‘তোমার মন নাই কুসুম…’, বলতে সুররিয়াল লেগেছিল, বললেন আবির চট্টোপাধ্যায়। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’য় অভিনয়ের আরও একধাপ পেরিয়েছেন, এমনটাই মনে করেন তিনি। মুখোমুখি বিদিশা চট্টোপাধ্যায়।
পয়লা আগস্ট (আজ) মুক্তি পাচ্ছে সুমন মুখোপাধ্যায় পরিচালিত বহু প্রতীক্ষিত ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’। আপনাকে দেখা যাবে ‘শশী’-র চরিত্রে। ছবির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গোড়ার কথা জানতে চাইব।
– কোভিড পরবর্তী সময়ে এটাই আমার প্রথম বাংলা ছবির শুটিং। ২০২২-এর ফেব্রুয়ারি-মার্চে শুটিং করেছিলাম। লালদা এর আগে বেশ কিছু ছবি করেছেন, কিন্তু তিনি মূলত নাটকের মানুষ। ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’র জন্য আমাকে বলায়, খুব অবাক হয়েছিলাম। কারণ, আমি কখনওই রেগুলার নাটক করিনি। তবে আমার একটা ভয়ও ছিল কারণ এমন একটা কালজয়ী উপন্যাস। তাছাড়া বহু আগে পড়া, খুব যে মনে ছিল তখন, তাও নয়। লালদা (সুমন মুখোপাধ্যায়) বলেছিল স্ক্রিপ্টটা পড়ার পর আর উপন্যাস পড়িস না। সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ ফিল্ম ইজ এ ডিরেক্টর’স মিডিয়াম। আমি ‘শশী’র চরিত্রের ক্ষেত্রে অনেকটাই পরিচালকের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম।
আপনি এর আগে সাহিত্যনির্ভর ছবিতে কাজ করেছেন। ‘ব্যোমকেশ’, ‘হৃদমাঝারে’, ‘শাহজাহান রিজেন্সি’, ‘কাবুলিওয়ালা’। কিন্তু ‘শশী’র চরিত্রে যে বিস্তার এবং জটিলতা সেটাকে কীভাবে দেখেছিলেন?
– শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বা সমরেশ মজুমদার বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমি যতবার পড়েছি এটা কিন্তু আমার কাছে ততটা পরিচিত লেখা নয়। সেই জন্য ‘শশী’কে নিয়ে আমার ভয়টা বেশি ছিল। আর ভয় থাকলে কাজ ভালো হয়। লালদা প্রথম থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে শশীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সিনেমার স্ক্রিপ্টটা তৈরি করে। মূল উপন্যাসের কিছু অংশ বাদ গিয়েছে। তবে স্ক্রিপ্টটার সঙ্গে আমি খুব আইডেনটিফাই করতে পেরেছি। এই যে মানুষের মনের মধ্যে সারাক্ষণ একটা দোলাচল চলে, যুক্তি এবং অন্ধ বিশ্বাসের মধ্যে একটা সংঘাত চলে এবং এই যে ইনডিসিশনে ভোগা– এটা লালদাও বলেছিল সিদ্ধান্তহীনতায় ক্রমাগত ভুগতে থাকা, কিন্তু বাঙালি জীবনের অঙ্গ। এবং আমি বলব এই যে প্যাসিভ থাকা, সব জেনে শুনেও চুপ থাকা– এটা আমাদের একেবারে ভিতরে আছে। সেই জন্য আমার শশীকে খুব চেনা লাগছিল।
আবির কতটা ‘শশী’র মতো?
– আমার মধ্যেও সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যে দোলাচল, সেটা রয়েছে। যেমন ধরো, মনে হয়েছে আরও বেশি করে কী ভেঞ্চার আউট করা উচিত অভিনয়ের জন্য? তারপর মনে হয়েছে যে না, এখানেও তো কাজ হচ্ছে। এটা আমি আগে কখনও বলিনি! কিন্তু আমি ওই ভাবে ‘শশী’কে আইডেনটিফাই করতে পারছিলাম। আর এটা শুধু ভালো-খারাপের দোলাচল নয়। বাবার সঙ্গে শশী’র যে দ্বন্দ্ব, ঠিক যেন দাবা খেলছে, কে কাকে হারাবে এই নিয়ে মেতে আছে। এটা খুব জটিল বাট ইটস ভেরি রেগুলার থিং! অভিভাবকের সঙ্গে আমাদেরও দ্বন্দ্ব চলে। তাই ‘শশী’কে আমার খুব আপন মনে হয়েছে। এবং শশীর মধ্যে কোথাও গিয়ে একটা ভিক্টোরিয়ান মানসিকতাও আছে। যেটাকে আমরা পিউরিটান বলি। এই যে ‘কুসুম’কে ওর ভালো লাগলেও, মাথার মধ্যে চলে, অন্য কারও বউ! কুসুমের সঙ্গে সময় কাটাতে ‘শশী’র ভালোই লাগে। কিন্তু তবু আটকে যায়, এগোতে পারে না। শশীর এই ব্যাপারগুলোর সঙ্গে আমি আইডেনটিফাই করতে পারি।
আপনার মধ্যে কি একটা পিউরিটান মানুষ আছে?
