‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’-তে জোর দেওয়া হতে দেখা গিয়েছে লিঙ্গসাম্য, মানবিক অধিকার, ন্যাচরাল জাস্টিস, সামাজিক পরিস্থিতি এবং প্রতিটি মানুষ যাতে সমান অধিকার এবং বিচার পায়; সেই দিকগুলির উপর। এতে দেশের বৈচিত্র নষ্ট হবে, বা ইসলামি সংস্কৃতি বিপন্ন হবে, বা বিচ্ছিন্নতাবাদ তৈরি হবে– এ ভাবনা অমূলক। লিখছেন প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত।
গত শতকের ছয়, সাত বা আটের দশকে, এমনকী তারপরেও, উকিলবাবুদের চেম্বারে, ওয়ারিশ-সূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বিষয়ক আলোচনায় একটি প্রশ্ন প্রায়ই উত্থাপিত হত– বাবা কত সালে মারা গিয়েছেন? বা, মা প্রয়াত হয়েছেন কোন সালে? কখনও হয়তো ঠিক সালটি মনে করে উকিলবাবুকে বলতে পারতেন না মক্কেল। তখন উকিলবাবু জিজ্ঞাসা করতেন– “মনে করে অন্তত বলুন, ’৫৬ সালের আগে মারা গিয়েছেন, না কি পরে?”
আরও পড়ুন:
আসলে হিন্দু ওয়ারিশন আইনে ’৫৬ সাল একটি দিকচিহ্ন। তার আগে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি যেভাবে ওয়ারিশনদের মধ্যে বণ্টিত হত, সেই বছর থেকে আগের নিয়ম একেবারে বদলে গিয়েছিল। আবার বিয়ের বয়সের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ সময়কাল হল ১৯২৯ সাল। সেই বছরেই প্রবর্তিত হয় ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেন্ট অ্যাক্ট’। যদিও সেই আইন বলবৎ হয়েছিল পরের বছর, ১৯৩০ সালে।
একজন সমাজ-সংস্কারক রূপে দেশের নতুন আইন প্রবর্তন করার প্রচেষ্টায় সফল মানুষ হরবিলাস সারদা প্রথম নন। এর ঠিক ১০০ বছর আগে রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত সতীদাহ প্রথা রদ করা হয়েছিল আইন করে।
‘মনুসংহিতা’-র নিদান, বিবাহযোগ্য মেয়েদের বয়স ৮ আর ছেলেদের ক্ষেত্রে ২৪। ৮ বছরের মেয়েদের বলা হত ‘গৌরী’। অতুল সুর লিখেছেন, মেয়েদের ক্ষেত্রে ৮ বছর বাঁধা থাকলেও ছেলেদের বিয়ের বয়স কার্যত অনেক কমে যায়, ফলে সমাজে বাল্যবিবাহ প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়েছিল। ১৯২৯ সালে যে-মানুষটির নেতৃত্বে এবং প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ সরকার নতুন আইন বলবৎ করে বাল্যবিবাহ রোধ করার উদ্যোগ নিতে বাধ্য হল, তিনি কিন্তু ধর্মগুরু ছিলেন না। তিনি, হরবিলাস সারদা, ছিলেন শিক্ষাবিদ আইনজ্ঞ এবং রাজনীতিবিদ। তাঁর প্রচেষ্টা এমন ঐকান্তিক ছিল, ওই বিশেষ আইনটির নাম লোকমুখে ‘সারদা আইন’ হয়ে দাঁড়ায়। এই আইনে বলে দেওয়া হয়, ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৮ আর মেয়েদের ক্ষেত্রে ১৪ বছরের আগে বিয়ে দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। স্বাধীতার পর ১৯৪৯ সালে মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়স বাড়িয়ে ১৫ করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে বিয়ের নিম্নতম বয়স হয়ে দাঁড়ায় ছেলেদের ক্ষেত্রে ২১ আর মেয়েদের ১৮ বছর।
একজন সমাজ-সংস্কারক রূপে দেশের নতুন আইন প্রবর্তন করার প্রচেষ্টায় সফল মানুষ হরবিলাস সারদা প্রথম নন। এর ঠিক ১০০ বছর আগে রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে হিন্দুদের মধ্যে প্রচলিত সতীদাহ প্রথা রদ করা হয়েছিল আইন করে। সেই ঘটনার
৩ দশকের মধ্যে ১৮৫৬ সালে প্রণীত ‘হিন্দু উইডোজ রিম্যারেজ অ্যাক্ট’, যাঁর উদ্যোগে এবং চেষ্টায় বলবৎ হয়ে অসহায় বিধবাগণ পুনরায় বিবাহ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পেলেন, সেই মানুষটিও ধর্মগুরু ছিলেন না। ছিলেন শিক্ষাবিদ। বিদ্যা ও পাণ্ডিত্যের প্রতিভূ সেই ঈশ্বরচন্দ্রের পদবিটি ভুলে এত দিন পরেও লোকে তাঁকে স্মরণ করে ‘বিদ্যাসাগর’ বলে!
