১ মাঘ  ১৪২৫  বুধবার ১৬ জানুয়ারি ২০১৯ 

Menu Logo মহানগর রাজ্য দেশ ওপার বাংলা বিদেশ খেলা বিনোদন লাইফস্টাইল এছাড়াও ফিরে দেখা ২০১৮ ফটো গ্যালারি ভিডিও গ্যালারি ই-পেপার

সংবাদ প্রতিদিন ডিজিটাল ডেস্ক: রাজনীতি যদি সেলুলয়েডে আসে, তখন বিতর্ক আসবেই। তেমনই হয়েছিল। দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার ছবির ট্রেলার দেখেই হাজারও বিতর্ক শুরু হয়। রাজনৈতিক হাতিয়ার, নির্বাচনের আগে কংগ্রেসকে খাটো করে দেখানো, বিজেপির বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ওঠে। ছবির গুণগত মানের কথা বাদ দিয়ে শুধু তথ্যকে ধরলে বাস্তবের সঙ্গে এই ছবির আকাশপাতাল ফারাক। ফিল্ম সমালোচকদের সরিয়ে রেখেই বলা যায়, দু’বারের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে ব্যবহার করে ইতিহাসকে অপভ্রংশ করা হয়েছে এই ছবিতে। মনমোহনের মিডিয়া অ্যাডভাইসর সঞ্জয় বারুর বই ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’-এর অবলম্বনে তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাঁর বইয়ের অর্ধেক অংশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। গান্ধী পরিবার এই নিয়ে কোনও মন্তব্য না করলেও ছবির বিরুদ্ধে উঠছে একাধিক তথ্যবিভ্রান্তের অভিযোগ।

অনেকগুলো বিষয়ে ছবিতে দেখানো তথ্যের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। কিন্তু দেশের দু’বারের প্রধানমন্ত্রীর সময়কাল তুলে ধরার বদলে দেশের ইতিহাসকে পালটে ফেলা হয়েছে। যা হয়তো কখনও উচিত হয়নি। ছবিতে দেখা গিয়েছে, ২০০৪ লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরছে কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করা হয় মনমোহন সিংয়ের নাম। এই সময় নাকি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী জানান, এটাই কংগ্রেসের মাস্টারস্ট্রোক। সঞ্জয় বারুর বইয়ে এমন কোনও ঘটনার উল্লেখ নেই। বাজপেয়ীর এই মন্তব্যেরও কোনও প্রমাণ কোথাও নেই। অথচ ছবিতে এই তথ্যকে দেখানো হয়েছে। ছবিতে সঞ্জয় বারুর চরিত্রে অভিনয় করা অক্ষয় খান্নার সংলাপে শোনা যায়, “এই নির্বাচন রাহুল গান্ধীর ক্ষমতার বাইরে।” ২০০৯-এ লোকসভা নির্বাচন প্রসঙ্গে একথা বলেন সঞ্জয় (অক্ষয় খান্না)। কিন্তু বাস্তবে সঞ্জয় বারুর বইয়ে এমন কোনও ঘটনার উল্লেখ নেই। শুধু ছবির প্রচার ও রাজনৈতিক স্বার্থে তৈরি হয়েছে এই সংলাপ।

[কংগ্রেস বা বিজেপি, কাউকেই খুশি করতে পারল না ‘দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার’]

ছবির অধিকাংশ দৃশ্যে দেখা গিয়েছে সোনিয়ার গান্ধীর বিশ্বাসভাজন আহমেদ প্যাটেলকে। যাঁর চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেতা বিপিন শর্মা। তাঁর চরিত্রেও একটি সংলাপ জনপ্রিয় হয়। তিনি সঞ্জয়কে (অক্ষয় খান্না) জানান, কাঠের তলোয়ারে যুদ্ধজয় অসম্ভব। যে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরতে পারে না, সে মিডিয়া হ্যান্ডেল করবে! এই সংলাপেও তথ্যবিভ্রান্তি আছে। সঞ্জয় বারু তাঁর বইয়ের ৭২ নম্বর পাতায় আহমেদ প্যাটেল নিয়ে লিখেছেন। সেখানে তিনি লেখেন, “আহমেদ প্যাটেলের সঙ্গে আমার কাজ খুব কম ছিল। কয়েকবার দেখা হয়েছিল। ওর থেকে সবসময় বন্ধুসুলভ আচরণ পেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী দপ্তরে থাকার সময় মাত্র দু’বার ঠিকঠাক কথোপকথন হয়েছে।” ছবির কিছু অংশে বারবার দেখানোর চেষ্টা হয়েছে মনমোহন ইউপিএ সরকারের দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সঞ্জয়ের (অক্ষয় খান্না) সংলাপে শোনা যায় আরও একটি বিভ্রান্তিকর সংলাপ, “দল ডাক্তার সাহেবকে দায় বানিয়ে ঝেড়ে ফেলতে চায়। আমি কখনও তা হতে দেব না।” কিন্তু আসল বইয়ে সঞ্জয় লিখেছেন, “বিদেশি ফার্মে কাজ করতেন রাহুলের এক বন্ধু। সে রাহুলকে প্রশ্ন করে মনমোহন সিং কি দলের দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে! দিল্লি দরবার তাঁর অভিযোগকে উড়িয়ে দেয়।”

