Advertisement
Advertisement
Advertisement
Sangbad Pratidin
  • ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১২ জুন ২০২৬
PNG

জ্বালানি ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি পিএনজি, তবুও গ্রাম-শহরে বৈষম্য!

সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য সরকার গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা বিকল্প রান্না ব্যবস্থার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষত, কিছু অঞ্চলে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে উন্নত চুলার প্রচার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের সম্প্রসারণ ইন্ডাকশন কুকারের ব্যবহারকেও সহজতর করেছে।

Advertisement
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২৬, ২০:৫৭

link
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক
সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক

শেষ আপডেট: এপ্রিল ৭, ২০২৬, ২০:৫৭

options
link
জ্বালানি ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি পিএনজি, তবুও গ্রাম-শহরে বৈষম্য! zoom
এলপিজির 'বিকল্প' রূপে পিএনজি-কে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

গত দুই দশকে এলপিজি-কে উন্নয়নের প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বিশেষত, গ্রামীণ অঞ্চলে। কিন্তু এই প্রসারের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলি পর্যাপ্তভাবে বিশ্লেষিত হয়নি। শহুরে ভারতের একটি বড় অংশে ইতিমধ্যেই এলপিজির ‘বিকল্প’ রূপে পিএনজি-কে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু এ উদ্যোগ অন্তর্ভুক্তিমূলক তো?

পার্থ দেবনাথ: ভারতের বর্তমান জ্বালানি সংকটকে যদি বাজারের একটি সাময়িক অস্থিরতা রূপে দেখি, তবে হয়তো-বা এর গভীরতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হব। বাস্তবে এই সংকট একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার লক্ষণ, যেখানে বৈশ্বিক রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় নীতি, কর্পোরেট স্বার্থ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এক জটিল পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে আবদ্ধ। পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক অস্থিরতা, বিশেষত ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীর উপর চাপ, ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে। যেহেতু এ-দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ‘এলপিজি’ (‘লিকুইডিফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস’) আমদানির উপর নির্ভরশীল, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে কোনও ধরনের বিঘ্ন অবিলম্বে অভ্যন্তরীণ সংকট হিসাবে প্রতিফলিত হয়। এই প্রতিফলন কেবল পরিসংখ্যানগত নয়; এটি প্রতিদিনের রান্নাঘরে, চুলার আগুনে, এবং পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তায় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন
Advertisement

গত দুই দশকে এলপিজি-কে উন্নয়নের প্রতীক রূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। বিশেষত, গ্রামীণ অঞ্চলে। কিন্তু এই প্রসারের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক যুক্তিগুলি পর্যাপ্তভাবে বিশ্লেষিত হয়নি। এলপিজির উপর এই ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা একটি একমুখী জ্বালানি কাঠামো তৈরি করেছে, যেখানে ‘বিকল্প’ জ্বালানির সম্ভাবনা ক্রমশ প্রান্তিক হয়ে পড়েছে।

ফলে ‘পিএনজি’ বা ‘পাইপ্‌ড ন্যাচরাল গ্যাস’-এর প্রসঙ্গটি এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শহুরে ভারতের একটি বড় অংশে ইতিমধ্যেই এলপিজির ‘বিকল্প’ রূপে পিএনজি-কে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই রূপান্তরকে সাধারণত প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়– যেখানে নিরাপত্তা, ধারাবাহিকতা, এবং খরচের যুক্তি সামনে আসে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা আংশিক। পিএনজি অবকাঠামো নির্মাণ একটি অত্যন্ত পুঁজি-নিবিড় প্রকল্প, যা মূলত বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণে। এই সংস্থাগুলি রাষ্ট্রীয় নীতির সহায়তায় একটি নতুন বাজার তৈরি করছে, যেখানে জ্বালানি কেবল একটি প্রয়োজনীয় পরিষেবা নয়, বরং একটি মুনাফা-নির্ভর পণ্য। কাজেই প্রশ্নটি নেহাত প্রযুক্তিগত নয়; এটি একটি রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন, যেখানে রাষ্ট্র এবং কর্পোরেটের মধ্যে এক ধরনের সমঝোতা তৈরি হচ্ছে।

এই সমঝোতার ফলে যে-বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, তা গভীরভাবে বৈষম্যমূলক। শহরে পিএনজি-র প্রসার মানে সেখানে একটি নিরবচ্ছিন্ন এবং তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে ওঠা। কিন্তু গ্রামীণ বাংলার মতো অঞ্চলে, যেখানে এই অবকাঠামো পৌঁছানোর সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত, সেখানে মানুষকে আবার ঐতিহ্যগত জ্বালানির দিকে ফিরে যেতে হচ্ছে। এই প্রত্যাবর্তন কোনও রোমান্টিক পুনরাবিষ্কার নয়; এটি একটি বাধ্যতামূলক অভিযোজন, যা মূলত অর্থনৈতিক অসাম্য এবং নীতিগত অবহেলার ফল।

গ্রামীণ বাংলার রান্নাঘরের ইতিহাস এ প্রসঙ্গে আলোচনাযোগ্য। কাঠের উনুন, গোবরের উপলা, খড়কুটো– এসব কেবল জ্বালানি নয়; এগুলি একটি জীবনযাত্রার অংশ, যা স্থানীয় পরিবেশ এবং অর্থনীতির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। এলপিজির আগমনের ফলে এই পদ্ধতিগুলি আংশিকভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছিল, কিন্তু সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি। বরং বহু ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, মানুষ দ্বৈত পদ্ধতি ব্যবহার করে– যেখানে এলপিজি এবং ঐতিহ্যগত জ্বালানি একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়। এই দ্বৈত অবস্থান আসলে একটি স্থিতিস্থাপকতার চিহ্নও।