– আমাকে তো পরমব্রত বলেছিল, আমার মধ্যে ওই ‘ইংলিশ ভদ্রতা’টা আছে (হাসি)।
রটারডাম ফিল্ম উৎসবে ছবিটা প্রশংসিত হয়েছে, সুমন মুখোপাধ্যায়ও আপনার কাজের প্রশংসা করছিলেন। আপনার নিজের এই ছবিটা করে কী মনে হয়েছে?
– এটা এমন একটা ছবি যেখানে অনেক ঘটনাও আছে, অন্যদিকে শূন্যতাও আছে। কোভিড পরবর্তী সময়ে আমরা গ্রামের দিকে শুটিং করেছিলাম। ওই গ্রামবাংলা, শশী, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, গ্রামের মানুষগুলো, পুতুলনাচ– সদ্য অনিশ্চয়তার সময় পেরিয়ে সিনেমায় ঢুকেছিলাম। ওই জোনটা থেকে কেউ বেরতে পারিনি সেই সময়। কোভিড পরবর্তী সময়ের যে আশঙ্কার অনিশ্চয়তা, হতাশা, বিরক্তি সেই সব কিছু শশীর চরিত্রে একটা বাড়তি প্রলেপ দিয়েছিল। তবে কাজটা করে খুব আরাম পেয়েছি। অভিনেতা হিসাবে নিজেকে চ্যালেঞ্জও করতে পেরেছি। আমার কেরিয়ারে ‘শশী’ এবং ‘পুতুলনাচের ইতিকথা’ একটা ধাপ।

সময় কিংবা পরিস্থিতির হাতের পুতুল হয়ে যাওয়া আমরা জানি। অভিনেতার জীবনও খানিক তাই। পরিচালকের হাতে, দর্শকের চাহিদার কাছে…
– ‘নায়ক’ ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ আমরা সবাই জানি। অভিনেতা সম্পর্কে ‘শংকরদা’, ‘অরিন্দম’কে বলছে– ‘পরিচালকের হাতে সে পুতুল, ক্যামেরা ম্যানের হাতে সে পুতুল…. এডিটরের হাতে সে পুতুল…’ (হাসি)!
হ্যাঁ সেটাই, কিংবা বড় প্রোডাকশন হাউসের কাছেও পুতুল, ক্ষমতাধারীদের হাতের পুতুল বা আপনার সেলিব্রিটি ইমেজ– সেটার কাছেও একরকম পাপেট হয়ে যাওয়া– এইটা আপনি কীভাবে সামলান, কতটা পেরেছেন, কতটা পারেননি?
– যেটুকু আমি বলতে পারি, বা যেটুকু বলা যায় সেটাই বলি। কোভিড পরবর্তী সময়ে আমার নিজের মধ্যে অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। যে বয়স এবং অভিজ্ঞতায় আমি দাঁড়িয়ে আছি, আগের থেকে অনেক বেশি ‘লেট গো’ করতে শিখেছি। কোনও কিছু আঁকড়ে ধরার বিষয়ে আমি আগের থেকে অনেক বেশি সিলেক্টিভ হয়েছি। কোনটা ছেড়ে দিতে হবে, আমি জানি। দ্বিতীয়ত, আগের চেয়ে এখন আমি আরও কম রিয়্যাক্টিভ। আগে
যেটা ছিল, আই ওয়াজ কাইন্ড অফ এক্সাইটেড, আই ওয়াজ কাইন্ড অফ অ্যাংরি, নাউ আই অ্যাম প্র্যাকটিসিং মোর সাইলেন্স! উদাসীনতা বলব না, নৈর্ব্যক্তিক বলা যায়। এবং এই জার্নিটা বোধহয় পুতুলনাচ থেকেই শুরু হয়েছে।
তার মানে কি এই যে অভিনেতা হিসাবে নানাভাবে ‘পাপেট’ হয়ে যাওয়া বা থাকা– এটা কী আগের চেয়ে অনেক কম?
