‘লাদাখ চলে রিকশাওয়ালা’ এখন টক অব দ্য টাউন। ২০১৪ সালে কলকাতা থেকে লাদাখ পর্যন্ত রিকশা নিয়ে পৌঁছেছিলেন সত্যেন দাস। এই অভিযানটাই অল্প করে শুট করতে করতে একটা আস্ত সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন পরিচালক ইন্দ্রাণী চক্রবর্তী। যেটা এই ২০১৮ সালে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছে। দুজনের সঙ্গে আলাপচারিতায় কলকাতার আরেক প্রখ্যাত অভিযাত্রী চন্দন বিশ্বাস।
চন্দন: সত্যেনবাবু আপনার জার্নিটা সংক্ষেপে বলুন।
সত্যেন: রুটটা ছিল কলকাতা থেকে বেনারস, বেনারস থেকে লখনউ, হরিদ্বার, সাহারানপুর, আম্বালা, পাঠানকোট, কাটরা, পাটনিটপ, জহর টানেল, শ্রীনগর, জোজি-লা, দ্রাস কার্গিল হয়ে লে-লাদাখ-খারদুং লা। আমি বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে বেরিয়েছিলাম।
চন্দন: এই রুটটাই কেন বেছে নিয়েছিলেন?
সত্যেন: আমি জানতাম এই রুটে একটাই উঁচু পাস পড়বে, জোজি-লা। ওই একটা পাস যতই উঁচু হোক ঠিক পেরিয়ে যাব। আর শুনেছিলাম এই রুটে রাস্তাটা খুব ভাল, লোকালিটি ভাল আছে, সমস্যায় পড়ব না। কিন্তু শেষে গিয়ে দেখলাম পরিস্থিতি অন্য। প্রত্যেকটা জায়গাই নিজের মতো করে কঠিন।
চন্দন: আপনাদের দুজনের পরিচয় হল কী করে?
ইন্দ্রাণী: নাকতলায় আমার বাড়ির সামনের রিকশা স্ট্যান্ডে সত্যেন রিকশা চালায়। একদিন সত্যেনের রিকশায় চড়তে গিয়ে ওর সঙ্গে আমার পরিচয়।
সত্যেন: ইন্দ্রাণীদি একদিন এসে আমাকে বলল যে রিকশা যাবে কিনা! তখন আমি লাদাখ যাওয়ার পরিকল্পনায় রয়েছি। প্রথমে ডাক শুনতেই পাইনি, বিভোর হয়ে মনে মনে লাদাখের ছবি দেখছি, লাদাখেই রয়েছি। খানিকক্ষণ পরে হুঁশ ফিরল, তার পরে ডেকে রিকশায় বসালাম।
[অদম্য সাংবাদিকের গল্প ফুটে উঠল ‘আ প্রাইভেট ওয়ার’-এর পর্দায়]
ইন্দ্রাণী: সত্যেন গল্প বলা শুরু করল। জানলাম ও আগে রিকশায় মেয়ে এবং বউকে চাপিয়ে নিয়ে অমৃতসর, কাশ্মীর, ওয়াঘা বর্ডার এমনকি পুরীও ঘুরে এসেছে। সেইসব স্টিল ফটোগ্রাফ ওর সঙ্গেই থাকে, সেগুলোও দেখলাম। এরকম ইন্টারেস্টিং একজনকে খুঁজে বার করতে পেরে নিজেই আনন্দ পেয়েছিলাম।
চন্দন: ইন্দ্রানী ঠিক কোন পরিস্থিতিতে আপনার মনে হল এটা নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানানো যেতে পারে?
ইন্দ্রাণী: সব কিছু দেখে বুঝতে পেরেছিলাম যে সত্যেন ব্যাপারটা নিয়ে খুব সিরিয়াস। তখনই মনে হল যদি এটা নিয়ে একটা সিনেমা বানানো যায়। আমাদের টিম চিয়ারোসকিউরো প্রোডাকশনের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে একটু কথা বলি। এই ভাবেই ধীরে ধীরে কাজ এগোল।
চন্দন: সিনেমা বানানোর ইনিশিয়াল গল্পটা একটু বলুন?
ইন্দ্রাণী: আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম যে ট্রাডিশনাল ভাবে আমাদের ফুল টিম সত্যেনের সঙ্গে শুট করতে করতে যাব। কিন্তু সেই প্রোডাকশন কস্ট আমরা জোগাড় করতে পারিনি। তখন ঠিক করি যে আমরা কিছু শুট প্রথমে কলকাতায় করে নেব। আর সত্যেনের কাছে আমরা একটা হ্যান্ডিক্যাম দিয়ে দেব, ও রাস্তায় শুট করতে করতে চালাবে। সত্যেন কে ক্যামেরা চালানো শেখানো হল। কিন্তু সেখানেও বিপত্তি। বেনারসে গিয়ে ক্যামেরা খারাপ হয়। সেই ক্যামেরা আবার কলকাতায় এল, ঠিক করে নিয়ে আমাদের টিমের শীর্ষেন্দু আবার বেনারস গিয়ে সত্যেনের হাতে দিয়ে আসে। সত্যেন এগোতে থাকে। শেষে অবশ্য আমাদের ফুল টিম লাদাখ পৌঁছায় এবং শুট শেষ করে।
চন্দন: সত্যেনবাবু আপনার জার্নিটাই যথেষ্ট কঠিন, সেখানে একইসঙ্গে শুট করার ব্যাপারটা কেমন ভাবে সামলালেন?