[‘এই ছবি দেখলে মনমোহনের প্রেমে পড়ে যাবেন’, ট্রেলার নিয়ে বিতর্কের জবাব অনুপমের]

ছবিতে মনমোহন সিংয়ের সংলাপেও এমন ভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, যা মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছেছে। দুর্নীতি ইস্যু নিয়ে মনমোহনকে (অনুপম খের) বলতে শোনা যায়, “আমাকে লোকের ভুলের দায় নিতে হচ্ছে।” কিন্তু সঞ্জয় তাঁর বইতে এমন কথা লেখেননি। ২৮১ নম্বর পাতায় সঞ্জয় বারু লেখেন, “আগে নিজের সরে দাঁড়ানো উচিত ছিল। তারপর অন্যের দুর্নীতির নৈতিক দায়ভার নিতে হত। সরকারকে বাঁচানোর কোনও দায়ই ছিল না। কিন্তু মনমোহন সেটাই করলেন।” ছবির ট্রেলারে দেখানো হয়েছে, মন্ত্রিসভায় পাশ হওয়া একটি অর্ডিন্যান্স সাংবাদিক বৈঠকে ছিঁড়়ে ফেলছেন রাহুল গান্ধী। এমন ঘটনাও কখনও ঘটেনি। বাস্তবে রাহুল বলেছেন, এই অর্ডিন্যান্স ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে কিছুই করেননি। তখন দুর্নীতিতে জড়িয়ে ইউপিএ সরকার। ছবিতে একটি দৃশ্যে দেখানো হয়েছে, দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের আমলে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন মনমোহন সিং। সোনিয়া গান্ধীকে পদত্যাগের কথা জানাতে গিয়েছেন মনমোহন। সেখানে সোনিয়া গান্ধী বলছেন, এখন পদত্যাগ করলে রাহুল কী করে সব সামলাবে! আসল ঘটনা সম্পূর্ণ উলটো। প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে পদত্যাগ করার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন মনমোহন। আর পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশের সময় সেই বৈঠকে সোনিয়া গান্ধী ছিলেনই না। মনমোহন সিংকে কখনও তাঁর বই লেখার কথা জানাননি সঞ্জয় বারু। কিন্তু ছবিতে বারকয়েক মনমোহনের (অনুপম খের) মুখে বইয়ের কথা শোনা যায়।

[দেশাত্মবোধকে উসকে দিতে সফল হল কি ‘উরি: দ্য সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’?]

মিডিয়া অ্যাডভাইসর হিসেবে সঞ্জয় বারু যা দেখেছেন, সেটাই তুলে ধরেছেন তাঁর বইয়ে। এতদিন বলিউডে বায়োপিক হয়েছে। অ্যাথলিটদের নিয়ে বায়োপিক সুপারহিট হয়েছে বারবার। কিন্তু নির্বাচনের আগে প্রতিপক্ষের বায়োপিক বানিয়ে তা প্রচারের অর্থে ব্যবহার করার প্রয়াস এই প্রথম। আর তাতে অনেকটাই ধাক্কা খেল বিজেপিই। গুণগত মান ও তথ্যের বিচারে এই ছবি যে সামান্য প্রত্যাশা ছুঁতে পারেনি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশের প্রথম অর্থনৈতিক সংস্কার করেছিলেন যে ব্যক্তি, তাঁকে রাজনৈতিক আঙিনায় নামিয়ে অসম্মান না করাই হয়তো ভাল ছিল পরিচালক ও প্রযোজকদের। তবে এই ছবির পর রাজনৈতিক নেতাদের জীবন নিয়ে বায়োপিক করার বাসনা যে কিছুটা কমল, সে কথা বলাই যায় বিরোধীদের হাতে নিজের জীবন নিয়ে কাঁটাছেড়ার ইচ্ছা কারই বা থাকে!     

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

ট্রেন্ডিং