– কম বলব না, কিন্তু আই অ্যাম ট্রাইং টু! একটা সময় ছিল যখন আমি ‘দীপক চ্যাটার্জ্জী’র মতো রেগে ছিলাম। এবং অভিনয় করার সময়ও। এটা দেবালয়ও আমাকে বলেছে। দেবালয়ও খুব রেগে থাকে এবং সঙ্গত কারণেই। আর আমার এই রাগের মধ্যে অভিমানও আছে। অভিমান তখনই থাকে যখন সেখানে ভালোবাসা থাকে। ভালোবাসা এখনও আছে, কিন্তু নিজের কাজটা সুষ্ঠুভাবে করার জন্য একটা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি রাখার চেষ্টা করছি। অবজেকটিভ হওয়ার চেষ্টা করছি। কাজের ক্ষেত্রে নির্মম হওয়ার চেষ্টা করছি। ‘না’ বলা এবং বাউন্ডারি সেট করার চেষ্টা করছি।

এই যে গোটা টলিউড ক্ষমতাবানদের হাতে পাপেট! কাজ বন্ধ হচ্ছে, অভিনেতা ব্যান হচ্ছে– এটা নিয়ে কী বলবেন?
– আমি যথেষ্ট বিব্রত, আমার মাঝেমধ্যে চিন্তাও হয়। কিন্তু কী জানো তো, চিরকাল যাঁরা ক্ষমতায় বা অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের দায়িত্বে আছেন তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা বা সাহায্য ছাড়া কিন্তু কোনওদিনও শিল্প বিকশিত হতে পারে না। সে তুমি আকবরের সময় থেকেই যদি ধরো। তাই বলে কি অলটারনেট আর্ট, যারা সিস্টেমের বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছে, প্রশ্ন করছে, তারা করবে না! আসলে এটা একটা চিরন্তন লড়াই।
আপনার কী মনে হয় এই লড়াইটা একেবারে ফ্রন্ট রো-তে যাকে বলে অন দ্য ফেস– সেখানে পৌঁছে গিয়েছে?
– এই ‘অন দ্য ফেস’ ব্যাপারটা এখন সব কিছুতেই। আর সোশাল মিডিয়া এসে যাওয়ায় তার প্রভাব আমাদের কাজে, সমাজে, রাজনীতিতে– সর্বত্র পড়েছে।
অভিনেতা আবিরের কাছে কি ব্যক্তি আবির মাথা নত করেছে? বা পাপেট হয়েছে?
– পাপেট হয়নি তবে কিছু সময় মাথা নত তো করেছেই! দর্শকের চাহিদা অনুযায়ী হয়তো কিছু কাজ করেছি তবে খুব বেশি উদাহরণ নেই।
‘শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?’– এই আইকনিক সংলাপ বলার সময় যে অভিজ্ঞতা সেটা জানতে চাই!
– এই লাইনটা ছোটোবেলা থেকে এতবার শুনেছি, পড়েছি, বা পরীক্ষায় ব্যাখ্যা করতে হয়েছে– যে সিনেমায় এটা বলার সময় খুব সুররিয়াল লেগেছে। খুব কঠিন একটা মুহূর্ত। আমি লালদাকে বলেছিলাম, প্লিজ তুমি একবার বলবে লাইনটা। আসলে এই লাইনটার সঙ্গে এতদিনকার পরিচিতি যে সেটা থেকে বেরিয়ে অবজেকটিভলি কীভাবে এটাকে দেখা যায় সেই চেষ্টায় ছিলাম। লালদা বলেও দেয়, তারপর আছে যখন ডাবিং হয়, তখন প্রায় আধঘণ্টা ধরে ওই লাইনটাতে আটকে ছিলাম, যে কোনও পরিবর্তন করব কি না। চাইলে চব্বিশ ঘণ্টাও নিতে পারতাম।
সর্বশেষ খবর
-
শংকরপুর থেকে রওনা হয়ে নিখোঁজ, ৭ দিন পর বকখালিতে উদ্ধার ট্রলার, মৃত ৫ মৎস্যজীবী
-
সামনে দামী মোবাইল, লোভ সামলাতে না পেরে পার্সেল কেটে চুরি! কী পরিণতি অনলাইন বিপণি সংস্থার কর্মীর?
-
‘স্কুলেই ফিনান্সিয়াল লিটারেসি পড়ানো উচিত’, কলকাতায় বেঙ্গল রাইজিং বিসনেস সামিটে বললেন সুকান্ত মজুমদার
-
আশঙ্কাই সত্যি! বারুইপুরে গণপিটুনিতে উসকানির অভিযোগে গ্রেপ্তার বামনেতা লাহেক আলি
-
মাকে পৃথিবী থেকে সরালেই ঘরে ফিরবে বউ, শাশুড়ির শর্ত মেনে জন্মদাত্রীকে খুনের চেষ্টা ছেলের!