সম্প্রতি, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ প্রচলনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আর তার সমালোচনা করতে গিয়ে কেউ কেউ ভাবছেন বা বলছেন, এটি বুঝি মুসলিমদের উপর হিন্দুদের নিয়ম চাপিয়ে দেওয়ার একটা চক্রান্ত।
এ-কথা যাঁরা বলছেন, তাঁরা কিন্তু কেউ একবারও ভেবে দেখছেন না, যে-আইনে হিন্দুদের ব্যক্তিজীবন পরিচালিত হয়– সেই আইন কিন্তু মনু মহারাজের সংহিতা অনুসারী সেকেলে আইন আর নেই। শুধু তাই নয়, বহু বছর আগে প্রণয়ন করা দায়ভাগ বা মিতাক্ষর আইনকেও আর পূর্বাবস্থায় রাখা হয়নি। হিন্দুর আইন পরিবর্তিত হয়েছে যুগে যুগে এবং সময়ের সঙ্গে, সমাজব্যবস্থা ও মানসিকতার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
আমাদের কবি তাঁর গানে ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’-এর কথা বলেছিলেন। তাঁর ধারণায় ‘বিবিধ’-এর মধ্যেও একই দেশের দু’টি মানুষের জন্য দু’-রকম পরস্পরবিরোধী আইনের প্রসঙ্গ এসে পৌঁছতে পারেনি।
যে-যে প্রধান পরিবর্তন হিন্দুদের আইনে নিয়ে আসা হয়েছে– সেগুলি ধর্মের অনুশাসনে নয়,
বরং স্বাভাবিক ন্যায়বিচার, লিঙ্গসাম্য, সামাজিক পরিস্থিতি, সমানাধিকার এবং সমতার ভিত্তিতে এবং প্রয়োজনে। ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’-র ব্যাপারটাও সেরকম। সেখানে কোনও বিশেষ ধর্মের আইনের উপর নয়, জোর দেওয়া হতে দেখা গিয়েছে লিঙ্গসাম্য, মানবিক অধিকার, ন্যাচরাল জাস্টিস, সামাজিক পরিস্থিতি এবং প্রতিটি মানুষ যাতে সমান অধিকার এবং বিচার পায়; সেই দিকগুলির উপর। এখন কারও যদি মনে হয়– ‘অভিন্ন বিধি’ এসে দেশের বৈচিত্র নষ্ট করবে বা ইসলামি সংস্কৃতিকে বিপন্ন করে করবে, কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদ সৃষ্টি করবে– তাহলে তেমন ধারণাকে এক একদেশদর্শী, সংস্কারাচ্ছন্ন, প্রজ্ঞাপক মানসিকতার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু মনে করা যায় না।
আমাদের কবি তাঁর গানে ‘নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধান’-এর কথা বলেছিলেন। তাঁর ধারণায় ‘বিবিধ’-এর মধ্যেও একই দেশের দু’টি মানুষের জন্য দু’-রকম পরস্পরবিরোধী আইনের প্রসঙ্গ এসে পৌঁছতে পারেনি। বোঝা উচিত, ‘সামাজিক অসাম্য’ আর যাই হোক ‘বৈচিত্র’ নয়। আর, তা যদি ‘বৈচিত্র’ হয়েও থাকে, তেমন বৈচিত্র ভেঙে ফেলাই দরকার। ধর্মীয় অসাম্য এবং পক্ষপাতিত্বকে সেই ধর্মের সংস্কৃতি মনে করবে মুজফ্ফর আলি সাজ্জাদের মতো মানসিকতার লোক। সেই সাজ্জাদ, যিনি ২০০১ সালে অন্ধ্রপ্রদেশ হাই কোর্টে ‘চাইল্ড ম্যারেজ রেসট্রেন্ট অ্যাক্ট’ মুসলিম মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে দাবি জানিয়ে বলতে চেয়েছিলেন, অভিভাবকের সম্মতি সাপেক্ষে রজোদর্শনেই মুসলমান মেয়েদের বিয়ে দেওয়া যায়।
মহামান্য বিচারপতি যে দ্বিধাহীনভাবে সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছিলেন, তা নিশ্চয়ই বলে দেওয়ার দরকার নেই। সেই রায় কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদ সৃষ্টি করেনি, বা সংস্কৃতিকে নষ্ট করেনি; এবং দেশের বৈচিত্রও ক্ষুণ্ণ হয়নি তাতে।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক আইনজীবী
[email protected]
সর্বশেষ খবর
-
তাইল্যান্ড-কলকাতা মাদক চালান! পর্যটক সেজে মারাত্মক ‘মলি’ পাচারে এসে গ্রেপ্তার দুই বিদেশিনী
-
দিনেদুপুরে যুবককে গাড়িতে তুলে চম্পট! সল্টলেকে ‘ফিল্মি কায়দা’য় অপহরণের কিনারা পুলিশের
-
‘ছাত্রক্ষোভ রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার’, রাহুল গান্ধীকে তোপ কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর
-
স্বাস্থ্য ভবনে পদোন্নতির ঝড়, মুখ্যমন্ত্রীর জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের বড় প্রমোশন
-
দায়িত্ব নিয়েছিলেন ১৮ দিন আগে, কামারহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা লকেটের দাদার