তবে এই স্থিতিস্থাপকতার মধ্যে একটি অন্তর্নিহিত সংকট রয়েছে। ঐতিহ্যগত জ্বালানি ব্যবহারের ফলে যে ধোঁয়া উৎপন্ন হয়, তা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষত মহিলাদের ক্ষেত্রে, যারা দীর্ঘ সময় রান্নাঘরে কাটান, এই ঝুঁকি আরও বেশি। ফলে বিকল্প জ্বালানির প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত নয়; এটি একটি লিঙ্গ-সংবেদনশীল জনস্বাস্থ্য সমস্যাও।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎনির্ভর রান্নার সম্ভাবনা একটি নতুন দিগন্ত খুলে দেয়। ইন্ডাকশন কুকার বা ইলেকট্রিক আভেন প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ এবং পরিবেশগতভাবে তুলনামূলক পরিষ্কার। কিন্তু এই সম্ভাবনার বাস্তবায়ন একাধিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ। প্রথমত, এই যন্ত্রগুলির প্রাথমিক খরচ গ্রামীণ পরিবারের জন্য একটি বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা এই পদ্ধতির উপর আস্থা কমিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, বিদ্যুতের খরচ দীর্ঘমেয়াদে একটি নতুন ধরনের অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে। ফলে এই বিকল্পটি একটি আংশিক সমাধান হলেও তা সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারে না।

প্রশ্ন: আমরা কি একটি বহুমুখী জ্বালানি নীতি তৈরি করতে পেরেছি? ইতিহাস বলছে, সংকটের সময়ে মানুষ সবসময় বহুমুখী জ্বালানির উপর নির্ভর করে। নয়ের দশকে কেরোসিন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প, যা রেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ করা হত। এখনও সেই অভিজ্ঞতা পুনরাবৃত্তি হতে দেখা যাচ্ছে, যেখানে সরকার পুনরায় কেরোসিন বিতরণের কথা ভাবছে। কিন্তু এই পুনরাবৃত্তি আমাদের একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতার দিকে ইঙ্গিত করে, অর্থাৎ আমরা এখনও একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই সমাধান তৈরি করতে পারিনি।

এলপিজি-র প্রসার যেমন রাষ্ট্রীয় নীতির ফল, তেমনই পিএনজির প্রসারও একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই নীতিগুলি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। যদি উন্নয়ন কেবল শহুরে মধ্যবিত্তর প্রয়োজন মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা একটি অসম সমাজ তৈরি করবে, যেখানে গ্রামীণ মানুষ ক্রমশ আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। ফলে জ্বালানি নীতিকে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে দেখতে হবে, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনা করা হবে।

গ্রামীণ ও আধা-গ্রামীণ বাংলার জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বিকল্প জ্বালানির সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তার সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। বায়োগ্যাস, সোলার কুকার, বা উন্নত চুলার মতো প্রযুক্তি একটি টেকসই পথ দেখাতে পারে, কিন্তু এই প্রযুক্তিগুলির প্রসার এখনও সীমিত। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসংগঠিত নীতি, যেখানে অর্থনৈতিক সহায়তা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করবে।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজ্য সরকার গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, যা বিকল্প রান্না ব্যবস্থার সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করতে পারে। বিশেষত, কিছু অঞ্চলে বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে উন্নত চুলার প্রচার একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। গ্রামীণ বিদ্যুতায়নের সম্প্রসারণ ইন্ডাকশন কুকারের ব্যবহারকেও সহজতর করেছে।

তবে এসব উদ্যোগ এখনও বিচ্ছিন্ন, সীমিত। একটি সুসংহত নীতির অভাব স্পষ্ট। আমাদের প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, যেখানে বিকল্প জ্বালানির জন্য ভরতুকি, সহজ ঋণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি গ্রামীণ পরিবারগুলিকে কম দামে ইন্ডাকশন কুকার বা বায়োগ্যাস ইউনিট সরবরাহ করা যায়, তবে তা একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। একই সঙ্গে, স্থানীয় পঞ্চায়েত স্তরে সচেতনতা কর্মসূচি চালিয়ে মানুষকে বিকল্প জ্বালানির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবহিত করা প্রয়োজন। বর্তমানের এলপিজি সংকটের সময় কালোবাজারি একটি বড় সমস্যা, যা সাধারণ মানুষের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, করছে। এমতাবস্থায় কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছ সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

উন্নয়ন যদি বহুমাত্রিক না হয়, তবে তা স্থিতিশীল হতে পারে না। পিএনজির মতো প্রকল্প হয়তো একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নির্দেশ করে, কিন্তু তা যদি একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্ত না হয়, তবে তা বৈষম্যকে আরও তীব্র করে তুলবে।

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সমস্ত খবর জানতে চোখ রাখুন আমাদের 'ফুটবল বিশ্বযুদ্ধ' - এর পাতায়।
চোখ রাখুন

নিয়মিত খবরে থাকতে ফলো করুন

Advertisement

Share this article on

The article link is copied.