সত্যেন: সেটা চলতে চলতে ঠিক সামলে নিয়েছি। মাঝে মাঝে বিরক্তি লাগত, কিন্তু তাও শুট করেছি। তখন তো জানতাম না ভবিষ্যতে এই জিনিস তৈরি হচ্ছে।
চন্দন: ক্যামেরা, মোবাইল এগুলো চার্জ দিতেন কোথায়?
সত্যেন: যেসব দোকান বা ধাবাতে গিয়ে দাঁড়াতাম সেখানেই চার্জ দিতাম। খুব অসুবিধা হত না।
চন্দন: সিনেমার পোস্ট প্রোডাকশনের অভিজ্ঞতাটা কেমন?
ইন্দ্রাণী: পোস্ট প্রোডাকশনে আমরা বেশ সমস্যার মধ্যে পড়ি। বেশ কয়েকজন বড় বড় এডিটর আমাদের র-ফুটেজ দেখে উৎসাহ পায়নি। আসলে এরকম একটা ফ্ল্যাট ড্রামালেস সিনেমার ব্যাপারে কেউ আগ্রহী হয়নি। এবং আমাদের কাছে একজন এডিটরকে দেওয়ার মতন বাজেটও সেরকম ভাবে ছিল না। আরেকটা সমস্যা হয়েছিল যে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ক্যামেরায় শুট করার ফলে ফুটেজ ম্যাচ করানো। শেষমেশ আমাদের টিমের শীর্ষেন্দু এডিট করে ফেলে পার্সোনাল কম্পিউটারে। সাউন্ড এডিটিং যদিও বাইরে থেকে করাতে হয়েছে।
চন্দন: ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার পর পরবর্তী অভিজ্ঞতাটা বলুন।
ইন্দ্রাণী: এটা বেশ মজার অভিজ্ঞতা। যখন আমাদের সিনেমাটা ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়ে গিয়েছে তখনও আমরা প্রথমে জানতে পারিনি। একজন-দুজন ফোন করে জানান যে আমরা নাকি পেয়েছি। কিন্তু আমরা কোনও কনফার্মেশন পাইনি তখনও এবং কোথা থেকে পাওয়া যাবে সেটাও জানি না। বেশ কিছুক্ষণ টেনশনে থাকার পরে তার পরে জানতে পারি যে আমরা পেয়েছি। এই সিনেমাটা যে ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেতে পারে আমরা সেটাই ভাবিনি কখনও। বর্তমানে নন্দন ২-য়ে চলছে। কিন্তু এখনও আমরা কোনও ডিস্ট্রিবিউটর পাইনি, তাই পরবর্তীতে ‘হল রিলিজ’ হবে কিনা এখনও জানি না। আপাতত সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোতে পাঠাচ্ছি। যদি ডিস্ট্রিবিউটর না পাই তাহলে ভবিষ্যতে যে কোনও পাবলিক প্ল্যাটফর্ম যেরকম ইউটিউবে তুলে দেওয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে।
চন্দন: নেক্সট কোন সাবজেক্ট নিয়ে কাজ করতে চাইছেন?
ইন্দ্রাণী: এবার একটা ফিকশন নিয়ে চিন্তা ভাবনা করছি। দু-তিনটে স্ক্রিপ্ট রেডি হয়ে রয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি কাজ শুরু হবে।
সত্যেন: আমি খারদুং লা পাসের থেকেও ভয়ংকর কোন জায়গায় যেতে চাইছি গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধের বার্তা নিয়ে, পরবর্তী মে-জুন মাসে বেরোব। সঙ্গে কুড়ি হাজার খেজুরের বীজ থাকবে, লাগাতে লাগাতে যাব।
চন্দন: আপনাদের দু’জনকেই ধন্যবাদ। সত্যেনদা আরও ভাল, আরও বড় অভিযান করুন। ইন্দ্রাণী এভাবেই আরও সিনেমা বানান। শুভেচ্ছা থাকল।
সর্বশেষ খবর
-
বদলে যাবে সোদপুর ও খড়দহ স্টেশনের নাম! রেলমন্ত্রকে প্রস্তাব মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তীর
-
অধিনায়কত্ব খোয়াচ্ছেন সূর্যকুমার, ভারতের নতুন টি-২০ অধিনায়ক শ্রেয়স আইয়ার!
-
এই ৬ আন্তর্জাতিক গন্তব্যে স্থগিত ইন্ডিগোর বিমান পরিষেবা! বড় সিদ্ধান্ত দেশের বৃহত্তম উড়ান সংস্থার
-
প্রয়াত ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান কার্যনির্বাহী কর্তা নারায়ণ বসু
-
শ্লীলতাহানি, তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার স্বরূপ বিশ্বাস, ডিম হাতে থানা ঘেরাও ক্রুদ্ধ জনতার