির দোকানি সেদিন বললেন– মধ্যপ্রদেশে কংগ্রেস হল সেই বরযাত্রী, যাদের কোনও বরই নেই! এই পরিস্থিতি মোটেই অপরিচিত নয় যে, কংগ্রেসের এই অতীত ঘাঁটিতে আজ রাজদণ্ড বসাতে হলে তরুণ নেতাদের সঙ্গে সহাবস্থানের নীতি নিয়ে যৌথ নেতৃত্বের পন্থা অবলম্বন করতে হবে। ন’বার এমপি হওয়া কমল নাথের রাজ্যের সর্বোচ্চ আসনে আসীন হওয়ার সম্ভবত এই শেষ সুযোগ। অন্যদিকে, জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়ার কাছেও পরবর্তী প্রজন্মের মাথা হয়ে ওঠার সময়। এসবের মাঝে রয়েছেন দু’বার মুখ্যমন্ত্রী হওয়া দিগ্বিজয় সিং। তিনি দলীয় কর্মীদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখেছেন। কিন্তু এটুকু বলা যেতে পারে, প্রায় ১৫ বছর পর অস্থায়ী এক সমঝোতার সম্ভাব্য গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
কিন্তু এই যুদ্ধ, বিজেপি বনাম কংগ্রেসের গড়পড়তা দ্বিপাক্ষিক সংঘর্ষ নয়। প্রায় প্রত্যেকটা কেন্দ্রেই স্বাধীনতা ও বিদ্রোহের গোঙানি রয়েছে, রয়েছে তারাও যারা ছোট ছোট দলের নামে এতদিন মাঠের বাইরেই ছিল ‘বানজারা’ হয়ে। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন– এ যেন ‘কাঁটে কি টক্কর’, সেয়ানে সেয়ানে লড়াই। এমনকী, ‘ভোট কাটুয়া’-দেরও নাকি তলায় তলায় ‘স্পনসর’ করা হয়েছে, যাতে ‘অ্যান্টি-বিজেপি’ ভোটটুকুও ভাগ হয়ে যায়। তার পরেও, খেলা ঘোরার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না। ‘যে পার্টি নিজেদের ভোটারদের ঘর থেকে বের করে আনতে পারবে, তারাই হবে বিজেতা!’ এমনই উক্তির উদগিরণ শোনা যাচ্ছে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে। মজার কথা হল, ঠিক এমন প্রতিধ্বনিই গুজরাতে পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে বিজেপি সিফনের চাদরের মতো সূক্ষ্ম ব্যবধানে জিতে উঠতে পেরেছিল। তাহলে মধ্যপ্রদেশের ২০১৮ নির্বাচনও কি গুজরাত ২০১৭-র পুনরাবৃত্তিরূপে পর্যবসিত হবে?
পুনশ্চ টিভি স্টুডিও-তে, সমস্ত নির্বাচনের ক্ষেত্রেই আমরা ‘মোদি বনাম রাহুল’-এর আওয়াজ তুলি। কিন্তু মালওয়া-র ধুলোপথ এই নেতৃত্বের লড়াইকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না। ইন্দোর-উজ্জয়িনী হাইওয়েতে এক অটোপার্টস মেরামতকারী এর সংক্ষিপ্তসার দিলেন। সেটাই তুলে দিচ্ছি: নোটবন্দি আর জিএসটি-র পর আমার ব্যবসা যখন লাটে উঠল, কোনও বড় নেতাই এগিয়ে আসেনি, সে যে দলেরই হোক না কেন। ‘ইয়ে সব চুনাও কে টাইম ভোট মাঙনে আতে হ্যায়!’ আশার আলো যখন বিভ্রান্তির মরীচিকায় রূপান্তরিত হয়, সেই পরিস্থিতিতে প্রত্যেকটা পার্টিরই প্রতিশ্রুতির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। আর টেলিভিশন প্রতিনিধিদের তখন থাকা উচিত মাটির অনেক অনেক অনেকটা কাছাকাছি।
[‘প্রধানমন্ত্রীর হিন্দু-মুসলিম রোগ আছে’, ভোট প্রচারে বেলাগাম তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী]
সর্বশেষ খবর
-
লাথি খেয়ে কচুবনে, বাড়ি দখলের অভিযোগে এবার ডিম খেলেন জয়প্রকাশ
-
‘চুপ থাকব না শেষ দেখে ছাড়ব’, বিবাহবিচ্ছেদ মামলায় স্বামী-শ্বশুরের জোড়া আইনি নোটিসকে চ্যালেঞ্জ সেলিনার
-
৩০০ টাকা রোজ মাইনের চাকুরে থেকে কোটিপতি, উল্কাগতিতে উত্থান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ কাণ্ডে ধৃত পরিতোষের
-
তোলাবাজি থেকে যৌনহেনস্তা! ১৩ দিনের পুলিশি হেফাজতে স্বরূপ বিশ্বাস, এজলাসে তুমুল হই হট্টগোল
-
কালীঘাটের বৈঠকে সেই ‘আদি’রাই, এলেন না ‘বিদ্রোহীরা’, দল বাঁচাতে পারবেন মমতা?